আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে অস্থিরতা ও পুনর্বিন্যাস চলছে, তার সবচেয়ে জটিল ও আলোচিত দিকগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ইসলামভিত্তিক দলগুলোর ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ একাধিক দল নিয়ে গঠিত এই জোট একদিকে যেমন ভোটের মাঠে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে তেমনি ভেতরে ভেতরে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ, অনাস্থা ও দরকষাকষির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। প্রকাশ্যে ঐক্যের কথা বলা হলেও বাস্তবতায় এই জোট কতটা টেকসই হবে—সে প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মাঝেও ঘুরপাক খাচ্ছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গত বছরের মে মাসে কয়েকটি ইসলামপন্থী দল একত্র হয়ে জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। সে সময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। রাজপথে আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, ক্ষমতাসীন কাঠামোর বাইরে নতুন সমীকরণ তৈরির তাগিদ এবং বড় দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার প্রয়োজন—সব মিলিয়ে জোট রাজনীতিই তখন অনেকের কাছে বাস্তবসম্মত পথ বলে মনে হয়েছিল। শুরুতে খেলাফত মজলিশ, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ কয়েকটি দল যুক্ত হয়। পরে জাগপা ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি যোগ দিলে জোটের পরিসর আরও বাড়ে।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে যখন তরুণ নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি এই জোটে যুক্ত হয়। রাজনীতির মাঠে তুলনামূলক নতুন হলেও এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হয় একটি ভিন্ন ধরনের ভাষ্য—গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, প্রথাবিরোধী রাজনীতি এবং তরুণদের প্রতিনিধিত্বের দাবি। এই নতুন শক্তির আগমন জোটের ভেতরে শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আনে। আসন সমঝোতা তখন আর কেবল সংখ্যার হিসাব থাকেনি, হয়ে ওঠে প্রভাব, নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার প্রশ্ন।
দফায় দফায় বৈঠক হলেও আসন সমঝোতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারাই জোটের দুর্বলতা প্রকাশ করে দেয়। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ভেতরে অসন্তোষের খবর প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। দলটির দাবি ছিল, তাদের সাংগঠনিক শক্তি ও মাঠপর্যায়ের উপস্থিতির তুলনায় প্রস্তাবিত আসনসংখ্যা অনেক কম। গণমাধ্যমে আসে, দলটি অন্তত দেড়শ আসন প্রত্যাশা করেছিল। যদিও দলের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান প্রকাশ্যে সে দাবি অস্বীকার করে বলেন, আসনসংখ্যা নয়, বরং যৌক্তিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে সমঝোতাই তাদের লক্ষ্য।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রায় সব আসনেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে, যা অনেকের কাছে স্পষ্ট বার্তা—দলটি প্রয়োজনে এককভাবেও নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি জোটের প্রতি আস্থাহীনতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। একই সঙ্গে এই কৌশলকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও দেখা হচ্ছে, যাতে শেষ মুহূর্তে বেশি আসন আদায় করা যায়।
অসন্তোষ শুধু ইসলামী আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশও শুরুতে যে সংখ্যক আসনের আশা করেছিল, শেষ পর্যন্ত তার অনেক কমে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত আন্দোলনের ভাগ্যে জুটেছে মাত্র দুইটি করে আসন। বিডিপি ও জাগপার মতো দলগুলো পেয়েছে একটি করে আসন। ফলে জোটের ভেতরে ছোট দলগুলোর মধ্যে ক্ষোভ জমা হওয়াটা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে নতুন শক্তি এনসিপির অবস্থানও জোটের জন্য সহজ ছিল না। অর্ধশতাধিক আসনের দাবি নিয়ে আলোচনায় বসা দলটি শেষ পর্যন্ত প্রায় ২৬টি আসনে সমঝোতায় আসে। তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত দলটির অনেক সমর্থক এটিকে আপস হিসেবে দেখছেন। তবে দলটির নেতৃত্বের ভাষ্য, বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে তারা এই সমঝোতায় এসেছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠেছে নেতৃত্বের প্রশ্ন। যদিও জোটের নেতারা বারবার বলছেন, এটি কোনো আদর্শিক জোট নয়, বরং নির্বাচনী সমঝোতা, তবু বাস্তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবই বেশি—এমন অভিযোগ উঠছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নেতার মতে, বৈঠকে জামায়াতের অবস্থান অনেকটাই নিয়ন্ত্রণমূলক। যদিও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এই অভিযোগ নাকচ করে বলেন, এখানে সবাই সমান মর্যাদায় কাজ করছে এবং নেতৃত্ব নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই জোটকে দেখছেন মূলত স্বার্থের সমীকরণ হিসেবে। তাদের মতে, জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী কখনো এককভাবে বড় সাফল্য পায়নি। ফলে দলটি নিজেদের পরিধি বাড়াতে এবং ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা কমাতে বিভিন্ন ইসলামপন্থী দলকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ছোট দলগুলোও জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তিকে ব্যবহার করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাচ্ছে।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, এই জোটে আদর্শগত ঐক্যের চেয়ে পারস্পরিক প্রয়োজনই বেশি কাজ করছে। একবার সেই প্রয়োজনের ভারসাম্য নষ্ট হলেই জোট ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। নির্বাচনের আগে কিংবা পরে—দুই সময়েই সেই ভাঙন ঘটতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এই প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং জোট রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। আসন সমঝোতা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয়, মাঠপর্যায়ের ক্ষোভ কতটা সামাল দেওয়া যায় এবং ভোটের ফলাফল জোটের ভেতরের শক্তির ভারসাম্যকে কীভাবে বদলায়—সব মিলিয়ে এই নির্বাচন অনেক দলের জন্যই অস্তিত্বের প্রশ্ন। ঐক্যের ভাষ্য আর বাস্তবতার টানাপোড়েনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ১১ দলীয় এই জোট এখন সময়ের বিরুদ্ধে লড়ছে, যেখানে সামান্য ভুল হিসাবই বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।ন
আপনার মতামত জানানঃ