ভারত মহাসাগর দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত মঞ্চ। এই মহাসাগর দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল, পণ্য এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। এ কারণেই বিশ্বের বড় শক্তিগুলো সব সময়ই এই অঞ্চলকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শক্তিধর দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা চলে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ভারত মহাসাগরে মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় ডুবে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ঘটনাটি শুধু একটি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, ভারতের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বার্তা—সবকিছুই নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে।
গত অক্টোবরের শেষ দিকে ভারতীয় নৌবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন যে ভারতীয় নৌবাহিনী ভারত মহাসাগরের ‘অভিভাবক’। সেই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষায় ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মহাসাগর দিয়ে বিশ্বের বিশাল অংশের বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ পরিচালিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু ভারতের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মোদির বক্তব্যে জাতীয় গর্বের আবহ তৈরি হয়েছিল এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর শক্তি ও সক্ষমতার প্রশংসা শোনা গিয়েছিল।
কিন্তু সেই ঘোষণার কয়েক মাসের মধ্যেই এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা ভারতের সেই ‘অভিভাবক’ পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ভারতের আমন্ত্রণে আয়োজিত নৌ-মহড়া ‘মিলন’-এ অংশ নিয়ে নিজ দেশে ফেরার পথে ইরানের যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় ডুবে যায়। শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূল থেকে মাত্র ৪৪ নটিক্যাল মাইল দূরে এই হামলা সংঘটিত হয়। ঘটনাটি ঘটেছে এমন এক সময়, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।
এই যুদ্ধজাহাজটি ভারতের বিশাখাপত্তনম বন্দরে অনুষ্ঠিত নৌ-মহড়ায় অংশ নিয়েছিল। সেই মহড়ায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে নানা আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু নিজেও সেই সময় যুদ্ধজাহাজটির নাবিকদের সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন। কিন্তু মহড়া শেষ করে দেশে ফেরার সময় আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই জাহাজটি মার্কিন হামলার শিকার হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ডুবে যায়। জাহাজটিতে থাকা ৮০ জনের বেশি ইরানি নাবিক নিহত হন এবং অনেকে নিখোঁজ হন। এই ঘটনা ইরানে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে এই হামলা ছিল একটি পরিকল্পিত সামরিক পদক্ষেপ। তাদের মতে, ইরান হয়তো ভেবেছিল আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাদের জাহাজ নিরাপদ থাকবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেন্টাগনে সাংবাদিকদের বলেন যে একটি মার্কিন সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডো ইরানের যুদ্ধজাহাজটিকে ডুবিয়ে দিয়েছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত একটি শক্ত বার্তা দিয়েছে যে তারা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও সম্প্রসারণে প্রস্তুত।
ইরান এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবিকতার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন যে ইরানের উপকূল থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এমন একটি হামলা নৃশংসতার শামিল এবং এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে একদিন অবশ্যই মূল্য দিতে হবে। ইরান বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে যুদ্ধজাহাজটি ভারতের আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে একটি নৌ-মহড়ায় অংশ নিয়েছিল এবং মহড়া শেষে দেশে ফেরার সময় হামলার শিকার হয়েছে। ফলে এই ঘটনা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ভারতের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া এই ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি। জাহাজটি আক্রান্ত হওয়ার পরপরই ভারতের কাছ থেকে কোনো তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরে ভারতীয় নৌবাহিনী একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেয়, যেখানে বলা হয় যে বিপদসংকেত পাওয়ার পর তারা উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী উদ্ধার অভিযান শুরু করে দিয়েছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভারত এই হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সমালোচনা করেনি।
এই নীরবতা থেকেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ভারত কি এই হামলার বিষয়ে আগে থেকেই জানত, নাকি তারা পুরোপুরি অন্ধকারে ছিল? যদি ভারত আগে থেকে জানত, তবে সেটি ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। আবার যদি তারা না জানত, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারত্বের গভীরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
ভারতের সাবেক নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ এই ঘটনাকে ভারতের জন্য একটি কৌশলগত দোটানা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত জটিল। কারণ একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার, অন্যদিকে ইরানও ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ।
অন্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই ঘটনার মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে ভারতের প্রভাব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এতদিন ভারত মহাসাগরকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই অঞ্চলেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এর ফলে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত পরিকল্পনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলো মোদি সরকারের নীরবতার সমালোচনা করছে। কংগ্রেস নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছেন যে সরকার এই ঘটনায় ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের নীরবতা ভারতের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতিকে দুর্বল করে দিয়েছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে ‘জোট নিরপেক্ষ’ পররাষ্ট্রনীতির জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ভারতের এই অবস্থান তাদের জন্য নতুন ধরনের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কারণ একদিকে তারা পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না।
এই ঘটনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে যে তারা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বরং বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলেও তাদের সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে এটি ইরানকে সতর্ক করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ইরানের যুদ্ধজাহাজ ডেনা ডুবে যাওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি সামরিক হামলা নয়; বরং এটি বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক সমীকরণের জটিল বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। ভারত মহাসাগরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের ইঙ্গিত বহন করতে পারে। ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা ক্রমেই আরও কঠিন হয়ে
আপনার মতামত জানানঃ