মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন, সমুদ্রপথে অচল হয়ে পড়া তেলবাহী জাহাজ আর আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল হিসাব—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি আবারও এক অস্থির সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও অনেকেই মনে করছিলেন যে সংঘাতের গতিপথ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরাইল। তাদের সামরিক শক্তি, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত আধিপত্য এমন এক অবস্থান তৈরি করেছিল, যেখানে মনে হচ্ছিল যুদ্ধের প্রতিটি চাল তারা নির্ধারণ করছে। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যে যুদ্ধের ময়দানে বাস্তবতা সব সময় কাগজে আঁকা কৌশলের মতো সরল নয়। এখন অনেক বিশ্লেষকই বলছেন, সংঘাতের এই পর্যায়ে এসে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে ইরানের দিকে সরে যাচ্ছে।
ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ডসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ী সম্প্রতি এক বক্তব্যে দাবি করেছেন, যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ থাকবে তাদের হাতেই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন এবং সাম্প্রতিক হামলায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। তেহরানের শীর্ষ পর্যায়ের এই আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য অনেককেই বিস্মিত করেছে। কারণ সংঘাতের শুরুতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেখানে এমন বক্তব্য শোনা যাবে—এটা খুব কম মানুষই কল্পনা করেছিলেন।
সংঘাতের সূচনা হয়েছিল ইসরাইলের আকস্মিক ও তীব্র হামলার মাধ্যমে। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নাটকীয় পরিবর্তনের সূচনা হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধবিমান দ্রুতই ইরানের আকাশে অভিযান শুরু করে। উন্নত গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ভিত্তিতে তারা হাজারো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্রভাণ্ডার এবং যোগাযোগ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে এই হামলাগুলো পরিচালিত হয়। প্রথম দিকে মনে হচ্ছিল ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই আঘাত সামাল দিতে পারছে না।
তবে যুদ্ধের বাস্তবতা দ্রুতই জটিল হয়ে ওঠে। ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। যদিও ইসরাইলের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই হামলার বড় অংশই প্রতিহত করতে সক্ষম হয়, তবুও সংঘাতের তীব্রতা কমেনি। এ পর্যন্ত এসব হামলায় ইসরাইলে নিহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও তা রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। এর পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে সীমিত আকারের হামলা চালিয়ে ইরান দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা সংঘাতকে আঞ্চলিক মাত্রায় বিস্তৃত করার ক্ষমতা রাখে।
এই হামলাগুলো হয়তো প্রত্যাশিত বড় সাফল্য এনে দেয়নি, কিন্তু তবুও উপসাগরীয় দেশগুলোতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শান্তি, বিলাসিতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে যেসব শহর পরিচিত ছিল, সেখানে হঠাৎ করেই নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে একটি বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র মজুত নিয়ে। বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক চলছে—দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতদিন টিকতে পারবে।
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এতটাই দৃশ্যমান ছিল যে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন সংঘাতের গতি তাদের হাতেই থাকবে। প্রতিদিন নতুন নতুন হামলার মাধ্যমে তারা সেই শক্তির প্রদর্শনও করেছে। কিন্তু যুদ্ধ কেবল সামরিক শক্তির হিসাব নয়; এটি কৌশল, অর্থনীতি, মনস্তত্ত্ব এবং সময়েরও খেলা। সেই জায়গাতেই ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে শুরু করেছে পরিস্থিতি।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এটি বন্ধ হয়ে গেলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতেই তার প্রভাব পড়ে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে এবং অনেক দেশে জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবেও চাপ তৈরি করছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে যেখানে জ্বালানির মূল্য সরাসরি জনমতের ওপর প্রভাব ফেলে।
এ কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরান কৌশলগতভাবে একটি বড় চাল দিয়েছে। সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও তারা এমন একটি জায়গায় চাপ তৈরি করেছে, যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী। যুক্তরাষ্ট্র এখন দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক—দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়ছে।
তবে সবাই যে এই বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত, তা নয়। জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির সামরিক ইতিহাসের অধ্যাপক ড্যানি অরবাখ মনে করেন, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হাতেই রয়েছে। তার মতে, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ মানে কেবল প্রতিক্রিয়া দেওয়া নয়, বরং সংঘাতের এজেন্ডা নির্ধারণ করা। তিনি যুক্তি দেন যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযন্ত্র ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের সামরিক সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
অরবাখের মতে, ইরানের সামনে তখন একটাই পথ খোলা ছিল—সংঘাতকে এমনভাবে বাড়িয়ে তোলা যাতে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয় এবং যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য অন্য শক্তিগুলো এগিয়ে আসে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা সেই কৌশলেরই অংশ হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক দফায় যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে সে বিষয়ে সময়সীমার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করা ছাড়া যুদ্ধ শেষ করার কথা তিনি ভাবছেন না। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে, যা তারা প্রথমে পরিকল্পনা করেনি।
আরেকটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন বাহিনীকে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। এই দ্বীপ ইরানের তেল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে আঘাত হানা হলে ইরানের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে। তবে এই পদক্ষেপের ঝুঁকিও কম নয়, কারণ এটি সংঘাতকে আরও বড় আকারে বিস্তৃত করতে পারে।
অন্যদিকে কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক পিটার নিউম্যান মনে করেন, পরিস্থিতি ভিন্ন দিকেও যেতে পারে। তার মতে, ইরান দুর্বল অবস্থান থেকেও পরিস্থিতিকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী বন্ধের কার্যকর সমাধান খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে—যা তারা আগে থেকে অনুমান করেনি। নিউম্যানের ভাষায়, এখন অনেকটাই মনে হচ্ছে যুদ্ধের গতি ইরানের কৌশলের ওপর নির্ভর করছে।
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত খুব কম দেশই সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। কারণ এই পদক্ষেপ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শত শত তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া সহজ কাজ নয় এবং একটি মাত্র ক্ষেপণাস্ত্র, সমুদ্র মাইন বা ছোট বিস্ফোরক নৌযানও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এই বাস্তবতা অনেক বিশ্লেষককে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করেছে যে শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী খোলার সিদ্ধান্ত ইরানের হাতেই থাকতে পারে। তেহরানের বর্তমান নেতৃত্ব বৈশ্বিক অর্থনীতির চাপ কমানোর জন্য দ্রুত কোনো পদক্ষেপ নেবে—এমন লক্ষণ এখনো খুব কম দেখা যাচ্ছে।
একই সময় এই আঞ্চলিক সংঘাতের ভেতরে আরও ছোট ছোট সংঘাতের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। ইরানপন্থী ইরাকি মিলিশিয়ারা এখনো পুরোপুরি যুদ্ধে জড়ায়নি এবং ইয়েমেনের হুতিরাও সরাসরি সংঘাতে প্রবেশ করেনি। তবে লেবাননে হিজবুল্লাহ ইতোমধ্যেই ব্যাপক হামলা চালিয়ে ইসরাইলকে চাপে ফেলেছে। উত্তর ইসরাইলে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা নতুন এক ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে।
এর জবাবে ইসরাইল লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এই সংঘাত আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
তবে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ফল কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কেউ মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক শক্তি শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি তাদের পক্ষেই নিয়ে যাবে। আবার কেউ মনে করছেন ইরান কৌশলগতভাবে এমন জায়গায় আঘাত করছে, যা তাদেরকে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থান থেকেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বলছে, এখানে যুদ্ধ কখনোই কেবল সামরিক শক্তির হিসাব নয়। এটি রাজনীতি, ধর্ম, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক জোটের জটিল সমীকরণ। সেই সমীকরণই আজ আবার নতুন করে রূপ নিচ্ছে। যুদ্ধের ময়দানে গোলাগুলি চলছে, কিন্তু একই সঙ্গে চলছে কূটনীতির নীরব লড়াই। কে শেষ পর্যন্ত এই সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণ করবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত, আর সেই অনিশ্চয়তাই আজকের মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
আপনার মতামত জানানঃ