বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান এমন একটি নাম, যা একদিকে প্রবল সমর্থন, অন্যদিকে প্রবল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে। পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে, তবে তাঁর নিজস্ব কর্মকাণ্ড ও ভূমিকার কারণে তিনি সমালোচিত ও অভিযুক্ত হয়েছেন বহুবার। এখন প্রশ্ন উঠছে—যদি ভবিষ্যতে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন, তবে কেমন প্রধানমন্ত্রী হবেন। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই তাঁর অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগগুলো সামনে আনতে হয়।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারের সময় তারেক রহমান মূলত হাওয়া ভবনের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, হাওয়া ভবন ছিল একটি বিকল্প সরকার পরিচালনার কার্যালয়, যেখান থেকে ব্যবসায়িক চুক্তি, চাকরির পদায়ন, এমনকি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তও প্রভাবিত হতো। এতে করে প্রশাসনে দুর্নীতি, পক্ষপাতিত্ব এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ব্যাপক আকার ধারণ করে। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করত, হাওয়া ভবনের অনুমোদন ছাড়া বড় কোনো কাজ সম্ভব ছিল না। এতে তারেক রহমানের ভাবমূর্তি কেবল ‘একজন রাজনৈতিক উত্তরসূরি’ হিসেবে নয়, বরং ‘একজন ছায়া শাসক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
তারেক রহমানের সঙ্গে জড়িত সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার মধ্যে অন্যতম হলো ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা। সে দিন আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয় এবং অসংখ্য মানুষ নিহত হন। তদন্তে তারেক রহমানকে এই হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। নিম্ন আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়, তবে পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে আপিলের মাধ্যমে তিনি খালাস পান। যদিও আইনি দিক থেকে তিনি মুক্ত, তবুও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে এই অভিযোগ তাঁর জন্য চিরস্থায়ী কলঙ্ক হয়ে আছে।
এ ছাড়া ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনায়ও তাঁর নাম উঠে আসে। অভিযোগ ছিল, এই অস্ত্র উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর কাছে সরবরাহের উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল। এই মামলায়ও তাকে জড়ানো হয়, তবে আদালত থেকে তিনি পরবর্তীতে খালাস পান। অনেক সমালোচক মনে করেন, এত বড় অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনা রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের সহায়তা ছাড়া সম্ভব ছিল না।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগ ওঠে যে তিনি কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছেন এবং বিদেশে পাচার করেছেন। আয়কর রিটার্নে গোপন সম্পদ দেখানো, ঘুষের টাকার বিনিময়ে অনুমোদন দেওয়া, সরকারি চুক্তিতে কমিশন নেওয়া—এসব অভিযোগ তখন আলোচনায় আসে। আদালত তাকে কারাদণ্ড দিলেও পরে বিভিন্ন কারণে তিনি জামিনে মুক্তি পান এবং চিকিৎসার অজুহাতে লন্ডনে চলে যান। এরপর থেকে তিনি দেশে আর ফেরেননি। এই দীর্ঘ প্রবাসী জীবন তাঁর নেতৃত্বের প্রশ্নকে জটিল করে তুলেছে।
দুর্নীতির অভিযোগ ছাড়াও তারেক রহমানকে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের মদদদাতা হিসেবেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি নেতাদের একটি অংশ ছাত্রদল ও যুবদলকে ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমাবেশে হামলা, ব্যবসায়ীদের কাছে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রশাসনিক পদে দলীয় প্রভাব বিস্তার—এসব কর্মকাণ্ডে হাওয়া ভবনের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও তাঁর সমর্থকরা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন, তবুও ইতিহাসে এসব ঘটনা তাঁর ভাবমূর্তিকে গভীরভাবে দাগ কেটেছে।
প্রশ্ন হলো, এমন একজন নেতা যদি প্রধানমন্ত্রী হন, তবে কেমন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রথমত, তাঁর অতীত অভিজ্ঞতা এবং বিতর্ক তাঁর নেতৃত্বের প্রতিটি পদক্ষেপকে প্রভাবিত করবে। তিনি যদি অতীতের ধারা অব্যাহত রাখেন, তবে দেশে আবারও দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ হবে জনগণকে বিশ্বাস করানো যে তিনি নতুনভাবে, স্বচ্ছভাবে দেশ চালাতে সক্ষম।
দ্বিতীয়ত, তারেক রহমানকে আন্তর্জাতিক পরিসরে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন রিপোর্টে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হতে হলে তাঁকে এই ভাবমূর্তির সংকট কাটাতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে যে তিনি আইনের শাসন, সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তৃতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যদি দেশে ফেরেন, তবে আওয়ামী লীগ এবং অন্য বিরোধী পক্ষের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়বেন। তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা ও রায়গুলো খালাস দেওয়া হয়েছে, সেগুলো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে থাকবে। বিরোধী পক্ষ সর্বদা তাঁকে দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরবে। তাই প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁকে প্রথম দিন থেকেই জনআস্থা অর্জনের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে।
তবে সম্ভাব্য ইতিবাচক দিকও আছে। বিএনপির অনেক সমর্থক মনে করেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে এবং নির্বাসিত জীবনযাপন করে তিনি হয়তো নতুনভাবে শেখার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি হয়তো উপলব্ধি করেছেন যে, অতীতের ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি করলে বিএনপি কখনও জনগণের আস্থা ফিরে পাবে না। যদি তিনি সত্যিই সংস্কারক মনোভাব নিয়ে আসেন, দুর্নীতি দমন করেন এবং স্বচ্ছ নির্বাচন ও বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করেন, তবে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারেন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট খুবই জটিল। একদিকে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ এককভাবে ক্ষমতায় রয়েছে, অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা বিএনপিকে নতুন নেতৃত্বের সন্ধানে বাধ্য করেছে। তারেক রহমানই আপাতত একমাত্র উত্তরাধিকারী। কিন্তু তাঁর নেতৃত্ব টেকসই হবে কিনা, সেটি নির্ভর করবে তিনি কীভাবে অতীতের বোঝা ঝেড়ে ফেলে নতুন পথ দেখাতে পারেন তার ওপর।
যদি প্রধানমন্ত্রী হন, তবে তাঁকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে, স্বজনপ্রীতি পরিহার করতে হবে এবং প্রশাসনে মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়ন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে জনগণের নিরাপত্তায় কাজে লাগাতে হবে। সর্বোপরি, তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি কেবল জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকারী নন, বরং বাংলাদেশের জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাঁর অতীতের অন্ধকার দিক এত প্রবল যে জনগণ সহজে ভুলতে পারবে না। হাওয়া ভবনের দুর্নীতি, গ্রেনেড হামলার অভিযোগ, ১০ ট্রাক অস্ত্র কেলেঙ্কারি—এসব তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী হলে প্রতিদিন তাঁকে এসব সমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে।
অতএব বলা যায়, তারেক রহমান যদি প্রধানমন্ত্রী হন, তবে তিনি হবেন এক বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী। তিনি যদি অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন পথে হাঁটেন, তবে পরিবর্তনের প্রতীক হতে পারেন। কিন্তু যদি অতীতের মতো দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেন, তবে তা দেশকে আবারও অন্ধকারে ঠেলে দেবে। জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করাই তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
আপনার মতামত জানানঃ