মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও সংঘাতের ইতিহাসে শত্রুপক্ষের নেতৃত্বকে হত্যা বা সরিয়ে দেওয়ার কৌশল নতুন নয়। সামরিক কৌশলের ভাষায় এটিকে অনেক সময় “ডিসিশনাল স্ট্রাইক” বা নেতৃত্ববিহীন করে দেওয়া বলা হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে এটি তাৎক্ষণিকভাবে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়—শত্রুর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর ফল কতটা স্থায়ী বা কার্যকর হয়, সে প্রশ্ন বহুবার উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যাকে নিজেদের বড় সামরিক ও রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আসলেই কি কোনো কৌশলগত বিজয় এসেছে, নাকি এটি ভবিষ্যতের আরও বড় অস্থিরতার সূচনা—এই বিতর্ক এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
যুদ্ধের সময় শত্রু নেতাকে হত্যা করলে তা রাজনৈতিকভাবে দ্রুত জনপ্রিয়তা এনে দিতে পারে। বিশেষ করে যখন কোনো দেশের জনগণ নিরাপত্তা বা প্রতিশোধের অনুভূতিতে উত্তেজিত থাকে, তখন এমন পদক্ষেপকে অনেকেই শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বলছে, নেতৃত্ব হত্যার কৌশল খুব কম ক্ষেত্রেই স্থায়ী সমাধান দিয়েছে। বরং বহু ক্ষেত্রে এর ফলে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা আরও উগ্র, কঠোর বা অনিশ্চিত নেতৃত্বের উত্থান ঘটিয়েছে। এই বাস্তবতা বিবেচনা করলে খামেনির মৃত্যুকে কেবল একটি সামরিক সাফল্য হিসেবে দেখা কঠিন।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর কেন্দ্রে ছিলেন। তাঁর বয়স ছিল ৮৬ বছর, এবং দীর্ঘদিন ধরেই শারীরিক অসুস্থতার কথা আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানের রাজনৈতিক অভ্যন্তরে তাঁর উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রস্তুতি আগে থেকেই চলছিল। ফলে তাঁকে হত্যা করা হলেও ক্ষমতার কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়বে—এমনটা নিশ্চিত নয়। বরং অনেক সময় দেখা যায়, এমন পরিস্থিতিতে নতুন নেতৃত্ব আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এ ধরনের উদাহরণ কম নয়। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত ও পরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা অনেকের কাছে স্বৈরশাসনের অবসান হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি ছিল জটিল। সাদ্দামের পতনের পর ইরাকে যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তা দ্রুতই নানা রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। সেই পরিস্থিতিতে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়াতে সক্ষম হয়। দুই দশকের মধ্যেই ইরাক আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল একটি শত্রুভাবাপন্ন শাসনের অবসান ঘটানো, কিন্তু বাস্তবে তা নতুন ধরনের শক্তির ভারসাম্য তৈরি করে।
এই অস্থিরতার আরেকটি ভয়াবহ ফল ছিল জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান। মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকে যে নিরাপত্তাশূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে জন্ম নেয় বিভিন্ন বিদ্রোহী সংগঠন। তাদের মধ্য থেকে আইএসআইএল বা আইএস নামে পরিচিত গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। হাজারো নিরীহ মানুষ নিহত হয়, শহর ধ্বংস হয়, এবং ইউরোপ পর্যন্ত বড় ধরনের শরণার্থী সংকট তৈরি হয়। এই ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হলে তার প্রভাব শুধু একটি দেশের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পুরো অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করে।
ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব হত্যার কৌশল বারবার প্রয়োগ করা হয়েছে। ২০০৪ সালে ইসরায়েল হামাসের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমেদ ইয়াসিনকে হত্যা করে। পরে তাঁর উত্তরসূরি আবদেল আজিজ রান্তিসিকেও হত্যা করা হয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, রান্তিসি তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী নেতা ছিলেন। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ড হামাসের শক্তি পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনের নেতৃত্ব আরও কঠোর ও কৌশলী হয়ে ওঠে। পরে ইয়াহিয়া সিনওয়ার গাজায় হামাসের নেতৃত্বে আসেন এবং তাঁর নেতৃত্বেই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে বড় হামলার পরিকল্পনা করা হয়। এই উদাহরণ অনেকের কাছে প্রমাণ করে যে নেতৃত্ব হত্যা কোনো আন্দোলনের আদর্শ বা ভিত্তিকে সহজে ধ্বংস করতে পারে না।
হিজবুল্লাহর ইতিহাসেও একই ধারা দেখা যায়। সংগঠনের আগের নেতা আব্বাস আল মুসাভিকে ইসরায়েল হত্যা করার পর হাসান নাসরাল্লাহ নেতৃত্বে আসেন। পরবর্তী সময়ে নাসরাল্লাহর নেতৃত্বে হিজবুল্লাহ আরও শক্তিশালী ও সংগঠিত হয়ে ওঠে। ফলে নেতৃত্ব হত্যার মাধ্যমে সংগঠন দুর্বল হবে—এই ধারণা বাস্তবে সব সময় সত্য প্রমাণিত হয়নি।
এই অভিজ্ঞতাগুলো সামনে রেখে অনেক বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন—ইরানের ক্ষেত্রে একই কৌশল প্রয়োগ করলে ফল কী হবে? ইরান শুধু একটি রাজনৈতিক রাষ্ট্র নয়; এটি একটি জটিল ধর্মীয়-রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে বিপ্লবী গার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, নির্বাচিত সরকার এবং বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্রের মধ্যে ভারসাম্য রয়েছে। ফলে একজন নেতার মৃত্যু পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেবে—এমনটা ধরে নেওয়া সহজ নয়। বরং এটি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে যেখানে নতুন নেতৃত্ব নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে আরও আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—খামেনির উত্তরসূরি কে হবেন এবং তিনি কেমন নীতি গ্রহণ করবেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার চেষ্টা চলছিল। মাসকাট ও জেনেভায় বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার সময় মধ্যস্থতাকারীরা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে খামেনির নেতৃত্বে ইরান কিছু ক্ষেত্রে সমঝোতার পথে যেতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু নতুন নেতৃত্ব সেই রাজনৈতিক সুযোগ বা আগ্রহ ধরে রাখবে কি না, তা এখন অনিশ্চিত। অনেক সময় রাজনৈতিক সংকটের সময় নতুন নেতা শক্ত অবস্থান নিয়ে ক্ষমতা সংহত করার চেষ্টা করেন, যা কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে থাকে এবং ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করে, তবে এর ফল কী হতে পারে তা অনুমান করা কঠিন। ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়লে তা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। সেই অস্থিতিশীলতার ঢেউ শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউরোপ পর্যন্ত তার প্রভাব পৌঁছে যায়। শরণার্থী সংকট, জঙ্গিবাদের বিস্তার এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা—সবই তখন একসঙ্গে দেখা দেয়।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জন্য এটি বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। সামনে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন, আর তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির কয়েকটি মামলা ঝুলছে। এসব মামলায় দণ্ডিত হলে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে একটি বড় সামরিক সাফল্যের দাবি তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারে। ইসরায়েলের সমাজেও নিরাপত্তা ও প্রতিরোধের প্রশ্নে শক্ত অবস্থানকে অনেক সময় ব্যাপক সমর্থন দেওয়া হয়।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে হিসাবটি কিছুটা ভিন্ন। আমেরিকান জনগণের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিনের যুদ্ধ থেকে ক্লান্ত। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এখনো রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসে। এর মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক বিভাজন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন সময়ে দূরদেশের একজন অসুস্থ বৃদ্ধ নেতাকে হত্যা করা কতটা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হবে—এই প্রশ্ন অনেক বিশ্লেষক তুলছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। সরাসরি বড় আকারের যুদ্ধ শুরু করলে তার অর্থনৈতিক ও মানবিক খরচ বিপুল হতে পারে। তাই আপাতত বিমান হামলা ও সীমিত সামরিক পদক্ষেপের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সামরিক অভিযান দীর্ঘদিন ধরে চালানো সম্ভব নয়। একসময় না একসময় যুক্তরাষ্ট্রকে বিমান হামলা বন্ধ করতে হবে এবং সেনা ফিরিয়ে নিতে হবে। তখন প্রশ্ন উঠবে—পেছনে কী রেখে যাওয়া হলো?
যদি ইরানে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়, তবে তার প্রভাব প্রথমে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই ইতিমধ্যে নানা সংঘাত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে রয়েছে। নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও জবাবদিহির প্রশ্ন উঠতে পারে—এই সামরিক পদক্ষেপের কৌশলগত লাভ আসলে কী।
সম্ভবত ভবিষ্যতে ইতিহাস এই ঘটনাকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি সামরিক অধ্যায় হিসেবে মূল্যায়ন করবে—যেখানে বিপুল অর্থ, সামরিক শক্তি এবং কূটনৈতিক প্রভাব ব্যয় হয়েছে, কিন্তু প্রত্যাশিত স্থায়ী ফল পাওয়া যায়নি। যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব হত্যা কখনো কখনো তাৎক্ষণিক বিজয়ের অনুভূতি এনে দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। কোনো আন্দোলন, আদর্শ বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কেবল একজন নেতাকে সরিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ বদলে ফেলা খুব কম ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়েছে।
সম্ভবত একদিন ওয়াশিংটন এবং তার মিত্ররা আবার উপলব্ধি করবে যে সামরিক শক্তি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না। মধ্যপ্রাচ্যের মতো জটিল অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি অর্জনের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান, কূটনৈতিক ধৈর্য এবং পারস্পরিক সমঝোতা। নেতৃত্ব হত্যা সেই পথকে কখনো কখনো আরও কঠিন করে তোলে—এটাই হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
আপনার মতামত জানানঃ