মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি আবারও নতুন উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এই সংকীর্ণ জলপথটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের এক মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই মনে করে যে তেলবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার, তবে তারা যেন তাদের নৌবাহিনী পাঠিয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী ট্যাংকারগুলোকে সরাসরি পাহারা দেয়। এই মন্তব্যটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা, কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি বার্তা।
হরমুজ প্রণালী পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি রুটগুলোর একটি। পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথের প্রস্থ মাত্র প্রায় ৩৩ কিলোমিটার, কিন্তু এর গুরুত্ব অসীম। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর অধিকাংশ তেল রপ্তানি এই পথেই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তীব্র প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা বাড়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে অন্তত নয়টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এসব ঘটনার পর ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জাহাজগুলোকে সতর্ক করে দেয় যে তারা যেন হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল না করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি এবং জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বেড়ে যায়। কারণ এই রুট বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ হঠাৎ কমে যেতে পারে এবং দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেন যে প্রয়োজন হলে মার্কিন নৌবাহিনী তেলবাহী জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে পার হতে সহায়তা করতে পারে। এই বক্তব্যের জবাবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের মুখপাত্র আলিমোহাম্মদ নাইনি ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন, ইরান এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানায় এবং তারা মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতির অপেক্ষায় আছে। তার এই মন্তব্যে স্পষ্টভাবে একটি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের সুর ছিল। এর মাধ্যমে ইরান বোঝাতে চেয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই এই অঞ্চলে সরাসরি সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়, তবে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে।
এই ধরনের উত্তেজনা নতুন নয়। হরমুজ প্রণালী বহুবার আন্তর্জাতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় “ট্যাংকার যুদ্ধ” নামে পরিচিত এক পর্যায়ে উভয় পক্ষ একে অপরের তেলবাহী জাহাজে হামলা চালাতে শুরু করে। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে তাদের নৌবাহিনী পাঠায় এবং কিছু কুয়েতি ট্যাংকারকে মার্কিন পতাকা দিয়ে পুনরায় নিবন্ধন করে তাদের নিরাপত্তা দেয়। ১৯৮৭ সালে মার্কিন সুপারট্যাংকার ব্রিজেটন একটি মাইন বিস্ফোরণের শিকার হয়েছিল, যা এই অঞ্চলে উত্তেজনার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে এখনও আলোচিত হয়।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের কিছু মিল রয়েছে। আবারও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং আবারও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলছে। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। কারণ এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নয়, বরং ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিও এই সংঘাতের সঙ্গে জড়িত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা বাড়লে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে। তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এর প্রভাব আরও বেশি হতে পারে, কারণ তারা জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও জ্বালানি আমদানি করে। ফলে এই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়লে তাদের অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হতে পারে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। যদি জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে শিপিং কোম্পানিগুলো বিকল্প রুট ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু সেই রুটগুলো সাধারণত দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল। ফলে পরিবহন খরচ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যের দামে প্রতিফলিত হতে পারে।
ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে হরমুজ প্রণালী একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার। প্রয়োজনে এই পথ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি তারা বহুবার দিয়েছে। যদিও বাস্তবে পুরোপুরি প্রণালী বন্ধ করা সহজ নয়, তবুও সীমিত আকারে বিঘ্ন ঘটালেও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব পড়তে পারে। এই কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে নৌবাহিনীর উপস্থিতি বজায় রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এই প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা নিজস্ব তেল উৎপাদন বাড়িয়েছে, তবুও বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা তাদের কৌশলগত স্বার্থের অংশ। কারণ তেলের দাম বেড়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি দুর্বল হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের মন্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হিসেবেও দেখছেন। তাদের মতে, এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করছে, অন্যদিকে নিজেদের আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে এটি একটি বার্তা যে হরমুজ প্রণালীতে যে কোনো সামরিক উপস্থিতি বা পদক্ষেপ সহজ হবে না।
এদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক দেশ চায় যে এই জলপথে উত্তেজনা যেন আর না বাড়ে। কারণ হরমুজ প্রণালীতে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে তা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চায় এই জলপথে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে। অন্যদিকে ইরান মনে করে যে তাদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তারা আপস করবে না। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা না হলে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
তবে ইতিহাস দেখায় যে এই ধরনের উত্তেজনা অনেক সময় শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রশমিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনীতিতে সামরিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কূটনীতি প্রায়ই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই অনেকেই আশা করছেন যে বর্তমান উত্তেজনাও শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আসবে।
তবুও পরিস্থিতি যে ঝুঁকিপূর্ণ, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। হরমুজ প্রণালীতে যেকোনো সামরিক ভুল বা ভুল বোঝাবুঝি দ্রুত বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। সেই কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেকেই সংযম ও সংলাপের আহ্বান জানাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি শুধু একটি আঞ্চলিক উত্তেজনার বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের এই চ্যালেঞ্জ নতুন করে সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই চ্যালেঞ্জের জবাবে কী পদক্ষেপ নেয় এবং কূটনৈতিক বা সামরিক কোন পথে পরিস্থিতি এগিয়ে যায়। একথা নিশ্চিত যে হরমুজ প্রণালী আগামী দিনগুলোতেও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ