ডোনাল্ড ট্রাম্প, বন্দী নিকোলা মাদুরো ও ভ্লাদিমির পুতিন—এই তিনটি নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হলে অনেকের কাছেই তা ষড়যন্ত্রতত্ত্বের মতো শোনাতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, বিষয়টি আর কল্পনার স্তরে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বোমায় যখন ভেনেজুয়েলার আকাশ জ্বলে উঠছিল, তখন আমরা কেবল একটি সামরিক অভিযানের দৃশ্য দেখিনি; আমরা দেখেছি একটি ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের গভীর রোগলক্ষণ। বাইরে থেকে এই দৃশ্য ক্ষমতার প্রদর্শন মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে এটি ছিল দুর্বলতারই প্রকাশ—একটি বিশ্বব্যবস্থার অবসানের চিহ্ন।
অনেকে বলবেন, দুর্বলতা কিসের? শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তো তার শক্তিই দেখিয়েছে। তারা একটি সার্বভৌম দেশের নেতাকে তুলে নিয়ে গেছে, আর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি ভেনেজুয়েলা ‘চালাবেন’। কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই—নিজ শক্তিতে এতটাই মাতাল না হলে কি কেউ এভাবে আইন, কূটনীতি ও মিত্রতার তোয়াক্কা না করে সামনে এগোয়? ক্ষমতার এই নগ্ন প্রদর্শন আসলে সেই আত্মবিশ্বাসের নয়, বরং সেই আত্মবিশ্বাস হারানোর লক্ষণ, যা একসময় যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের আসনে বসিয়েছিল।
ট্রাম্পের একটি বড় বৈশিষ্ট্য—অনেকে যাকে গুণও বলেন—হলো তাঁর অকপটতা। আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা নগ্ন স্বার্থকে ‘গণতন্ত্র’, ‘মানবাধিকার’ কিংবা ‘নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা’র ভাষায় ঢেকে রাখতেন। ট্রাম্প সেই ভদ্রতার মুখোশ পরেন না। ২০২৩ সালে তিনি গর্ব করে বলেছিলেন, ক্ষমতা ছাড়ার সময় ভেনেজুয়েলা ভাঙনের মুখে ছিল এবং তখনই যদি দেশটি দখল করা যেত, তাহলে ‘একদম পাশের বাড়ি থেকেই’ দরকারি তেল পাওয়া যেত। এই বক্তব্য কোনো হঠাৎ বলে ফেলা কথা নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে তেল, সম্পদ আর ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণের যুক্তি স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই নথি এমন একটি সত্য স্বীকার করেছে, যা ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকার করে এসেছে—যুক্তরাষ্ট্রের একক বৈশ্বিক আধিপত্যের যুগ শেষ।
কৌশলপত্রে প্রায় বিদ্রূপের সুরে বলা হয়েছে, শীতল যুদ্ধের পর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অভিজাত মহল নিজেদের বোঝাতে চেয়েছিল যে সারা পৃথিবীর ওপর স্থায়ী মার্কিন কর্তৃত্বই দেশের জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা। কিন্তু এখন তারা স্বীকার করছে, গ্রিক পুরাণের অ্যাটলাসের মতো গোটা বিশ্বকে কাঁধে তুলে রাখার দিন শেষ। এর মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়েছে; বরং এর মানে হলো, তারা এখন ভিন্ন এক কৌশলে শক্তি প্রয়োগ করতে চাইছে। বৈশ্বিক পুলিশ সাজার বদলে তারা নিজেদের উঠোনে সাম্রাজ্য কায়েমে মনোযোগী হচ্ছে।
এই নতুন বাস্তবতায় গড়ে উঠছে একাধিক শক্তিধর রাষ্ট্রের আলাদা আলাদা প্রভাবক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেই ক্ষেত্র হবে পুরো আমেরিকা মহাদেশ। বহুদিন অবহেলার পর তারা আবার পশ্চিম গোলার্ধে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং সে জন্য মনরো নীতিকে নতুন করে কার্যকর করার কথা বলছে। উনিশ শতকের শুরুতে ঘোষিত এই নীতির আড়ালে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ ঠেকানোর কথা বলা হলেও, বাস্তবে এর ফল হয়েছিল ভিন্ন—লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন অঞ্চলে পরিণত হয়েছিল।
ওয়াশিংটনের সহায়তায় লাতিন আমেরিকায় সহিংসতা কোনো নতুন ঘটনা নয়। চিলিতে সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সিআইএ–সমর্থিত অভ্যুত্থানের পর যে ডানপন্থী স্বৈরতন্ত্র গড়ে ওঠে, তার অভিঘাত আজও অঞ্চলটিকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘নিজেদের মানুষের দায়িত্বহীনতার কারণে কোনো দেশ কমিউনিস্ট হয়ে যাচ্ছে—এটা আমরা বসে বসে দেখব কেন?’ এই যুক্তির ওপর দাঁড়িয়েই ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া এবং মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালানো শাসনগুলো মার্কিন সমর্থন পেয়েছিল।
তবে গত তিন দশকে এই আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ব্রাজিলের লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভার নেতৃত্বে তথাকথিত ‘পিঙ্ক টাইড’ আঞ্চলিক স্বাধীনতার কথা তুলেছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ধীরে ধীরে মহাদেশজুড়ে নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বাড়াতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটেই ভেনেজুয়েলার ওপর ট্রাম্পের হামলাকে অনেকেই দেখছেন পাল্টা চাল হিসেবে—হারানো নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি আসলে কথার মানুষ। তিনি চেঁচামেচি করেন, টুইট করেন, কিন্তু বাস্তবে বড় কোনো পদক্ষেপ নেন না। কারণ তখন তিনি রিপাবলিকান দলের পুরোনো ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর সঙ্গে এক ধরনের অঘোষিত সমঝোতায় ছিলেন। শর্ত ছিল সহজ—তিনি অভিজাতদের কর কমাবেন, বড় ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করবেন; আর বিনিময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইচ্ছেমতো উত্তেজক কথা বলবেন। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে সেই সমঝোতা আর নেই। এবারকার ট্রাম্প আর শুধু ভাষায় সীমাবদ্ধ নন; তিনি পূর্ণ শক্তিতে একটি চরম ডানপন্থী শাসন কায়েম করতে চাইছেন।
এই কারণেই যখন তিনি কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টদের হুমকি দেন, তখন তা গুরুত্ব দিয়ে শোনার কারণ আছে। যখন তিনি বলেন, ‘কিউবা ধসে পড়ার মুখে’, কিংবা ‘গ্রিনল্যান্ড অবশ্যই আমাদের দরকার’—এই কথাগুলোকে আর হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভেনেজুয়েলার ওপর তাঁর প্রকাশ্য বেআইনি হামলায় ইউরোপ যে মিনমিনে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেটিও তিনি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন। এখন যদি ডেনমার্কের সার্বভৌম ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা হয়, তাহলে যৌথ প্রতিরক্ষার নীতিতে গড়ে ওঠা ন্যাটোর ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এই জায়গায় এসে তুলনাটা অনিবার্য হয়ে ওঠে। যেভাবে রাশিয়া প্রকাশ্যে ইউক্রেনের জমি কেড়ে নিয়েছে, সেভাবেই কি যুক্তরাষ্ট্রও একদিন ডেনমার্কের জমি দখল করবে? এর বিরুদ্ধে লন্ডন, প্যারিস বা বার্লিন থেকে হয়তো মৃদু প্রতিবাদ শোনা যাবে, কিন্তু ততক্ষণে পশ্চিমা জোটের ভিত নড়বড়ে হয়ে যাবে। আর এই প্রেক্ষাপটেই ভ্লাদিমির পুতিন–এর সঙ্গে ট্রাম্পের অদ্ভুত সাযুজ্য অনেকের চোখে ধরা পড়ছে।
এই সাযুজ্য কেবল বিদেশনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। সাম্রাজ্যবাদ বাইরে যেমন সহিংসতা জন্ম দেয়, ভেতরেও তেমনই স্বৈরতন্ত্রের বীজ বপন করে। বিশ শতকের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ‘আমেরিকান অ্যান্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট লীগ’ সতর্ক করে বলেছিল, কোনো দেশ একসঙ্গে অর্ধেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আর অর্ধেক সাম্রাজ্য হয়ে টিকে থাকতে পারে না। বিদেশে সাম্রাজ্য গড়তে গেলে শেষ পর্যন্ত দেশের ভেতরেও দমননীতি ঢুকে পড়ে। মার্তিনিকের লেখক এমে সেজেয়ার একে বলেছিলেন সাম্রাজ্যের ‘বুমেরাং’—যা বাইরে গিয়ে সৃষ্টি হয়, তা একসময় ঘুরে এসে নিজের দেশকেই আঘাত করে।
আজ এই বুমেরাং আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর ভাষা ও যুক্তি এখন দেশের ভেতরেও ব্যবহার করা হচ্ছে। ট্রাম্পের উপপ্রধান স্টাফ স্টিফেন মিলার পর্যন্ত বলেছেন, ডেমোক্রেটিক পার্টি নাকি একটি ‘ঘরোয়া চরমপন্থী সংগঠন’। আফগানিস্তান বা ইরাকে যেভাবে সেনা পাঠানো হয়েছিল, সেভাবেই ডেমোক্র্যাট–শাসিত শহরগুলোতে ন্যাশনাল গার্ড নামানো হচ্ছে—যেন সেগুলো শত্রু এলাকা।
এই দৃষ্টিতে দেখলে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিষয়ে ট্রাম্পের নরম মনোভাবও আর রহস্যজনক লাগে না। শোনা যায়, একসময় রাশিয়া প্রস্তাব দিয়েছিল—যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেন থেকে সরে আসে, তাহলে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন প্রভাব মেনে নেওয়া হবে। এমন কোনো সমঝোতা আদৌ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু স্পষ্ট যে, একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে। সেখানে ক্ষমতাধর, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলো জোর খাটিয়ে প্রতিবেশীদের নিয়ন্ত্রণ করবে এবং তাদের সম্পদ দখল করবে।
যা একসময় দুঃস্বপ্ন বলে মনে হতো, আজ তা বাস্তব হয়ে চোখের সামনে ঘটছে। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো উপায়, ইচ্ছা আর শক্তি কি আদৌ আমাদের আছে?
আপনার মতামত জানানঃ