মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর শতকরা ৫০০ ভাগ শুল্ক আরোপের যে প্রস্তাব সামনে এসেছে, তা শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ইস্যু নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা বিলের প্রতি সমর্থন দেওয়ায় বিষয়টি এখন আর কেবল কংগ্রেসের করিডোরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতির অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রস্তাবিত এই বিল পাস হলে ভারতের মতো বড় অর্থনীতির দেশের জন্য তার প্রভাব হবে বহুমাত্রিক। সহজ হিসাবেই বোঝা যায়, একশ রুপির কোনো পণ্যের ওপর যদি ৫০০ রুপি শুল্ক বসে, তবে সেই পণ্যের দাম দাঁড়াবে ৬০০ রুপি। এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে ভোক্তার ঘাড়ে। কিন্তু এর চেয়েও গভীর প্রশ্ন হলো—এই শুল্ক আসলে কাকে শাস্তি দেবে? ভারতীয় সরকারকে, নাকি সাধারণ মানুষকে? নাকি এটি একটি কৌশলগত বার্তা, যা দিয়ে ওয়াশিংটন বিশ্বকে জানাতে চায় যে রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার মূল্য খুব চড়া হতে পারে?
অনলাইন সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলীয় রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিলে সবুজ সংকেত দিয়েছেন ট্রাম্প। এই বিলটি কেবল ভারতের জন্য নয়; চীন, ব্রাজিলসহ যেসব দেশ রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনার সুযোগ রাখছে। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম স্পষ্ট করেই বলেছেন, এই বিলের লক্ষ্য হলো সেই দেশগুলোকে চাপে ফেলা, যারা জেনেশুনে রাশিয়ার তেল বা ইউরেনিয়াম কিনে ‘ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধযন্ত্রকে রসদ জোগাচ্ছে’।
গ্রাহামের বক্তব্যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থানই প্রতিফলিত হয়। তাঁর মতে, এই নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ মস্কোর অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করতে পারে এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা ক্ষয় করবে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই বিল প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয়, অর্থাৎ এটি একটি নমনীয় কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন দেশভেদে চাপ বাড়াতে বা কমাতে পারবে।
একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে একটি সমঝোতা চুক্তির কথাও বলছে। এই দ্বৈত কৌশল—একদিকে শান্তিচুক্তির চেষ্টা, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার খড়্গ—যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পরিচিত রূপ। গ্রাহাম জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ই তিনি এই বিলের প্রতি প্রেসিডেন্টের সমর্থন পান। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এপি’কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গ্রাহামের যুক্তি স্পষ্ট—ইউক্রেন শান্তির জন্য ছাড় দিচ্ছে, অথচ ভ্লাদিমির পুতিন শুধু কথার কথা বলছেন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই বিলের রাজনৈতিক বাস্তবতা অবশ্য এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। গ্রাহাম জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহেই এ নিয়ে ভোটাভুটি হতে পারে। তবে একই সময়ে সিনেটে একটি সীমিত সরকারি অর্থায়ন প্যাকেজ নিয়েও আলোচনা চলবে, যা আইনপ্রণেতাদের মনোযোগ ভাগ করে দিতে পারে। তবু যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দুই দলীয় সমর্থন থাকায় বিলটি পাস হওয়ার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এই নিষেধাজ্ঞা বিলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ চরিত্র। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেই থেমে থাকছে না; বরং যারা রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করবে, তাদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। সিনেটর গ্রাহাম ও ডেমোক্রেট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল যৌথভাবে প্রণীত এই বিল প্রশাসনকে রাশিয়ার তেল, গ্যাস, ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য রপ্তানি পণ্য কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিচ্ছে। এর উদ্দেশ্য একটাই—রাশিয়ার যুদ্ধ চালানোর অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে দেওয়া।
কিন্তু এই কৌশল যে ঝুঁকিমুক্ত নয়, তা স্পষ্ট। ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সুযোগে রাশিয়া কম দামে তেল বিক্রি শুরু করলে ভারত সেই সুযোগ নেয়। এতে একদিকে ভারতের জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমেছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। এই বাস্তবতায় হঠাৎ করে ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
ভারতের জন্য বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিকও। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারত্ব, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সহযোগিতা—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই নয়াদিল্লির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান সেই ভারসাম্যকে আরও কঠিন করে তুলছে।
চীন ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই বিল কার্যকর হয়, তবে এটি কার্যত একটি নজির স্থাপন করবে—যুক্তরাষ্ট্র তার আর্থিক ও বাণিজ্যিক শক্তি ব্যবহার করে তৃতীয় দেশগুলোর নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন ধরনের চাপ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করবে, যেখানে ডলারনির্ভর ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প পথ খোঁজার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে যে শান্তিচুক্তির কথা বলছে, সেটিও বিতর্কের বাইরে নয়। বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধের ময়দানে কিংবা কূটনৈতিক টেবিলে এখনো কোনো বড় অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। এই প্রেক্ষাপটে নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়ানোকে অনেকেই আলোচনার কৌশল হিসেবে দেখছেন—এক ধরনের ‘চাপ দিয়ে শান্তি’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
সব মিলিয়ে ভারতের ওপর সম্ভাব্য ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব শুধু একটি দেশের জন্য শঙ্কার বার্তা নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এখানে জ্বালানি নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও নৈতিক অবস্থানের সংঘাত স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এটি ন্যায়সঙ্গত চাপ, রাশিয়ার দৃষ্টিতে শত্রুতামূলক আগ্রাসন, আর ভারতের দৃষ্টিতে একটি কঠিন কূটনৈতিক ধাঁধা।
এই বিল পাস হলে বিশ্ব বাণিজ্যে যে ঢেউ উঠবে, তার প্রভাব কেবল ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি দেখিয়ে দেবে, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো কীভাবে অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। আর সেই খেলায় উন্নয়নশীল ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে কতটা সতর্ক হয়ে চলতে হবে, তার একটি বড় সতর্কবার্তাই হয়তো এই প্রস্তাবের মধ্যে লুকিয়ে আছে।
আপনার মতামত জানানঃ