ইরান আবারও এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কটের মুখে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মুদ্রার ঐতিহাসিক দরপতন এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ—সব মিলিয়ে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, তা আর কেবল অর্থনৈতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। এই আন্দোলন ক্রমেই রূপ নিচ্ছে শাসনব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলার এক বিস্তৃত গণ–অভ্যুত্থানে। বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, ইসলামি বিপ্লবের প্রায় পাঁচ দশক পর ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী এখন তাদের শাসনামলের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি।
গত মাসে তেহরানের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড বাজার থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদ দ্রুতই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের ৩১টি প্রদেশেই বিক্ষোভের খবর মিলছে। দোকানদার, বেকার তরুণ, শ্রমজীবী মানুষ—সব শ্রেণির অংশগ্রহণে এই আন্দোলন এক বিস্তৃত সামাজিক রূপ পেয়েছে। যদিও ২০২২–২৩ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যে গণ–আন্দোলন হয়েছিল, তার মতো ব্যাপকতা এখনও অর্জিত হয়নি, তবু এবারের বিক্ষোভের চরিত্র আলাদা। সেখানে নারীদের নেতৃত্ব ও হিজাববিরোধী স্লোগান মুখ্য ছিল, আর এবার সামনে চলে এসেছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা নিয়ে হতাশা।
জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড দরপতন এই ক্ষোভের তাৎক্ষণিক অনুঘটক। আমদানি–নির্ভর অর্থনীতিতে রিয়ালের মূল্যপতন মানেই সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি আঘাত। নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ, বেতন সেই তুলনায় বাড়েনি, আর তরুণ প্রজন্মের বড় অংশই বেকার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, চলমান সহিংসতায় অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী ও চারজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় ২ হাজার ২০০ জন। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যাই নয়, বরং রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের গভীর সংকটের প্রতিফলন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার আবারও পরিচিত পথেই হেঁটেছে। দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যত অচল। নেটব্লকসের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্ল্যাকআউট কয়েক দিন ধরে অব্যাহত ছিল। একই সঙ্গে রাস্তায় নামানো হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী, কোথাও কোথাও টিয়ার গ্যাস ও বলপ্রয়োগের খবর পাওয়া গেছে। অথচ সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক দাবিতে বিক্ষোভ বৈধ এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা হবে। এই দ্বিমুখী অবস্থানই শাসকগোষ্ঠীর দোটানার পরিচয় দেয়—একদিকে দমন, অন্যদিকে আপসের ভাষা।
এই সঙ্কটের কেন্দ্রে রয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। দীর্ঘ শাসনামলে তিনি বহুবার বিক্ষোভ ও চাপের মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। কারণ, এই আন্দোলন শুধু নির্দিষ্ট কোনও নীতির বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো শাসনব্যবস্থার অগ্রাধিকার নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। খামেনি অবশ্য স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইরান ‘শত্রুর কাছে কখনোই মাথা নত করবে না’ এবং এই বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু দেশের ভেতরে অনেকের কাছেই এই ব্যাখ্যা আর গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের আদর্শিক দূরত্ব প্রকট হয়ে উঠেছে। ৩০ বছরের নিচে যে বিপুল জনগোষ্ঠী, তারা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের স্মৃতি বহন করে না। তাদের কাছে বাধ্যতামূলক হিজাব, কঠোর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বিপুল অর্থব্যয়ের যুক্তি দুর্বল। পশ্চিম ইরানের লোরেস্তান প্রদেশের কুহদাশত শহরের ২৫ বছর বয়সী স্নাতক মিনা বলছেন, তিনি শুধু একটি স্বাভাবিক জীবন চান—যেখানে কাজ থাকবে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় থাকবে না। তাঁর মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি বা আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের চেয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মান উন্নয়নই এখন বেশি জরুরি।
এই মনোভাব শুধু বিচ্ছিন্ন কণ্ঠ নয়। বহু শহরে শোনা যাচ্ছে, ‘গাজা নয়, লেবানন নয়—আমার জীবন ইরানের জন্য’—এমন স্লোগান। ইরানের আঞ্চলিক নীতির বিরুদ্ধে এই ক্ষোভ নতুন নয়, তবে এবার তা আরও প্রকাশ্য। সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুতি এবং ইরাকে ইরানপন্থী মিলিশিয়ারা চাপের মুখে পড়েছে। এর ওপর সিরিয়ায় বাশার আল–আসাদের পতনে তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব বড় ধাক্কা খেয়েছে। এই সবকিছু মিলিয়ে ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ কৌশল দেশটির ভেতরেই প্রশ্নের মুখে।
রয়টার্স যাচাইকৃত একাধিক ভিডিও এই পরিবর্তনের প্রতীকী চিত্র তুলে ধরেছে। উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে বিক্ষোভকারীদের একটি বড় ইরানি পতাকা নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে দেখা যায়। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়, দক্ষিণ–পশ্চিমের ইলম প্রদেশের আবদানানে আনন্দমিছিল বের হয়। এমনকি গোনাবাদ শহরে একটি মাদ্রাসা থেকে তরুণদের বেরিয়ে এসে বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার দৃশ্য অনেকের কাছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আনুগত্যের ভাঙনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
বিদেশ থেকেও পরিস্থিতির দিকে নজর বাড়ছে। নির্বাসনে থাকা ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভি বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আন্দোলন জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ইরানের ভেতরে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে—কারণ বহু মানুষ শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চান ঠিকই, কিন্তু রাজতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নে দ্বিধান্বিত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান প্রভাবশালী রাজনীতিকদের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নিরাপত্তা বাহিনী যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তবে তিনি তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারেন। যদিও তিনি কীভাবে বা কী মাত্রায়—তা স্পষ্ট করেননি।
এই বিদেশি বক্তব্য ইরানের ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। অনেক সরকারবিরোধী নাগরিকও বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ চান না। ইসফাহানের ৩১ বছর বয়সী এক বাসিন্দার কথায়, “আমরা যুদ্ধ চাই না। আমরা শুধু ইসলামি প্রজাতন্ত্র ছাড়া একটি শান্তিপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ ইরান চাই।” এই বক্তব্যই বর্তমান আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—এটি বাইরের শক্তির সহায়তায় নয়, বরং ভেতর থেকেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অতীতে দমন–পীড়ন ও সীমিত সংস্কারের সমন্বয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থা একাধিক সংকট টিকে গেছে। কিন্তু এবার সেই কৌশল কার্যকারিতা হারাতে বসেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার ভাষায়, “এটা শুধু রিয়ালের পতন নয়, এটা মানুষের বিশ্বাসের পতন।” রাষ্ট্রের আদর্শিক স্তম্ভগুলো—বাধ্যতামূলক সামাজিক বিধিনিষেধ থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি—তরুণ সমাজের কাছে আর গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না।
এই বাস্তবতায় ইরানের সামনে পথ খুব সীমিত। একদিকে আরও কঠোর দমন, যা হয়তো সাময়িকভাবে রাস্তাকে শান্ত করবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষোভ বাড়াবে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার, যা শাসকগোষ্ঠীর আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোন পথে তারা যাবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বর্তমান বিক্ষোভ ইরানের ইতিহাসে আরেকটি ক্ষণস্থায়ী অধ্যায় নয়। এটি সেই গভীর ফাটলের প্রকাশ, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজ ক্রমেই আলাদা দিকে সরে যাচ্ছে।
এই আন্দোলনের শেষ পরিণতি কী হবে, তা বলা কঠিন। শাসনব্যবস্থার পতন সম্ভব, কিন্তু নিশ্চিত নয়। তবে যা নিশ্চিত, তা হলো—ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আর প্রান্তিক নয়। তা এখন রাজপথে, মানুষের কণ্ঠে, আর প্রতিদিনের জীবনের অভিজ্ঞতায় স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।
আপনার মতামত জানানঃ