নতুন বন্দোবস্ত, বৈষম্যহীনতা ও ইনসাফ—এই তিনটি শব্দ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছিল। রাজপথে নেমে আসা মানুষের মুখে মুখে ছিল একটি প্রত্যাশা—এবার বুঝি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে, ক্ষমতা আর নিরাপত্তা কেবল গুটিকয় মানুষের হাতে বন্দী থাকবে না। এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে এসে প্রশ্নটা তাই আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে: নতুন বন্দোবস্তে আমরা আসলে কতটা বৈষম্যহীন দেশ পেলাম?
পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে গত বছরের সালতামামি, নানা জরিপ ও গবেষণার ফলাফল। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এসব তথ্য একদিকে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের চলমান বাস্তবতা তুলে ধরে, অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা কতখানি বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়েও গভীর দুশ্চিন্তা তৈরি করে। মৌলিক অধিকার, নাগরিক সুরক্ষা ও আইনের শাসন—এই তিন ক্ষেত্রে ধারাবাহিক লঙ্ঘনের চিত্র অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়কে মোটেও আশ্বস্ত করে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই মনে হয়, পুরোনো সমস্যার ওপর নতুন মোড়ক পড়েছে মাত্র।
জুলাইয়ের দিনগুলোতে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল কোনো বিমূর্ত ধারণার জন্য নয়। তারা চেয়েছিল দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি, নিরাপত্তা ও সম্মান। রাষ্ট্র যখন শান্তির কথা বলে, তখন সেটি প্রায়ই সহিংসতার অনুপস্থিতি বা ক্ষমতার হস্তান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে শান্তি মানে কাজের নিশ্চয়তা, নিরাপদ চলাচল, বিচার পাওয়ার আশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়হীনভাবে ভাবতে পারার সক্ষমতা। এই বাস্তব চাহিদার জায়গা থেকেই নতুন বন্দোবস্তের মূল্যায়ন হওয়া জরুরি।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের নেতাদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়াকে অনেকে ন্যায়বিচারের পথে অগ্রগতি হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিচারপ্রক্রিয়া কি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আনতে পেরেছে? বিচার ও প্রতিশোধের মাঝখানে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য, সেটি আমরা আদৌ বিবেচনায় নিয়েছি কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। সমাজে প্রতিশোধের চক্র ভাঙতে এবং সহাবস্থানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে যে সত্য ও সমঝোতা কমিশনের কথা বহু মানবাধিকারকর্মী ও গবেষক বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার তা আমলে নেয়নি। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া একদিকে যেমন প্রতীকী হয়ে উঠছে, অন্যদিকে সমাজে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির ভিতও দুর্বল থেকে যাচ্ছে।
আরেকটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতা খুব দ্রুতই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী শ্রেণিতে পরিণত হয়েছেন। এই রূপান্তর শুধু যে নতুন বৈষম্য তৈরি করেছে, তা নয়; অভ্যুত্থানকারীদের মধ্যেই বিভাজন ও অসন্তোষও উসকে দিয়েছে। যাঁরা রাস্তায় ছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজ নিজেদের বঞ্চিত ও উপেক্ষিত মনে করছেন। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশ যখন ক্ষমতার কাছাকাছি চলে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই আন্দোলন কি সবার ছিল, নাকি শেষ পর্যন্ত কিছু মানুষের জন্যই দরজা খুলে দিল?
প্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদি জনমুখী পরিকল্পনা ছাড়াই নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রবণতাও এই সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে। খেটে খাওয়া মানুষের বাস্তব সমস্যার কথা বলার বদলে অনেক নেতাকে ভোটের অঙ্ক আর জনতুষ্টিবাদী স্লোগানে আটকে থাকতে দেখা গেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি ও স্থানীয় পর্যায়ে দখলদারির অভিযোগ আন্দোলনের নৈতিক উচ্চতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। জনগণের আদালতে এসব ঘটনা নতুন বন্দোবস্তের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আইনের শাসনের প্রশ্নে পরিস্থিতি আরও জটিল। গণ-অভ্যুত্থানসংক্রান্ত ঘটনায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা না নেওয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং পরে ঘোষিত জুলাই সনদে দায়মুক্তির বিষয়টি যুক্ত হওয়া এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে। দায়মুক্তি কি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ও প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ, নাকি এটি ভবিষ্যতেও একটি বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য ঢাল হয়ে থাকবে—এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজির মামলায় একজন আন্দোলনকারীর গ্রেপ্তার ও দ্রুত জামিনের ঘটনায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ সাধারণ নাগরিকদের জন্য কোনো আশ্বাস তৈরি করে না। বরং এটি আইন সবার জন্য সমান কি না, সেই মৌলিক প্রশ্নকেই আরও ঘোলাটে করে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামের বম জনগোষ্ঠীর ৫৯ জন সদস্যের দীর্ঘদিন বিনা বিচারে কারাবন্দী থাকার ঘটনা নতুন বন্দোবস্তের বৈষম্যহীনতার দাবিকে কার্যত ভেঙে দেয়। শিশু-কিশোরসহ এত মানুষের আটক থাকা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ প্রকাশ এবং তারপরও সরকারের নীরবতা—সব মিলিয়ে এটি স্পষ্ট করে দেয়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ও অধিকার এখনো রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারে নেই। বৈষম্যহীনতার কথা বলা হলে এই বাস্তবতাগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেটি অনেকটাই ওপর থেকে চাপানো কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নির্বাচন, সংস্কার কমিশন ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ভাষা যতই শোনা যাক না কেন, তৃণমূল মানুষের কণ্ঠ সেখানে খুব দুর্বলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশনে খেটে খাওয়া মানুষের অংশগ্রহণ কতটুকু ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আসন্ন গণভোটের প্রশ্নগুলো একজন সাধারণ নাগরিক কতটা বুঝতে পারছেন, সেটিও গভীরভাবে ভাবার বিষয়। যে নারী, যে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিক্ষার্থী কিংবা যে রিকশাচালকের অংশগ্রহণে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সর্বজনীন রূপ পেয়েছিল, তাঁদের জীবনে এই সংস্কারগুলো বাস্তবে কী পরিবর্তন আনছে, তা স্পষ্ট নয়।
নারীদের জীবনমান ও রাজনৈতিক উপস্থিতির চিত্র নতুন বন্দোবস্তের আরেকটি বড় ব্যর্থতার জায়গা। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, ডিজিটাল সহিংসতা ও গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তাহীনতা অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও কমেনি। বিভিন্ন জরিপে নারীরা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবকে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও তাঁদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক ভয়াবহ। সংসদে ৪০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের দাবি এবং দলগুলোতে অন্তত ৩০ শতাংশ নারী মনোনয়নের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন থাকলেও আসন্ন নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার চার শতাংশের সামান্য বেশি। বহু রাজনৈতিক দলে একজন নারী প্রার্থীও নেই, যা নতুন বন্দোবস্তের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
আইন ও নীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার অতীতে করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে দলগুলো ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যেও এই পুরোনো পিতৃতান্ত্রিক চর্চার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, জুলাই আন্দোলনের বৈষম্যহীনতার দাবি কি আদৌ নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে রূপ নিয়েছে, নাকি সেটি কেবল বক্তৃতা ও স্লোগানেই সীমাবদ্ধ?
সবশেষে বলা যায়, শান্তি, সুরক্ষা ও বৈষম্যহীনতা কোনো একটি দলকে দমন করে বা ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমেই আসে না। একটি সমাজের প্রকৃত চেহারা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে তার নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনে। এই গোষ্ঠীগুলো যেহেতু ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে থাকে, তাই তাদের অভিজ্ঞতাই বলে দেয় রাষ্ট্র আসলে কতটা ন্যায়সংগত ও মানবিক।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের আমলনামা মূল্যায়ন করতে হলে শাসক বা সুবিধাভোগী এলিটদের অভিজ্ঞতার আলোকে নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতার নিরিখে তা করতে হবে। নইলে তথাকথিত সংস্কার ও নতুন বন্দোবস্ত কাগজে-কলমে যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, বাস্তবে তা অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকরই থেকে যাবে। নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি তখন আরেকটি অপূর্ণ স্বপ্নে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিই বহন করবে।
আপনার মতামত জানানঃ