ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, কূটনীতি ও প্রতিবেশী সম্পর্কের জটিল বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য শুধু একটি দেশের নির্বাচন বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সৌজন্যমূলক বক্তব্য নয়; বরং এর ভেতর দিয়ে ভারতের আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তা ভাবনা এবং ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির ব্যাখ্যাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উঠে আসা এই বক্তব্যগুলো বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক একদিকে ঐতিহাসিক, অন্যদিকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে সংবেদনশীলও।
জয়শঙ্কর বলেছেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে চলেছে এবং ভারত সেই প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছে। তাঁর ভাষায়, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এই অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ চেতনা আরও জোরদার হবে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানাচ্ছে—এমন একটি সময়, যখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে এবং ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে একটি স্থিতিশীল, নির্বাচিত সরকারই আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে উপযোগী—এই বার্তাই এখানে স্পষ্ট।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে জয়শঙ্করের বক্তব্যের পেছনের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। গত বছর গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এটি ছিল ভারতের সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের কোনো প্রতিনিধির বাংলাদেশ সফর। সংক্ষিপ্ত এই সফরে তিনি শুধু শেষশ্রদ্ধা নিবেদনই করেননি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তাও পৌঁছে দেন। এই ঘটনাগুলো কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় রাখার একটি বার্তা দিয়েছে।
চেন্নাইয়ের আইআইটি মাদ্রাজে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে জয়শঙ্করকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদল ও বিদ্যমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি কীভাবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। উত্তরে তিনি সরাসরি কোনো দেশের নাম না নিয়ে প্রতিবেশীদের প্রতি ভারতের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভারতের প্রতিবেশী দুই ধরনের—ভালো ও মন্দ। অধিকাংশ প্রতিবেশীই মনে করে, ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে তারাও উপকৃত হবে। ভারতের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাদের উন্নতির সম্ভাবনাও বাড়বে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি পারস্পরিক নির্ভরতার ধারণা তুলে ধরেন, যেখানে ভারতকে শুধু একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
তবে তাঁর বক্তব্যের আরেকটি দিক ছিল নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কঠোর অবস্থান। পাকিস্তানের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও ‘খারাপ প্রতিবেশী’ বলতে যে দেশটিকে বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট। জয়শঙ্কর বলেন, যে প্রতিবেশী দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেয়, তার বিরুদ্ধে দেশের জনগণকে রক্ষা করতে ও জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হয়। কীভাবে সেই পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা বাইরের কেউ ঠিক করে দিতে পারে না। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ভারত তার নিরাপত্তা নীতিতে কোনো আপস না করার বার্তাই দিয়েছে।
এই প্রসঙ্গে তিনি সিন্ধু পানি চুক্তির উদাহরণও টানেন। তাঁর মতে, এই চুক্তি হয়েছিল সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাব থেকে। কিন্তু একদিকে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়া, অন্যদিকে পানিবণ্টনের সুবিধা চাওয়া—এই দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না। এই বক্তব্য কেবল পাকিস্তানকে লক্ষ্য করেই নয়, বরং এটি ভারতের সামগ্রিক কূটনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন, যেখানে সহযোগিতা ও কঠোরতা—দুটোই পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োগ করা হয়।
জয়শঙ্কর সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের একটি বিস্তৃত ব্যাখ্যাও দেন। তিনি বলেন, সাধারণভাবে প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ করা হয়। প্রতিবেশী অসুবিধায় পড়লে সাহায্যের হাত বাড়ানো হয়, অন্তত সৌজন্যমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা হয়। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও ভারতের নীতি একই। এই নীতির উদাহরণ হিসেবে তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতের সহায়তার কথা উল্লেখ করেন। কোভিড মহামারির সময় অধিকাংশ প্রতিবেশী দেশ প্রথম টিকা পেয়েছে ভারত থেকে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় খাদ্য, সার ও জ্বালানিসংকটে পড়া দেশগুলোর পাশে ভারত সাধ্যমতো দাঁড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের সময় ভারত ৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। সাম্প্রতিক ‘দ্বিতয়া’ সাইক্লোনের সময়েও শ্রীলঙ্কার জন্য প্রথম সহায়তা পাঠিয়েছে ভারত। এসব উদাহরণের মাধ্যমে জয়শঙ্কর বোঝাতে চেয়েছেন, বিপদের সময় ভারত একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিবেশী।
তিনি আরও বলেন, ভারতের সুপ্রতিবেশী নীতি শুধু সংকটকালীন সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুতের গ্রিড তৈরি, সড়ক ও বন্দর নির্মাণ, বাণিজ্য ও পর্যটন বৃদ্ধি, চিকিৎসার জন্য আসা মানুষদের সহায়তা—এসবই ভারতের প্রতিবেশী নীতির অংশ। এই সব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক সংযোগ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ায়। জয়শঙ্করের মতে, এই ইতিবাচক মনোভাবই ভারতের প্রতিবেশী নীতির মূল শক্তি।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ফিরে এসে তিনি বলেন, এই সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাবের বার্তাই তিনি ঢাকায় দিয়ে এসেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং সেই পথে এগোচ্ছে। ভারত এই প্রক্রিয়াকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে এবং আশা করছে, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে পুরো অঞ্চলে সুসম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত একদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ না করার অবস্থান জানাচ্ছে, অন্যদিকে স্থিতিশীলতার গুরুত্বও তুলে ধরছে।
এই পুরো বক্তব্যের ভেতর দিয়ে ভারতের কূটনীতির একটি সুস্পষ্ট ছবি ফুটে ওঠে। একদিকে সহযোগিতা, উন্নয়ন ও সহানুভূতির বার্তা; অন্যদিকে নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান। বাংলাদেশকে ঘিরে জয়শঙ্করের মন্তব্য ইঙ্গিত দেয়, ভারত বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী এবং ভবিষ্যতে একটি নির্বাচিত ও স্থিতিশীল সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের নেতৃত্বের দাবিকেও জোরালো করে, যেখানে ভারত নিজেকে শুধু একটি শক্তিধর রাষ্ট্র নয়, বরং দায়িত্বশীল ও সহায়ক প্রতিবেশী হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
সব মিলিয়ে জয়শঙ্করের বক্তব্য বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি স্পষ্ট করে যে, ভারত আঞ্চলিক রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা, নির্বাচন ও বৈধ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেয়, পাশাপাশি নিরাপত্তা প্রশ্নে আপসহীন থাকে। বাংলাদেশের সামনে নির্বাচন ও পরবর্তী সময় যে চ্যালেঞ্জই আসুক না কেন, ভারত সেই প্রক্রিয়াকে পর্যবেক্ষণ করছে সুপ্রতিবেশীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই—এমন বার্তাই এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে।
আপনার মতামত জানানঃ