বাংলাদেশে আইনের শাসন একটি বহু উচ্চারিত শব্দবন্ধ—রাজনৈতিক বক্তৃতা, আন্দোলনের স্লোগান, আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন—সবখানেই এর উপস্থিতি। কিন্তু বাস্তবতা বারবার দেখিয়ে দেয়, এই ধারণাটি কতটা ভঙ্গুর এবং কত সহজেই চাপের কাছে নতিস্বীকার করে। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতার প্রকাশ্য হুমকি, তার পরে দেরিতে গ্রেপ্তার এবং রাতভর বিক্ষোভের মুখে দ্রুত জামিন ও মুক্তির ঘটনাটি সেই ভঙ্গুরতারই এক নগ্ন উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ঘটনাটি আর শুধু একটি ব্যক্তির আইনভঙ্গ বা আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ছড়িয়ে পড়েছে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, পুলিশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন রূপ নিয়ে গভীর আলোচনায়।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। একটি থানার ভেতরে, পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সামনে বসে একজন ছাত্রনেতা উচ্চস্বরে দাবি করছেন—তারা একটি থানা পুড়িয়েছেন, একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে জ্বালিয়ে হত্যা করেছেন। টেবিল চাপড়ে কথা বলা, প্রশাসনকে নিজের অধস্তন হিসেবে বর্ণনা করা, এবং ‘আমরাই গভর্নমেন্ট ফর্ম করেছি’—এই ভাষা কেবল দম্ভের নয়, এটি ক্ষমতার এক বিপজ্জনক প্রকাশ। সেই ছাত্রনেতা হলেন মাহদী হাসান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক।
এই বক্তব্য যে কোনো স্বাভাবিক আইনি ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কারণ হওয়ার কথা। থানার ভেতরে বসে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া, হুমকি দেওয়া এবং গুরুতর অপরাধের সঙ্গে নিজেদের জড়িত থাকার দাবি—সবকিছুই ফৌজদারি আইনের আওতায় পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরও কেন তাৎক্ষণিকভাবে মাহদী হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। কেন অপেক্ষা করা হলো জনমতের চাপ ও সমালোচনার ঢেউ ওঠা পর্যন্ত। এই দেরিই অনেকের কাছে ইঙ্গিত দেয়, আইন এখানে নিজস্ব গতিতে নয়, বরং পরিস্থিতি ও শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে চলেছে।
শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও ঘটনাপ্রবাহ থেমে থাকেনি। গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হবিগঞ্জে এবং ঢাকায় শুরু হয় বিক্ষোভ। থানার সামনে রাতভর অবস্থান নেন তার সমর্থকেরা। দাবি ওঠে, রাতেই আদালত বসিয়ে জামিন দিতে হবে। সংগঠনের পক্ষ থেকে আলটিমেটাম দেওয়া হয়, শুধু জামিন নয়, নিঃশর্ত মুক্তি চাই। এখানেই আইনের শাসনের প্রশ্নটি সবচেয়ে তীব্রভাবে সামনে আসে—কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর, বিচারিক প্রক্রিয়া কি আদৌ চাপমুক্তভাবে চলতে পারে, যদি রাস্তায় শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেই ফল নির্ধারিত হয়ে যায়?
পরদিন সকালে আদালতে হাজির করা হলে মাহদী হাসান জামিন পান। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে জামিন পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়; এটি অভিযুক্তের অধিকার। কিন্তু জামিনের পর আদালত প্রাঙ্গন থেকেই আনন্দ মিছিল বের হওয়া, শহর প্রদক্ষিণ করা এবং এটিকে রাজনৈতিক বিজয়ের মতো উপস্থাপন করা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর বার্তা দেয়। যেন গ্রেপ্তার ও জামিন পুরো ঘটনাই ছিল একটি ক্ষমতার পরীক্ষা, যেখানে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে পেছনে ঠেলে দেওয়া হলো।
এই ঘটনাকে আলাদা করে দেখা যায় না বানিয়াচং থানার ভয়াবহ স্মৃতির প্রেক্ষাপট থেকে। ২০২৫ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের দিনে বানিয়াচংয়ে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ক্ষুব্ধ জনতা থানায় হামলা চালায়, অস্ত্র লুট হয়, পুলিশ সদস্যদের অবরুদ্ধ করা হয়। গভীর রাতে এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে থানা থেকে টেনে বের করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, পরদিন তার মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ইতিহাসে এক ভয়ংকর অধ্যায়। মাহদী হাসান দাবি করেছেন, তিনি সেদিন ঘটনাস্থলে ছিলেন না। কিন্তু থানার ভেতরে বসে সেই হত্যাকাণ্ডের দায় নিজেদের কাঁধে নেওয়ার মতো বক্তব্য দেওয়া—অসাবধানতাবশত হোক বা দম্ভ থেকে—তা সমাজে কী বার্তা দেয়, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীরা এই ঘটনায় দ্বিধাবিভক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, কেবল কথার ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। আইন অনুযায়ী, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির নির্দিষ্ট শর্ত আছে। থানায় উত্তেজনার মধ্যে বলা কথা ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি নয়। এই যুক্তি আইনের বইয়ের পাতায় ঠিকই আছে। কিন্তু অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের শাসন কেবল ধারা-উপধারার বিষয় নয়; এটি একটি সংস্কৃতি। যেখানে ক্ষমতাবান কেউ প্রকাশ্যে সহিংসতার দাবি করে এবং তার পরও যদি শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে মুক্তি পায়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে আইনের বিশ্বাস ক্ষয়ে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক মনে করেন, এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এটি ক্ষমতার ধারাবাহিক অপব্যবহারের নতুন সংস্করণ। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক পালাবদল হলেও আচরণগত পরিবর্তন আসছে না। অতীতে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন যেভাবে প্রভাব খাটাত, এখন ভিন্ন পরিচয়ে সেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদাবাজি, মব তৈরি, প্রশাসনের ওপর চাপ—এসব ঘটনা মানুষকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে, আদৌ কি কোনো গুণগত পরিবর্তন এসেছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, পুলিশকে হেয় করা বা দুর্বল প্রমাণ করার চেষ্টা কোনোভাবেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য সহায়ক নয়। তিনি স্বীকার করেন, আইনের দৃষ্টিতে সব বক্তব্য সমান গুরুত্ব পায় না। কিন্তু সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব বক্তব্যের প্রভাব গভীর। পুলিশ যদি মনে করে, তাদের সিদ্ধান্ত সবসময় রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে, তাহলে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কেন থানার ভেতরে এমন আচরণ হতে দেওয়া হলো? কেন তখনই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে খুব কমই বলা হয়েছে। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এই নীরবতাও অনেকের কাছে অর্থবহ। নীরবতা কখনো কখনো ব্যাখ্যার চেয়েও বেশি কিছু বলে দেয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সেই আন্দোলনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈধতা আছে। কিন্তু আন্দোলনের ইতিহাস কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না। বরং যাদের হাত ধরে পরিবর্তনের স্বপ্ন তৈরি হয়, তাদের কাছ থেকেই মানুষ বেশি দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে। যখন সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায়, হতাশা আরও গভীর হয়।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে আইনের শাসনের ধারণার। সাধারণ মানুষ দেখছে—থানার ভেতরে হুমকি, দম্ভ, সহিংসতার দাবি; তারপর গ্রেপ্তার; তারপর রাতভর বিক্ষোভ; তারপর জামিন ও বিজয় মিছিল। এই দৃশ্যপট আইনকে নয়, শক্তিকে প্রাধান্য দেয়। এতে একটি বিপজ্জনক বার্তা যায়—যদি যথেষ্ট লোক জড়ো করা যায়, যদি যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করা যায়, তাহলে আইন নিজের পথ বদলাতে বাধ্য হয়।
আইনের শাসন মানে কেবল আদালত বা পুলিশ নয়; এটি একটি সামাজিক চুক্তি। যেখানে নাগরিকরা বিশ্বাস করে, আইন সবার জন্য সমান। কিন্তু যখন এই বিশ্বাস ক্ষয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। মাহদী হাসানের গ্রেপ্তার ও মুক্তির ঘটনা সেই ক্ষয়ের আরেকটি দাগ হয়ে রইল। এটি হয়তো সময়ের সঙ্গে খবরের শিরোনাম থেকে সরে যাবে, কিন্তু যে প্রশ্নগুলো রেখে গেল—আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি ক্ষমতার কাছে তা নতজানু—সেগুলো সহজে মিলিয়ে যাবে না।
আপনার মতামত জানানঃ