বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ভৌগোলিক নৈকট্য, ইতিহাসের গভীরতা, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পারস্পরিক নির্ভরতা—সব মিলিয়ে এই সম্পর্ক কখনো সহযোগিতার, কখনো টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, তার পটভূমিতে দিল্লির সাম্প্রতিক কয়েকটি কূটনৈতিক উদ্যোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন—এই দুই ঘটনা একসঙ্গে দেখলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ভারতের আগ্রহের একটি স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়।
প্রায় চার বছর পর ভারতের কোনো প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বাংলাদেশ মিশনে যাওয়া নিজেই একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। তার ওপর সেটি যদি হয় এমন এক সময়ে, যখন দুই দেশের সম্পর্ক নানা কারণে উত্তপ্ত—তাহলে এর তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়। খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাজনাথ সিং যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানে কেবল শোক প্রকাশ নয়, বরং বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক জোরদারে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি কূটনীতির ভাষায় একটি শক্ত ইঙ্গিত, যেখানে ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধার আড়ালে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশও লুকিয়ে থাকে।
এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, তা কেবল রাজনৈতিক নয়, কূটনৈতিক স্তরেও গভীর প্রভাব ফেলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে দুই দেশের কূটনীতিকদের পাল্টাপাল্টি তলব, যা সম্পর্কের সংকটকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে দিল্লি থেকে আসা সাম্প্রতিক বার্তাগুলোকে অনেকেই সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চার ঘণ্টার ঝটিকা সফরে তিনি শুধু আনুষ্ঠানিকতা সারেননি, বরং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লেখা চিঠি তাঁর হাতে তুলে দেন। এই চিঠির বিষয়বস্তু কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রশংসা, বাংলাদেশের গণতন্ত্রে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে বিএনপির নেতৃত্বে দুই দেশের অংশীদারত্ব এগিয়ে নেওয়ার আশাবাদ—সব মিলিয়ে এটি ভারতের অবস্থানের একটি স্পষ্ট পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। দিল্লি যে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, তার প্রমাণ মেলে এস জয়শঙ্করের বক্তব্যেও। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে যারা জয়ী হবে, ভারত তাদের সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত। এই ‘যারা’ শব্দটির মধ্যে যে বিএনপির দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে, তা কূটনৈতিক মহলে প্রায় অঘোষিত সত্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
এখানে খালেদা জিয়ার জানাজার সময়টিকে কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। দিল্লি বুঝতে পেরেছে, এই আবেগঘন মুহূর্তে শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির বার্তা পাঠানো শুধু মানবিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও কার্যকর। রাজনাথ সিংয়ের বাংলাদেশ হাইকমিশনে যাওয়া এবং সেখানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ইঙ্গিত দেওয়াও এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ। এর মাধ্যমে দিল্লি একদিকে বাংলাদেশি জনমনে ইতিবাচক বার্তা দিতে চেয়েছে, অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বের সঙ্গে আস্থার সেতু গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।
নরেন্দ্র মোদির চিঠির ভাষা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা নয়; বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা, যেখানে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে তারেক রহমানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের ‘গভীর ও ঐতিহাসিক অংশীদারত্ব’ আরও সমৃদ্ধ করার কথা উল্লেখ করে মোদি মূলত জানান দিয়েছেন, দিল্লি নতুন বাস্তবতায় নতুনভাবে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী। এই বার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন অতীতের অনেক অমীমাংসিত বিষয়—সীমান্ত, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা—সবই নতুন করে আলোচনার অপেক্ষায়।
দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহর বক্তব্যেও এই আশাবাদের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি এস জয়শঙ্করের সফরকে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ‘নতুন অধ্যায়ের পাণ্ডুলিপি’ রচনার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। বাস্তবতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে স্বার্থনির্ভর সম্পর্ক—এই ধারণা আসলে দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ। আবেগ বা আদর্শের চেয়ে স্বার্থ এখানে মুখ্য হয়ে উঠছে, আর দিল্লি সেই বাস্তবতাকেই মেনে নিয়ে এগোতে চাইছে।
এই প্রেক্ষাপটে অতীতের অভিজ্ঞতার কথাও আলোচনায় এসেছে। ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিএনপি ও বিজেপি—দুই দেশেই ক্ষমতায় ছিল। সেই সময়ের কাজের অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এটি কেবল স্মৃতিচারণ নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি রেফারেন্স পয়েন্ট। দিল্লি বোঝাতে চেয়েছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে এবং সেটি নতুন করে সক্রিয় করা সম্ভব।
তবে এই আশাবাদের পাশাপাশি সতর্কতাও আছে। ভারতের পক্ষ থেকে বারবার অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। এটি একদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতি সমর্থন, অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি পরোক্ষ বার্তা। দিল্লি স্পষ্ট করতে চায়, গণতান্ত্রিক উত্তরণই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মূল চাবিকাঠি। একই সঙ্গে অমীমাংসিত সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা সংঘাত নয়, সংলাপের পথেই হাঁটার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। তারেক রহমান আলোচনায় বসে সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেছেন। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গে এস জয়শঙ্করের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা দেখায়, বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক নয়, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও গুরুত্ব পাচ্ছে। গণতান্ত্রিক উত্তরণের মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে ধারণা উঠে এসেছে, তা দুই পক্ষের মধ্যেই একটি যৌথ বোঝাপড়ার ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দিল্লির সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল সৌজন্য বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি সুস্পষ্ট কৌশলের অংশ, যেখানে বাংলাদেশে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হচ্ছে। খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা, তারেক রহমানের প্রতি গুরুত্ব আর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর—এই তিনটি উপাদান মিলিয়ে ভারতের বার্তা পরিষ্কার: বাস্তবতা মেনে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগোনোই এখন প্রধান লক্ষ্য।
এই উদ্যোগগুলো সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন যেমন বলেছেন, এর উত্তর আগামী দিনগুলোতেই পাওয়া যাবে। তবে এটুকু স্পষ্ট, দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর দিল্লি ও ঢাকা আবারও সংলাপের পথে ফিরছে—এবং সেই পথে এগোনোর আগ্রহ আপাতত ভারতের দিক থেকেই বেশি দৃশ্যমান।
আপনার মতামত জানানঃ