আমার মা নব্বইয়ের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডিইউ) অর্থনীতির ছাত্রী ছিলেন। আমার শৈশব কেটেছে তাঁর মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ডাকসু—নিয়ে গল্প শুনে। বহু বছর পরে, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী হিসেবে আমি সেই উত্তরাধিকারকে পেয়েছি অনেক বেশি বাস্তব ও সাধারণ এক জায়গায়: ভোটকেন্দ্রে।
আমি ভোট দিয়েছিলাম সেই প্রার্থীদের, যাদের আগের কাজকর্ম এবং ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি বিচার করে আমার মনে হয়েছিল—তারা ছাত্রসংক্রান্ত বিষয়গুলো পরিচালনা করতে সক্ষম। ছাত্ররাজনীতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো হাতে গোনা কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক জায়গার একটি, যেখানে ছাত্রদের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। সে কারণেই গত বছরের সেপ্টেম্বরের পর থেকে আমি নজর রাখছি—ডাকসু এবং ছাত্রদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আসলে কী করছেন।
চার মাস পার হতেই ডাকসুর চিত্র এখনো স্থির নয়। বরং ক্যাম্পাসে ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। হকার ও বহিরাগতদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেনা পরিবেশে পরিবর্তন এনেছে—যা খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। দীর্ঘদিন ধরে “মানুষের ক্যাম্পাস” হিসেবে পরিচিত এবং শহরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এই বিশ্ববিদ্যালয় এখন ধীরে ধীরে আরও বিচ্ছিন্ন এক জায়গায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। নিরাপত্তার নামে চালানো এসব উদ্যোগ সাধারণ মানুষকে ক্যাম্পাসজীবনের অংশ হিসেবে নয়, বরং হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করছে। শৃঙ্খলা ফিরছে হয়তো, কিন্তু তার বিনিময়ে হারাচ্ছে নৈকট্য—আর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক সীমারেখা।
এই অস্বস্তি আরও গভীর হয় নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তুলনা করলে। ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফারহাদ স্পষ্টভাবে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি, নির্যাতন, সহিংসতা ও ‘গেস্টরুম সংস্কৃতি’র বিরোধিতা করেছিলেন। পোশাক বা আচরণ—কোনো ক্ষেত্রেই ভয় দেখিয়ে কাউকে বাধ্য করা যাবে না বলে তিনি বারবার জোর দিয়েছিলেন। অথচ সেই কথাগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায় ডাকসুর নির্বাহী সদস্য সর্বা মিত্র চাকমার একটি ভাইরাল ভিডিও, যেখানে তাকে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ছেলেদের স্কোয়াট করাতে দেখা যায়—শাস্তির নামে প্রকাশ্য অপমান।
সর্বা মিত্র পরে ক্ষমা চেয়েছেন, কিন্তু ঘটনাটি শুধু ব্যক্তিগত ভুল নয়। দায়িত্বে যেই থাকুক, শারীরিক শাস্তি একই দমনমূলক যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে। এটি ভয়ভিত্তিক আনুগত্য তৈরি করে, যা সুস্থ গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত।
আরও উদ্বেগজনক হলো—এই আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসতে এত দেরি হওয়া। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হস্তক্ষেপ করেনি। সহপাঠীরা চুপ করে দেখেছে। কেবল জনরোষ তৈরি হওয়ার পরই নিন্দা এসেছে। যে নেতৃত্ব নির্যাতন ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরোধিতা করে বলে দাবি করে, তাদের পক্ষে এমন নীরবতা চলতে পারে না। এমন মুহূর্তে নীরবতা আসলে নির্যাতন চালিয়ে যাওয়ার অনুমতির মতোই কাজ করে।
তবে ডাকসু যে বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। প্রতি শিক্ষাবর্ষে প্রত্যেক ডিইউ শিক্ষার্থী ডাকসুকে ৬০ টাকা এবং নিজ নিজ হল সংসদকে আরও ৬০ টাকা দেয়। হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে আগের ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে অন্তত ৯০ লাখ টাকা ডাকসুর তহবিলে জমা হওয়ার কথা ছিল, এবং হল সংসদগুলোর ক্ষেত্রেও আরও ৯০ লাখ টাকা। কিন্তু নতুন ডাকসু কমিটির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো—তারা দায়িত্ব নেয় সম্পূর্ণ খালি হাতে। বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ফলে কোনো ব্যাংক ব্যালান্স ছিল না, কোনো তহবিলও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায়নি। তবুও চার মাসের মধ্যেই ডাকসু নেতারা গণমাধ্যমে দাঁড়িয়ে কোটি টাকার সংস্কারকাজ, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনুদান, এমনকি চীনের অর্থায়নে একটি হল প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত হওয়ার কথা বলছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ডিইউ ক্যাম্পাস প্রত্যাশায় টগবগ করছিল। সহসভাপতি শাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফারহাদের নেতৃত্বে নতুন ছাত্র সংসদের নির্বাচন ছিল শুধু নিয়মিত ছাত্ররাজনীতির চক্র নয়—এর তাৎপর্য ছিল অনেক গভীর। এর মধ্যেই কিছু বাস্তব উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। মেডিকেল সেন্টারে এক্স-রে ও ইসিজি মেশিনসহ নতুন যন্ত্রপাতি যোগ হয়েছে, একটি অ্যাম্বুলেন্স এসেছে। হল ও একাডেমিক ভবনে বিনা মূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করা হয়েছে—ছোট উদ্যোগ হলেও যার দৈনন্দিন প্রভাব আছে। কেন্দ্রীয় মসজিদ সংস্কার ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক শাটল, বাড়তি বাস সার্ভিস ও উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো ছাত্রকল্যাণের মৌলিক বিষয়, এগুলোকে অস্বীকার করা অসৎ হবে। বহু বছর ধরে যেখানে তহবিল অদৃশ্য হয়ে যেত, সেখানে এখন ছাত্ররা চোখে দেখা ফল পাচ্ছে।
কায়েমের এই বক্তব্য—“বাজেটের অজুহাতে বসে থাকিনি”—বিলম্বের পুরনো সংস্কৃতি থেকে এক ধরনের বিচ্যুতি নির্দেশ করে। কিন্তু দক্ষতা দিয়েই ক্ষমতার গভীর প্রশ্নের মীমাংসা হয় না। জামায়াতের এক নেতা প্রকাশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে “মাদক ও দেহব্যবসার আড্ডা” বলে আক্রমণ করলে, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে কুৎসা রটানো হলে, ডাকসু নেতৃত্বের নীরবতা আবার চোখে পড়ে। প্রতিবাদ হয়েছে, কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছে, কিন্তু পুরুষ ডাকসু নেতাদের কাছ থেকে স্পষ্ট ও তাৎক্ষণিক অবস্থান না আসা ছিল লক্ষণীয়। ক্যাম্পাসে লিঙ্গভিত্তিক অপবাদ নতুন কিছু নয়, তাই এই নীরবতা অনেকের কাছে এড়িয়ে যাওয়ার মতো মনে হয়েছে। নিজেদের আদর্শিক বলয়ের সঙ্গে মেলে এমন বক্তব্যের মুখোমুখি হলে ঠিক-ভুল চেনার ক্ষমতা যেন হঠাৎই হারিয়ে যায়।
চার মাস খুব বেশি সময় নয়। কোনো সচেতন পর্যবেক্ষকই আশা করেন না যে একটি ছাত্র সংসদ কয়েক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় বা গভীর মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব এক সেমিস্টারে মিটিয়ে ফেলবে। কিন্তু চার মাস যথেষ্ট সময়—কোনো ধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠার জন্য। এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন—ডাকসু কি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক নৈতিকতা গড়ে তুলছে, নাকি পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোকেই আরও দক্ষভাবে চালাচ্ছে? অবকাঠামো দ্রুত উন্নত করা যায়, কিন্তু গণতান্ত্রিক অভ্যাস তৈরি হতে সময় লাগে, এবং এর জন্য নিজের আরাম ভাঙার মানসিকতাও প্রয়োজন।
সেপ্টেম্বর থেকে যারা নিবিড়ভাবে দেখছেন, তাদের কাছে চিত্রটি এখনো অমীমাংসিত। উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস আছে, কিন্তু সেই প্রবণতা যেন ভেতরে, আরও সূক্ষ্ম ও কার্যকরভাবে ফিরে না আসে—এটাই এখন সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: ডেইলি স্টার; অনুবাদ: শুভ্র সরকার।
আপনার মতামত জানানঃ