এক সময় মনে করা হতো, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো অ্যান্টিবায়োটিক। সংক্রমণ মানেই আর নিশ্চিত মৃত্যু নয়—এই আত্মবিশ্বাসই গত শতাব্দীতে মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই ভরসার জায়গাতেই এখন গভীর ফাটল ধরছে। ওষুধ কাজ করছে না, সংক্রমণ থামছে না, আর হাসপাতাল—যা হওয়ার কথা ছিল নিরাপত্তার আশ্রয়—সেখানেই জন্ম নিচ্ছে নতুন বিপদ। এই বাস্তবতার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রতীক হয়ে উঠেছে একটি অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গাল-প্রতিরোধী ছত্রাক: ক্যানডিডা অরিয়াস।
এই ছত্রাককে ‘বিপজ্জনক’ আখ্যা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কারণ এটি শুধু সংক্রমণ ঘটায় না, প্রচলিত চিকিৎসার প্রায় সব অস্ত্রকে অকার্যকর করে দিতে পারে। সংক্রমিত ব্যক্তির ত্বক, ক্ষতস্থান বা শরীরের নিঃসৃত তরলের সংস্পর্শে এলেই ছড়িয়ে পড়তে পারে এই ছত্রাক। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এটি খুব দ্রুত রক্তপ্রবাহে ঢুকে পড়ে এবং সেখান থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে, যার পরিণতি অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক সেপসিস বা মৃত্যু।
বিশ্বজুড়ে হাসপাতালগুলিই এই ছত্রাকের প্রধান বিস্তারক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। আইসিইউ, ভেন্টিলেশনে থাকা রোগী, দীর্ঘদিন ক্যাথিটারের মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়া মানুষ—এরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। রক্তচাপ মাপার যন্ত্র, বিছানার রেলিং, ক্যাথিটার, এমনকি চিকিৎসাকর্মীদের গ্লাভসেও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে ক্যানডিডা অরিয়াস। সাধারণ জীবাণুনাশক দিয়েও একে পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। ফলে একবার কোনও হাসপাতালে ঢুকে পড়লে, সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা রীতিমতো দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
আমেরিকার অন্তত ২৭টি রাজ্যে এই ছত্রাকের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সতর্কতা জারি করেছে সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ক্যানডিডা অরিয়াস শুধু দ্রুত ছড়াচ্ছে না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। একসময় যে অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধগুলো কার্যকর ছিল, সেগুলোও এখন অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ।
ভারতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় ভারতের কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ জানিয়েছে, বহু ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, সংক্রমণ হলে চিকিৎসকদের হাতে বিকল্প কমে যাচ্ছে। আগে যেখানে একটি বা দুটি ওষুধ বদলালেই কাজ হতো, এখন সেখানে একের পর এক ওষুধ ব্যর্থ হচ্ছে। ক্যানডিডা অরিয়াস এই সংকটের সবচেয়ে চরম উদাহরণ, কারণ এটি অনেক ক্ষেত্রেই ‘মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট’—একাধিক শ্রেণির ওষুধের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
এই ছত্রাক কেন এত বিপজ্জনক, তার একটি বড় কারণ হলো শনাক্তকরণের জটিলতা। সাধারণ পরীক্ষায় একে অনেক সময় অন্য ক্যানডিডা প্রজাতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। ফলে সঠিক চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়। আর দেরি মানেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ। অনেক উন্নত দেশেও এই ভুল শনাক্তকরণের কারণে রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে, যেখানে উন্নত ল্যাব সুবিধা সীমিত, সেখানে ঝুঁকি আরও বেশি।
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, এই সংক্রমণ শুধু দুর্বল রোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যদিও যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, দীর্ঘদিন অসুস্থ, ক্যানসার, কিডনি বা লিভারের রোগে ভুগছেন—তাদের ঝুঁকি বেশি, তবু হাসপাতাল পরিবেশে এটি অন্যদের শরীরেও ছড়াতে পারে। অর্থাৎ, একবার কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ক্যানডিডা অরিয়াস প্রবেশ করলে, তা শুধু কয়েকজন রোগীর সমস্যা থাকে না; পুরো ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এই সংকট আমাদের আরেকটি অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার। গত কয়েক দশকে প্রয়োজন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, অসম্পূর্ণ ডোজ নেওয়া, ভাইরাল সংক্রমণেও অ্যান্টিবায়োটিক সেবন—এই সব মিলিয়ে জীবাণুগুলোকে আমরা নিজেরাই শক্তিশালী করে তুলেছি। ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি ছত্রাকও সেই সুযোগ নিয়েছে। ক্যানডিডা অরিয়াস যেন আমাদেরই তৈরি করা এক ‘সুপার প্যাথোজেন’, যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে, যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ক্যানডিডা অরিয়াস সেই ভবিষ্যতের একটি আগাম সংকেত। এটি দেখাচ্ছে, নতুন ওষুধ আবিষ্কারের গতি যতটা দ্রুত হওয়া দরকার, বাস্তবে তা হচ্ছে না। ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত। অন্যদিকে জীবাণুর বিবর্তন দ্রুত ও নির্মম।
এই অবস্থায় প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। হাসপাতালগুলিতে কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নিয়মিত স্ক্রিনিং, যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার উন্নত পদ্ধতি—এই সবকিছু ছাড়া এই ছত্রাককে আটকানো কঠিন। একই সঙ্গে প্রয়োজন অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গাল ব্যবহারে শৃঙ্খলা। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন বন্ধ করা, পুরো কোর্স সম্পন্ন করা এবং সংক্রমণ হলেই অযথা ওষুধ না খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
ক্যানডিডা অরিয়াস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি কখনোই চূড়ান্ত নয়। মানুষ যত এগোয়, জীবাণুরাও তত বদলে যায়। এই লড়াইয়ে আত্মতুষ্টির জায়গা নেই। আজ যে ওষুধ জীবন বাঁচাচ্ছে, কাল সেটিই অকেজো হয়ে যেতে পারে। তাই এই ছত্রাকের বিস্তার শুধু একটি চিকিৎসা সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সতর্কবার্তা। যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, তাহলে এমন এক সময় আসতে পারে, যখন সংক্রমণ মানেই আবারও অসহায়তা—ওষুধ হাতে নিয়েও বাঁচার নিশ্চয়তা থাকবে না।
আপনার মতামত জানানঃ