বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ভারতপন্থী’ বা ‘ভারতবিরোধী’ তকমা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতায় এই তকমা আবারও একটি বড় রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে বিএনপিকে ঘিরে। প্রশ্ন হলো, বাস্তব নীতি, বক্তব্য ও রাজনৈতিক আচরণের নিরিখে বিএনপিকে আদৌ ‘ভারতপন্থী’ দল বলা যায় কি না, নাকি এটি একটি সচেতন রাজনৈতিক নির্মাণ, যার লক্ষ্য বিভাজন গভীর করা এবং পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোকে নতুনভাবে শক্তিশালী করা।
ইতিহাস দিয়ে শুরু করা যাক। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্মৃতি কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ওপর গভীর ছাপ ফেলে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও ভারতের ভূমিকা—এ নিয়ে আবেগতাড়িত আলোচনা থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনার শপথ নেওয়ার পর আবেগ নয়, নীতিই মুখ্য হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্কে যে ‘মনোভাবের পরিবর্তন’ এনেছিল, তা সরকারি ঘোষণাপত্রে পুরোপুরি ধরা পড়েনি। তিস্তা চুক্তি হয়নি, ছিটমহল বিনিময়ের মতো বিষয় পরে বাস্তবায়িত হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সেই সফরের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল অনেক গভীর। ভারতের নীতিনির্ধারকেরা তখন কার্যত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন—বাংলাদেশ নীতি মানে হাসিনা সরকার, আর কিছু নয়।
এর পরের দেড় দশক সেই সিদ্ধান্তেরই ধারাবাহিকতা। ভারতের পক্ষ থেকে হাসিনা সরকারের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদকে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী অনিয়ম, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া—এসব বিষয়ে নয়াদিল্লির নীরবতা বা পরোক্ষ সমর্থন বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আজ বাস্তবতা হলো, হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়েছেন, আর তাঁর উপস্থিতি নিজেই ভারতের জন্য একটি কূটনৈতিক বোঝা। বাংলাদেশের অভিজাত মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটি ধারণা প্রবল—ভারত আর বন্ধু রাষ্ট্রের মতো আচরণ করেনি।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপিকে ‘ভারতবিরোধী’ তকমা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে কোনো বড় দলই অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলে না। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর মতো দলও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য আলোচনায় বসে। তাহলে বিএনপির অবস্থান আসলে কী?
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—“সবার আগে বাংলাদেশ।” তাঁর বক্তব্যে ভারতবিরোধিতা নয়, বরং স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতির কথা উঠে আসে। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা, সীমান্তে হত্যা বন্ধ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার দাবি—এসব কোনো অস্বাভাবিক বা উগ্র দাবি নয়। এগুলো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ন্যূনতম স্বার্থরক্ষার ভাষা। তিনি এটাও বলেছেন, ভারত যদি স্বৈরতন্ত্রকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বিরাগভাজন হয়, তাহলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানুষের পাশেই থাকা উচিত। এটি জনমতের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা, কোনো বিদেশবিরোধী উন্মাদনা নয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় বর্তমান বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে ‘শীতল শান্তি’ বলা যায়। যুদ্ধ নেই, কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে, কিন্তু পারস্পরিক আস্থা নেই। বিএনপির প্রস্তাবিত অবস্থান এই বাস্তবতাকেই স্বীকার করে নেয়। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকবে, যৌথ কমিটি ও আমলাতান্ত্রিক বৈঠক চলবে, কিন্তু ভারতের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন না এলে বড় কোনো কৌশলগত বা অর্থনৈতিক ‘হাইপ-ওয়ালা’ অগ্রগতি হবে না। এটি আবেগী সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাস্তবতার স্বীকৃতি।
ভারতীয় অভিজাত মহলের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ কখনোই খুব উচ্চ অগ্রাধিকার পায়নি—এই সত্য ইতিহাসই বলে দেয়। রামচন্দ্র গুহর ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী বা ডেভিড মালোনের ডাজ দ্য এলিফ্যান্ট ড্যান্স—এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোতে বাংলাদেশের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে ক্ষীণ। এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশ অপ্রাসঙ্গিক, বরং ভারতের নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশকে মূলত নিরাপত্তার চশমায় দেখা হয়েছে। ২০০০-এর দশকে ভারতের নিরাপত্তা মহলে ধারণা জন্মেছিল যে বাংলাদেশ হয় ভারতের নিরাপত্তাবিরোধী শক্তিকে আশ্রয় দেয়, নয়তো নীরব সমর্থন করে। ২০০৯-এর পর হাসিনা সরকার এলে তারা সেই আশঙ্কা থেকে মুক্তি পায় এবং একচোখা সমর্থনের নীতি গ্রহণ করে।
কিন্তু সেই নীতি এখন ভয়াবহভাবে বুমেরাং হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজে ভারতের প্রতি যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে, তা নজিরবিহীন। পিউ রিসার্চ বা ওআরএফের জরিপগুলোতেও দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতি সবচেয়ে নেতিবাচক মনোভাব বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বিএনপির অবস্থান জনমতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন—ভারতপন্থী না ভারতবিরোধী হওয়া নয়।
পানি বণ্টনের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান আরও স্পষ্ট। ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে কার্যকর চুক্তি মাত্র একটি—১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি। তিস্তার জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন যেখানে প্রায় ৫ হাজার কিউসেক পানি, সেখানে পাওয়া যায় এক হাজারেরও কম। পদ্মা (গঙ্গা) পানিচুক্তির মেয়াদও শেষের দিকে। বিএনপি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও গঙ্গা ব্যারাজের কথা বলেছে—যা ভারতের বাধার কারণে আগে কেউ সাহস করে বলেনি। এটি কি ভারতবিরোধিতা, নাকি দীর্ঘদিনের বঞ্চনার বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান?
সীমান্ত হত্যার বিষয়েও একই কথা প্রযোজ্য। দুই দশকে সীমান্তে এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এটি কার্যত ‘শুট টু কিল’ নীতির প্রতিফলন, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিএনপি এখানে নন-লিথাল অস্ত্র ব্যবহারের দাবি তুলেছে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি তোলার কথা বলেছে। এটি কোনো রাষ্ট্রবিরোধী উসকানি নয়, বরং নাগরিকের জীবনের মূল্য দেওয়ার রাজনীতি।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বিএনপির অবস্থান বাস্তববাদী। বাংলাদেশের রপ্তানিতে ভারতের অংশ মাত্র ২–৩ শতাংশ, অথচ বাণিজ্যঘাটতি ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ট্রানজিট সুবিধা দেওয়া হলেও নেপাল বা ভুটানের সঙ্গে করিডরের মতো প্রত্যাশিত সুবিধা বাংলাদেশ পায়নি। এই অসম সম্পর্কের সমালোচনা করা কি ভারতবিদ্বেষ, নাকি ন্যায্য প্রশ্ন? তুলা, খাদ্যপণ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা-পর্যটনের মতো খাতে বিকল্প উৎস তৈরির কথা বলা তো যে কোনো স্বনির্ভর অর্থনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত।
এখানেই আসে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নটি। ‘ভারতপন্থী’ ট্যাগ দিয়ে বিভাজনের রাজনীতি আসলে কাকে লাভবান করে? যারা এখনো সুস্পষ্ট কোনো নীতি দেখাতে পারেনি, বরং ভাঙচুর ও মবের মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরি করছে, তাদের রাজনীতি অতীতে ফ্যাসিস্ট শাসনেরই পুনরাবৃত্তি। এই বিভাজন শেষ পর্যন্ত ভারত ও পতিত ক্ষমতাকাঠামোকেই শক্তিশালী করে। বাস্তবতা হলো, ভারত এই দেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট দলকেই বিশ্বাস করেছে। সেই বিশ্বাস ভাঙতে সময় লাগবে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অন্য সব দল ‘ভারতবিরোধী’ হয়ে গেছে।
বিসমার্কের কথাই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক—রাষ্ট্রের স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই, আছে কেবল স্বার্থ। বিএনপির অবস্থান সেই স্বার্থভিত্তিক বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করে। ‘লুক ইস্ট’ নীতি, সার্ক পুনরুজ্জীবন, পশ্চিমের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ—এসব উদ্যোগ একক আধিপত্যের বিকল্প তৈরি করতে পারে। সীমান্তে অশান্তি, একতরফা চুক্তি বা নীতিহীন সমর্থন কোনো দেশের জন্যই মঙ্গলজনক নয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিএনপিকে ‘ভারতপন্থী’ বা ‘ভারতবিরোধী’ এই সরলীকৃত তকমায় বোঝা যায় না। দলটির বক্তব্য ও প্রস্তাবনায় আবেগ নয়, বরং স্বার্থকেন্দ্রিক, বাস্তববাদী কূটনীতির ছাপ স্পষ্ট। বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি আত্মমর্যাদাশীল ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে এগোতে চায়, তবে এই ধরনের বাস্তববাদী আলোচনাই প্রয়োজন—ট্যাগের রাজনীতি নয়।
আপনার মতামত জানানঃ