মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। অঞ্চলটির সামরিক ভারসাম্য, জ্বালানি রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশটির প্রভাব এতটাই গভীর যে ইরানকে কেন্দ্র করে যেকোনো সংঘাত দ্রুত বৈশ্বিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর আবারও সেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন উত্তেজনার জন্ম হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই বড় ধরনের আঘাতের পরও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়বে না বলে অনেক আগেই সতর্ক করেছিলেন খোদ মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনটেলিজেন্স কাউন্সিল বা এনআইসি কয়েক মাস আগে একটি গোপন বিশ্লেষণী প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানও চালায়, তবুও দেশটির ইসলামি শাসনব্যবস্থা সহজে ভেঙে পড়বে না। ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো এতটাই সংগঠিত ও কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী যে একটি বড় আঘাতের পরও তারা দ্রুত ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবে। ওয়াশিংটন পোস্টকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এমন কয়েকটি সূত্র, যারা ওই গোপন প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবগত।
মার্কিন প্রশাসনের অনেকেই মনে করেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা একটি ব্যক্তিনির্ভর কাঠামো। অর্থাৎ সর্বোচ্চ নেতা বা শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রক্রিয়া আগে থেকেই নির্ধারিত। ফলে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু হলেও ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
এই বিশ্লেষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপটে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। হামলার পর থেকেই ইরানের ওপর আকাশ ও সমুদ্রপথে ব্যাপক বোমাবর্ষণ চলছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। একই সঙ্গে সংঘাতের পরিধিও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। পূর্ব দিকে ভারত মহাসাগর এলাকায় সাবমেরিন যুদ্ধের খবর পাওয়া যাচ্ছে, আর পশ্চিম দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তুরস্কের সীমান্তের কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, তাঁর লক্ষ্য শুধু ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করা নয়, বরং দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া। তিনি বলেছেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়ে দেশটিতে নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি কার্যত ইরানে শাসন পরিবর্তনের পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমন পরিকল্পনার সফলতা নিয়ে গুরুতর সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
এনআইসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হলেও দেশটির ধর্মীয় ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামোতে ধর্মীয় নেতৃত্ব, বিপ্লবী গার্ড, বিচারব্যবস্থা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সমন্বিত শক্তির ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। ফলে একটি ব্যক্তিকে সরিয়ে দিলেই পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্লেষকেরা আরও মনে করেন, ইরানের ভেতরে যে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো রয়েছে, তারা এখনো এতটা সংগঠিত নয় যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে তা দ্রুত দখল করতে পারবে। বিভিন্ন মতাদর্শ, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে বিরোধী দলগুলো বিভক্ত। ফলে একটি সামরিক অভিযানের পর তারা একত্র হয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করবে—এমন সম্ভাবনাও খুব কম বলে মনে করা হচ্ছে।
এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ অতীতেও দেখা গেছে, কোনো দেশের শাসককে সরিয়ে দিলেই সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে না। বরং অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধের জন্ম দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে বড় উদাহরণ। সেসব দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাত ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
ইরানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দেশটির সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি, শুধু একটি সামরিক শক্তিই নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কৌশলগত কর্মকাণ্ডে তাদের প্রভাব রয়েছে। ফলে শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকেরা আরও বলেন, ইরানের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্মীয় আদর্শ একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দেশটির রাজনৈতিক পরিচয় ও জাতীয়তাবাদী চেতনার সঙ্গে ধর্মীয় নেতৃত্ব গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। তাই বাইরের শক্তির চাপ বা সামরিক আক্রমণ অনেক সময় উল্টো জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্য তৈরি করে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বাইরের হুমকির মুখে ইরানের জনগণ নিজেদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পক্ষে একত্র হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ইরানবিষয়ক গবেষক স্যুজান মালোনি বলেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামো সম্পর্কে গভীর বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই এনআইসি এই পূর্বাভাস দিয়েছে। তাঁর মতে, ইরানের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় ধরে এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে তারা সংকটের সময় নিজেদের টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা রাখে। তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন যে সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি হয়তো ওই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়নি।
বিশেষ করে একটি বড় প্রশ্ন এখনো অনিশ্চিত—যদি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি স্থলসেনা পাঠায় বা ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে পরিস্থিতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে। আবার দেশটির কুর্দি জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে কোনো সশস্ত্র আন্দোলন তৈরি হলে সেটিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। এসব সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি বিশ্লেষণ করা হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপরও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশ। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত সমুদ্রপথ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়েই পরিচালিত হয়। ফলে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু এবং চলমান সামরিক চাপের মধ্যে দেশটির নেতৃত্ব কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে, সেটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল রয়েছে। তবে অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে সংকটের সময় তারা দ্রুত নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণ করতে পারে।
এই বাস্তবতায় মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সতর্কবার্তাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ একটি বড় সামরিক আক্রমণ সব সময় রাজনৈতিক পরিবর্তন নিশ্চিত করে না। অনেক সময় তা বরং বিপরীত ফলও বয়ে আনতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তখন নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য আরও কঠোর হয়ে ওঠে এবং সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি সব সময়ই জটিল এবং বহুস্তরবিশিষ্ট। এখানে ধর্ম, ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, ভূরাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতা—সবকিছু মিলিয়ে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ইরান সেই বাস্তবতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তাই দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে ফেলা বা পরিবর্তন করা কোনো সহজ বিষয় নয়।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি সামরিক সংঘাতের গল্প নয়; এটি একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, আঞ্চলিক শক্তিগুলো এবং বিশ্বশক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ এখানে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই সংঘাত কোন দিকে যাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো এত সহজে ভেঙে পড়বে না বলে যে সতর্কবার্তা মার্কিন গোয়েন্দারা আগে দিয়েছিলেন, সেটি এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
এই পরিস্থিতি বিশ্বকে আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সামরিক শক্তি সব সময় রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কোনো রাষ্ট্রের গভীরে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, সামাজিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা অনেক সময় বাহ্যিক চাপের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইরানের বর্তমান সংকট সেই বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ হয়ে
আপনার মতামত জানানঃ