বিদেশে পাড়ি দেওয়ার সময় অনেক নারীই মনে করেন—এটাই হয়তো তাঁদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব বা সংসারের চাপ থেকে মুক্তি পেতে তাঁরা পাসপোর্ট হাতে তুলে নেন, অচেনা দেশে পা রাখেন নতুন ভবিষ্যতের আশায়। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ অনেক সময় শেষ হয় নির্যাতন, অপমান কিংবা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিনে তাই এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই নারী শ্রমিকরা কি সত্যিই নিরাপদ?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় উৎস এই শ্রমবাজার। দীর্ঘদিন ধরে পুরুষ শ্রমিকরা এই বাজারের মূল অংশ হলেও গত কয়েক দশকে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণও দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে হাজারো নারী দেশ ছেড়েছেন। তাঁদের অনেকেই দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা, যাঁদের কাছে বিদেশে কাজের সুযোগ মানে পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নতির সম্ভাবনা। সন্তানদের পড়াশোনা, বাড়ির ঋণ পরিশোধ কিংবা পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তাঁরা অজানা পথে পা বাড়ান।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য বলছে, বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিকদের বিদেশ যাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ সালে। শুরুতে সংখ্যা ছিল খুবই সীমিত। কয়েক হাজার নারী বিদেশে গিয়েছিলেন, বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ২০০৪ সালের পর নারী অভিবাসন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো বছরে ৫০ হাজারের বেশি নারী বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে যান। এরপর ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর জন্য সরকারিভাবে চুক্তি হওয়ার পর এই সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়ে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর এক লাখের বেশি নারী বিদেশে গিয়েছেন। সে সময় মোট শ্রম অভিবাসনের প্রায় ১৬ শতাংশই ছিলেন নারী।
কিন্তু সংখ্যার এই বৃদ্ধির আড়ালে লুকিয়ে ছিল নানা অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি। বিদেশে গিয়ে অনেক নারীই প্রত্যাশিত কর্মপরিবেশ পান না। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার কারণে তাঁদের কর্মক্ষেত্র থাকে বাড়ির ভেতরে, যেখানে শ্রম আইন বা নজরদারি অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকরভাবে প্রযোজ্য হয় না। ফলে নির্যাতন বা শোষণের ঘটনা ঘটলেও তা অনেক সময় প্রকাশ্যে আসে না।
করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ২০২২ সালে আবারও নারী অভিবাসনের সংখ্যা কিছুটা বাড়ে। সে বছর ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন নারী বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে যান। কিন্তু এরপর থেকেই পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। ২০২৫ সালে বিদেশে গেছেন মাত্র ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী, যা মোট অভিবাসী শ্রমিকের মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২২ সালের তুলনায় এটি প্রায় ৪১ শতাংশ কম। এই পতন শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আস্থার সংকটের ইঙ্গিত দেয়। অনেক পরিবার এখন নারী সদস্যকে বিদেশে পাঠাতে দ্বিধা বোধ করছে।
অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, বিদেশে নিরাপদ কর্মপরিবেশের অনিশ্চয়তা এবং গৃহের ভেতরে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলো নারী অভিবাসনের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। কারণ গৃহকর্মীরা সাধারণত একটি পরিবারের ভেতরে কাজ করেন, যেখানে তাঁদের ওপর মালিকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা থাকে না, ফোন ব্যবহারেও বাধা দেওয়া হয়। ফলে নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও তা জানানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
বিদেশে গিয়ে নারী শ্রমিকরা সাধারণত তিন ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হন। প্রথমত অর্থনৈতিক শোষণ। অনেক সময় চুক্তি অনুযায়ী বেতন দেওয়া হয় না, কিংবা বেতন মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করেন যে তাঁদের একাধিক বাড়িতে কাজ করতে বাধ্য করা হয়, যদিও চুক্তিতে এমন কিছু উল্লেখ থাকে না। দ্বিতীয়ত শারীরিক নির্যাতন। কাজের সামান্য ভুল কিংবা অতিরিক্ত কাজ করতে না পারার কারণে মারধর, অপমান বা মানসিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে ভয়াবহ হলো যৌন নির্যাতন। অনেক নারী কর্মী অভিযোগ করেছেন যে তাঁদের ওপর যৌন সহিংসতা চালানো হয়েছে, কিন্তু সেই অভিযোগ প্রকাশ করার সাহস তাঁরা পাননি।
এই নির্যাতনের অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না। কারণ অনেক নারী ভয় পান—অভিযোগ করলে হয়তো তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে অথবা আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। আবার সমাজে ফিরে এসে লজ্জা বা অপবাদে পড়ার আশঙ্কাও তাঁদের নীরব করে দেয়। ফলে বহু ঘটনা অন্ধকারেই থেকে যায়।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরেছে। সরকারি নথিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আত্মহত্যা। কিন্তু অনেক পরিবার দাবি করেছে, মরদেহে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। তাই প্রশ্ন উঠেছে—যে নারী পরিবার চালাতে বিদেশে যায়, সে কি সত্যিই এত সহজে আত্মহত্যা করে? নাকি সেই মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে থাকে নির্যাতনের অন্ধকার ইতিহাস?
বিদেশে কাজ করতে গিয়ে শুধু মৃত্যুই নয়, অনেক নারী বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসেন নানা দুর্ভোগের কারণে। বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসা নারীদের নির্ভুল পরিসংখ্যান নেই। তবে ধারণা করা হয় গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরে এসেছেন। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে এক বছরেই দেশে ফিরে আসেন ৪৯ হাজার ২২ জন নারী শ্রমিক। আবার ২০১৯ সালে বন্দি বা ডিপোর্টি হিসেবে দেশে ফিরেছিলেন ৩ হাজার ১৪৪ জন নারী। পরবর্তী বছরগুলোতেও এই প্রত্যাবর্তনের ধারা অব্যাহত রয়েছে।
শুধু সৌদি আরব থেকেই ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১৫ হাজারের বেশি নারী দেশে ফিরে এসেছেন। তাঁদের অনেকেই কাজের পরিবেশ নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু দেশে ফিরে এসে অনেকেই এসব অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে চান না। কারণ সমাজে ফিরে এসে তাঁদের আবার নতুন করে সংগ্রাম শুরু করতে হয়। অনেক সময় পরিবার বা প্রতিবেশীরাও তাঁদের প্রতি সহানুভূতির বদলে সন্দেহ বা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকায়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে এই খাতে আস্থার সংকট আরও বাড়বে। বিদেশে পাঠানোর আগে নারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। শুধু কাজের দক্ষতা নয়, তাঁদের আইনি অধিকার, জরুরি যোগাযোগের উপায় এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নারী শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে স্থানীয় ভাষা জানেন না, আইন সম্পর্কে ধারণা নেই, ফলে সমস্যায় পড়লে তাঁরা কোথায় যাবেন তা বুঝতে পারেন না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগাযোগের সুযোগ। প্রতিটি নারী শ্রমিকের কাছে মোবাইল ফোন থাকা এবং পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিপদে পড়লে দ্রুত দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে যে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও নারী শ্রমিকরা যথাসময়ে সহায়তা পান না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিচার নিশ্চিত করা। নির্যাতনের অভিযোগ এলে তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার করতে হবে। কারণ বিচারহীনতা অন্যায়কে উৎসাহিত করে। যদি নির্যাতনের ঘটনা ঘটার পর অপরাধীরা শাস্তি না পায়, তাহলে একই ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে।
নারী অভিবাসনের প্রশ্নটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি মানবাধিকারের প্রশ্নও। একজন নারী যখন বিদেশে কাজ করতে যান, তখন তিনি শুধু নিজের নয়, পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তাঁর উপার্জনের ওপর নির্ভর করে অনেক পরিবারের জীবনযাত্রা। তাই তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব।
বিশ্বের অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হয়েছে সেটাই আসল প্রশ্ন। বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের বাস্তবতা সেই প্রশ্নটিকে আরও তীব্র করে তোলে। কারণ একদিকে তাঁরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, অন্যদিকে অনেকেই নির্যাতন ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস তাই শুধু উদ্যাপনের দিন নয়, আত্মসমালোচনারও দিন। এই দিনে আমাদের ভাবতে হবে—যে নারীরা পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে বিদেশে পাড়ি দেন, তাঁদের জন্য আমরা কতটা নিরাপদ ব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছি। তাঁদের স্বপ্ন যেন দুঃস্বপ্নে পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।
কারণ একজন নারী শ্রমিকের কান্না শুধু একজন মানুষের কান্না নয়। সেটি একটি পরিবারের, একটি সমাজের এবং শেষ পর্যন্ত একটি দেশের কান্না। তাই আন্তর্জাতিক নারী দিবসে প্রতিশ্রুতি হওয়া উচিত—ভাগ্যের সন্ধানে বিদেশে যাওয়া কোনো নারী যেন আর লাশের বাক্স হয়ে দেশে না ফেরেন।
আপনার মতামত জানানঃ