পারস্য উপসাগরের বুক চিরে যে সরু জলপথটি আরব সাগরের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছে, সেটিই হরমুজ প্রণালী। পৃথিবীর জ্বালানি রাজনীতির মানচিত্রে এটি এমন এক জায়গা, যেখানে সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে দুলতে থাকে বৈশ্বিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং সামরিক উত্তেজনার হিসাব-নিকাশ। এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়, তার ওপর নির্ভর করে বহু দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং দৈনন্দিন জীবন। ফলে যখনই এই প্রণালীতে উত্তেজনা তৈরি হয়, তখন তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক সংকট থাকে না; বরং তা বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক সময় চীনের সহায়তা চেয়েছেন, যখন ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আশা করছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বেইজিংয়ে তার আসন্ন বৈঠকের আগেই চীন হরমুজ প্রণালী আবার স্বাভাবিকভাবে চালু করতে সহায়তা করবে। তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে এই প্রণালীর নিরাপত্তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নয়; বরং ইউরোপ, চীনসহ বহু দেশের অর্থনীতি এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিশ্বে মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। পারস্য উপসাগরের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক ও কাতার—এই পথ ব্যবহার করে তাদের জ্বালানি বিশ্ববাজারে পাঠায়। ফলে এই পথটি বন্ধ হয়ে গেলে বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে তার প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর। ইতিহাস বলছে, হরমুজ প্রণালী নিয়ে যে কোনো উত্তেজনা দ্রুত বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ তৈরি করে।
বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে তার সংঘাত। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বারবার হুমকি দিয়েছে যে তারা কোনো তেলবাহী জাহাজকে এই প্রণালী দিয়ে যেতে দেবে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি, তেল কোম্পানি এবং বিভিন্ন দেশের সরকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বক্তব্য অনেকের কাছে কৌশলগত বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তিনি বলেছেন, যে দেশগুলো হরমুজ প্রণালী থেকে সুবিধা পায়, তাদেরই এই প্রণালীকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব নেওয়া উচিত। বিশেষ করে চীন ও ইউরোপীয় দেশগুলো পারস্য উপসাগর থেকে আসা তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মতে, তাদেরও এই সংকট সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
চীনের নাম এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে এবং তার একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অনুমান করা হয়, চীনের আমদানি করা তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন হয়। তাই এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে চীনের অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।
তবে চীনের অবস্থান অনেকটাই জটিল। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতায় রয়েছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও তুলনামূলকভাবে ভালো। ফলে হরমুজ প্রণালী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে চীন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটি এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প তার বক্তব্যে নেটো মিত্রদের প্রতিও ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যদি অন্য দেশগুলো এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে তা নেটোর ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে না। তার বক্তব্যে স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় মিত্রদের কাছ থেকে আরও বেশি দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র যে ভূমিকা রেখেছে, সেটির কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে হলেও তারা সেই দেশকে সাহায্য করেছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অন্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াবে কি না। তার বক্তব্যের ভেতরে একটি রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র আর একা সব দায়িত্ব নিতে চায় না।
এই উত্তেজনার মধ্যেই ভারত একটি ভিন্ন ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, নয়াদিল্লি ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনার ফলে দুটি ভারতীয় জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে পার হতে পেরেছে। ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার ইতোমধ্যে সেই পথ অতিক্রম করেছে।
ভারতের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি তাদের শহরাঞ্চলের জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশ এলএনজি গ্যাস দিয়ে পূরণ করে এবং সেই গ্যাসের বড় অংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। ভারতে প্রায় ৩৩ কোটি পরিবার রান্নার কাজে সিলিন্ডারভিত্তিক গ্যাস ব্যবহার করে। ফলে গ্যাস সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব পড়ে সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে।
ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে ভারতের কোনো স্থায়ী বা সাধারণ চুক্তি হয়নি। বরং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সাময়িক সমাধান পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, এই আলোচনার ফলে কিছু ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে এবং আলোচনা এখনও চলমান রয়েছে।
হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে এই সংকট আসলে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। ইরান দীর্ঘদিন ধরে এই জলপথকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। যখনই তাদের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ে, তখন তারা ইঙ্গিত দেয় যে এই প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। কারণ তারা জানে, এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মনে করে, এই জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটিকে কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। ফলে হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা মূলত শক্তির রাজনীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সামরিক কৌশলের জটিল মিশ্রণ।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সংকট আরও বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পরিবহন খরচ, খাদ্যের দাম এবং শিল্প উৎপাদনের ওপর। অনেক দেশ এখনও মহামারি ও অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। তার ওপর যদি জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন করে অস্থির করে তুলতে পারে।
এই বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালী শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। এখানে দেখা যাচ্ছে কে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, কে কাকে সহযোগিতা করতে রাজি এবং কোন দেশ কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীনের প্রতি আহ্বান সেই বৃহত্তর কৌশলগত খেলাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। যদি চীন সত্যিই এই সংকট সমাধানে ভূমিকা নেয়, তাহলে তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন ধরনের সহযোগিতার ইঙ্গিত দিতে পারে। আবার যদি তারা নিরপেক্ষ অবস্থান নেয় বা ইরানের দিকে ঝুঁকে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের মতো দেশগুলো বাস্তববাদী কূটনীতির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে। তারা সরাসরি আলোচনা করে জাহাজ চলাচলের অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করছে, যাতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত না হয়।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালী আজ শুধু একটি ভৌগোলিক জায়গা নয়; বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির একটি স্পন্দিত কেন্দ্র। এখানে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, তার প্রতিধ্বনি শোনা যায় নিউইয়র্কের তেলবাজারে, বেইজিংয়ের শিল্পাঞ্চলে, দিল্লির রান্নাঘরে এবং ইউরোপের বিদ্যুৎকেন্দ্রে। তাই এই সরু জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন শুধু একটি দেশের দায়িত্ব নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব এবং একই সঙ্গে একটি জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
আপনার মতামত জানানঃ