রাজধানীর একটি সাধারণ সকাল এখন আর আগের মতো নেই। চুলায় আগুন জ্বলবে কি না, সেটাই হয়ে উঠেছে অনেক পরিবারের দিনের প্রথম দুশ্চিন্তা। জানুয়ারির শুরুতেই এলপি গ্যাসের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা শুধু মূল্যবৃদ্ধির হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, খাদ্যনিরাপত্তা ও শহুরে টিকে থাকার বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। সরকারি হিসাবে দাম বাড়ার কথা কেজিতে মাত্র কয়েক টাকা, কিন্তু বাস্তব বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি দামে, আবার অনেক জায়গায় সেই দাম দিয়েও গ্যাস মিলছে না।
ঢাকার মগবাজার, রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা, খিলগাঁও, মিরপুর, মোহাম্মদপুর কিংবা যাত্রাবাড়ী—প্রায় সব এলাকাতেই একই দৃশ্য। কোথাও দোকান বন্ধ, কোথাও শাটার অর্ধনমিত, আবার কোথাও দোকান খোলা থাকলেও গ্যাস নেই বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যে দোকানে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম হাঁকা হচ্ছে ২২০০ থেকে ২৪০০ টাকা, এমনকি কোথাও ২৫০০ টাকাও চাইছে বিক্রেতারা। অথচ জানুয়ারি মাসের জন্য সরকার নির্ধারিত দাম ১৩০৬ টাকা। এই ব্যবধান শুধু সংখ্যার নয়, এটি ভোক্তা ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যকার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।
এই সংকট নতুন নয়, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আরও তীব্র। এলপি গ্যাস এখন শহরের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য প্রধান রান্নার জ্বালানি। পাইপলাইনের গ্যাস নেই বা চাপ কম—এই বাস্তবতায় বিকল্প হিসেবে মানুষ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ফলে বাজারে সামান্য ঘাটতিও সরাসরি জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা দেয়। অনেক পরিবার দিনের পর দিন রান্না করতে পারছে না, কেউ আবার অতিরিক্ত দাম দিয়ে গ্যাস কিনে সংসারের অন্য খরচ কমিয়ে দিচ্ছে।
সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন জানুয়ারি মাসের জন্য নতুন দাম ঘোষণা করেছে রোববার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে কার্যকর হবে বলে। ঘোষণায় বলা হয়েছে, বেসরকারি পর্যায়ের এলপিজির দাম প্রতি কেজি ১০৮ টাকা ৮৩ পয়সা, যা ডিসেম্বরের তুলনায় কেজিতে ৪ টাকা ৪২ পয়সা বেশি। সেই হিসাবে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১৩০৬ টাকা। কিন্তু বাস্তবে এই ঘোষণার আগেই ডিসেম্বরজুড়েই বাজারে দাম ছিল ১৯০০ থেকে ২১০০ টাকা, আর জানুয়ারির শুরুতে তা আরও বেড়ে গেছে।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা নিজেরা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন না। তাদের ভাষ্য, পরিবেশক পর্যায়েই গ্যাসের দাম বেড়েছে এবং সরবরাহ কমেছে। কেউ কেউ দোকান বন্ধ রাখছেন এই যুক্তিতে যে, বেশি দামে গ্যাস কিনে লোকসানে বিক্রি করার চেয়ে বন্ধ রাখা ভালো। মালিবাগের এক দোকানদার জানিয়েছেন, পনের দিন আগেও ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে ১৫২০ টাকার বেশি দামে, পরিবহন খরচ মিলিয়ে বিক্রি করতে হয়েছে ১৭০০ টাকায়। আর গত সপ্তাহে একই সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে প্রায় ১৯০০ টাকায়। এই পরিস্থিতিতে খুচরা বাজারে দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের নাকি উপায় নেই।
অন্যদিকে এলপিজি অপারেটর ও পরিবেশকদের সংগঠনগুলোর দাবি ভিন্ন। তারা বলছেন, ডিসেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির চাহিদা ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছু জাহাজ নিয়মিত পরিবহন থেকে বাদ পড়েছে। এর ফলে আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, যেখানে মাসে গড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়, সেখানে ডিসেম্বরে তা নেমে এসেছে প্রায় ৯০ হাজার টনে। এতে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। তবে তারা এটাও দাবি করছেন যে, তারা পরিবেশকদের কাছে বিইআরসি নির্ধারিত দামেই গ্যাস সরবরাহ করছেন, খুচরা পর্যায়ের অতিরিক্ত দামের দায় তাদের নয়।
এই দায় চাপানোর রাজনীতির মাঝখানে সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েছেন ভোক্তারা। মগবাজারের বাসিন্দা শেফিক রহমান সুমনের পরিচিত একজন ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনেছেন ২৫০০ টাকায়। নয়াটোলার নজরুল ইসলাম এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে শেষ পর্যন্ত গ্যাস না পেয়ে ফিরে এসেছেন। মোহাম্মদপুরের কবির হোসেন জানিয়েছেন, পুরো এলাকা ঘুরে মাত্র একটি দোকানে সিলিন্ডার পাওয়া গেছে, তাও ২১০০ টাকায়। বনশ্রী, যাত্রাবাড়ীসহ নানা এলাকার বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা একই রকম। এই সংকট শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়; মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, যশোর, রংপুর, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলাতেও সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক বেশি দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বলছে, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ ক্ষমতার ঘাটতির কারণে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের মতে, সরবরাহ সংকটের নামে যা হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বিইআরসি যদি শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে ভোক্তাদের আস্থা আরও নষ্ট হবে।
বিইআরসিও পরিস্থিতি যে পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়, তা স্বীকার করছে। কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, আমদানি খরচ বাড়লে কোম্পানিগুলোকে প্রমাণসহ তথ্য জমা দিতে হবে, তারপর মূল্য সমন্বয় বিবেচনা করা হবে। তার আগে বাড়তি দামে বিক্রির সুযোগ নেই। বাজারের পরিস্থিতি নজরে আসার পর বিইআরসি লোয়াবকে চিঠি দিয়ে নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব এখনো দৃশ্যমান নয়।
এই সংকটের আরেকটি দিক হলো পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া। রামপুরা, মগবাজারসহ অনেক এলাকায় শীত এলেই গ্যাসের চাপ কমে যায়, কখনো পুরোপুরি বন্ধও থাকে। ফলে যারা আগে পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করতেন, তারাও বাধ্য হয়ে এলপিজির ওপর নির্ভর করছেন। চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু সরবরাহ সেই অনুপাতে বাড়ছে না—এই অসামঞ্জস্যই বাজারকে আরও অস্থির করে তুলছে।
দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি শুধু একটি পণ্যের সংকট নয়, এটি জ্বালানি খাতে নীতিগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বিইআরসি প্রতি মাসে সৌদি আরবের আরামকোর ঘোষিত সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) অনুযায়ী প্রোপেন ও বিউটেনের দাম সমন্বয় করে দেশে এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে। ডলারের বিনিময় হার, আমদানিকারক কোম্পানির ইনভয়েস মূল্য—সবকিছু মিলিয়ে একটি গাণিতিক হিসাব দাঁড় করানো হয়। কিন্তু এই হিসাব মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
ভোক্তাদের ভাষায়, এলপিজি খাতে তারা সবসময়ই জিম্মি। সরকার দাম নির্ধারণ করে, ব্যবসায়ীরা দায় এড়ান, আর নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলো মাঠে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। ফলাফল হিসেবে, একটি ১২ কেজি সিলিন্ডারের জন্য একজন সাধারণ মানুষকে দ্বিগুণ দাম দিতে হচ্ছে, আবার সেই দাম দিয়েও গ্যাস মিলছে না। রান্নাঘরের চুলা যখন নিভে যায়, তখন সংকট আর কাগজের হিসাব থাকে না—তা হয়ে ওঠে জীবনের বাস্তব লড়াই। এই লড়াই থেকে মুক্তি পেতে হলে শুধু মাসিক দাম ঘোষণাই নয়, প্রয়োজন শক্ত নজরদারি, স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ভোক্তার স্বার্থকে কেন্দ্র করে কার্যকর প্রয়োগ। না হলে এলপিজির বাজারে এই অস্থিরতা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
আপনার মতামত জানানঃ