কলম্বিয়ার রাজনীতিতে সাম্প্রতিক দিনগুলো অস্বাভাবিক উত্তেজনায় ভরা। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রকাশ্য উদ্বেগ জানিয়ে যখন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বিবিসিকে বলেন যে এটি একটি ‘বাস্তব হুমকি’, তখন বিষয়টি আর কূটনৈতিক বক্তব্যের সীমায় থাকেনি। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের স্মৃতি এখনও তাজা—পানামা হারানোর ক্ষত, সামরিক অভিযান, গোপন গোয়েন্দা কার্যক্রম—সব মিলিয়ে পেত্রোর এই বক্তব্য শুধু বর্তমান সংকট নয়, বরং একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।
পেত্রোর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক আচরণ। তাঁর মতে, ওয়াশিংটন এখনও বহু দেশকে নিজেদের ‘সাম্রাজ্যের অংশ’ হিসেবেই দেখে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পর যখন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন, কলম্বিয়াকে লক্ষ্য করে সামরিক পদক্ষেপ ‘ভালো শোনাচ্ছে’, তখন সেটিকে নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পেত্রোর ভাষায়, এটি সরাসরি সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাতের ইঙ্গিত।
এই উত্তেজনার পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিও বড় ভূমিকা রাখছে। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন দমনে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই-এর কার্যক্রম ব্যাপকভাবে জোরদার করেছে। পেত্রো এই সংস্থার আচরণকে ‘নাৎসি ব্রিগেড’-এর সঙ্গে তুলনা করে বলেন, তারা শুধু লাতিন আমেরিকানদের তাড়া করছে না, বরং মার্কিন নাগরিকদেরও হত্যা করছে। মিনিয়াপোলিসে এক মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা এই অভিযোগকে আরও ঘনীভূত করেছে। তাঁর মতে, এই ধরনের নীতি যুক্তরাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে—আর ইতিহাস দেখায়, বিচ্ছিন্ন থেকে কোনো সাম্রাজ্য টেকে না।
এই বক্তব্য কেবল আবেগপ্রবণ সমালোচনা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত আছে পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা। মার্কিন প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় লাখের বেশি মানুষকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, আর প্রায় ১৯ লাখ অভিবাসী ‘স্বেচ্ছায়’ দেশ ছেড়েছেন। আইসিই হেফাজতে থাকা মানুষের সংখ্যা এক সময় ৬৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পেত্রোর বক্তব্য লাতিন আমেরিকার বহু দেশের অনুভূতির প্রতিধ্বনি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
পেত্রো ও ট্রাম্পের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরের বিরুদ্ধে কটাক্ষ, শুল্ক আরোপের হুমকি—সব মিলিয়ে এই সম্পর্ক কখনোই স্বাভাবিক ছিল না। বুধবার সন্ধ্যায় দুই নেতার মধ্যে এক ঘণ্টার ফোনালাপ হলেও তাতে সম্পর্কের মৌলিক উন্নতির ইঙ্গিত মেলেনি। ট্রাম্প যদিও পরে সেটিকে ‘বিরাট সম্মান’ বলে উল্লেখ করেন, পেত্রোর বক্তব্যে স্পষ্ট, মতপার্থক্য রয়ে গেছে। আলোচনায় মাদক পাচার, ভেনেজুয়েলা ইস্যু এবং লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা উঠে আসে—যা এই উত্তেজনার মূল কারণগুলোকেই সামনে আনে।
ভেনেজুয়েলা এই সংকটের কেন্দ্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনা শুধু কারাকাস নয়, গোটা অঞ্চলে শোরগোল ফেলে দেয়। পেত্রোর অভিযোগ, এই অভিযান তেল ও কয়লার মতো সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই চালানো হয়েছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে না যেত, তবে জীবাশ্ম জ্বালানিকে ঘিরে এই ধরনের সংঘাতের প্রয়োজনই পড়ত না। এই বক্তব্যে পরিবেশনীতি ও ভূরাজনীতির সংযোগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে কলম্বিয়ার ভেতরে প্রতিক্রিয়াও তীব্র। ট্রাম্পের সামরিক হুমকির মন্তব্যের পর দেশজুড়ে সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের পক্ষে বিক্ষোভ হয়েছে। মানুষের স্মৃতিতে এখনও বিংশ শতকে পানামা বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা জ্বলজ্বল করছে। পেত্রো নিজেও সেটির উল্লেখ করে বলেন, কলম্বিয়া জানে কীভাবে বড় শক্তির চাপ মোকাবিলা করতে হয়। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, কলম্বিয়ার হাতে আধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা বিশাল সেনাবাহিনী নেই। তাদের শক্তি জনগণ, পাহাড় আর জঙ্গল—যেমনটা ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে।
তবু পেত্রোর কণ্ঠে সামরিক উত্তেজনার বদলে আলোচনার ওপর জোরই বেশি। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই হামলার পথে যায়, তাহলে কলম্বিয়া কীভাবে আত্মরক্ষা করবে—এই প্রশ্নে তিনি বলেন, তাঁর প্রথম পছন্দ কূটনৈতিক সমাধান। তিনি জানান, এই লক্ষ্যেই কাজ চলছে। একই সঙ্গে তিনি ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ-এর সঙ্গে যোগাযোগের কথা স্বীকার করেন এবং তাঁকে কলম্বিয়ায় আমন্ত্রণ জানান। পেত্রোর মতে, ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপের শিকার, আর সেই অভিজ্ঞতা কলম্বিয়ার জন্যও সতর্কবার্তা।
কলম্বিয়ার বাস্তবতা আরও জটিল, কারণ দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকেন উৎপাদক। কোকা পাতার চাষ, মাদক পাচার আর সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি—এই তিনের মেলবন্ধন কলম্বিয়াকে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিতিশীল করে রেখেছে। পেত্রো ক্ষমতায় আসার পর ‘সম্পূর্ণ শান্তি’ নীতি গ্রহণ করেন, যেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সমালোচকেরা বলেন, এই নীতি অতিরিক্ত নরম, যার ফলে কোকেন উৎপাদন বেড়েছে। পেত্রো অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কোকা চাষের বৃদ্ধি ধীর হয়েছে এবং দক্ষিণ কলম্বিয়ায় আলোচনার ফলে হত্যার হার কমেছে।
এই দুই সমান্তরাল পথ—আলোচনা ও সামরিক অভিযান—নিয়েই তিনি এগোচ্ছেন বলে দাবি করেন পেত্রো। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা নির্বোধ নই, আমরা জানি কার সঙ্গে আলোচনা করছি।’ এই বক্তব্যে তাঁর রাজনৈতিক বাস্তববাদ স্পষ্ট, তবে ঝুঁকিও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং দেশের ভেতরের মাদক অর্থনীতি—সব মিলিয়ে কলম্বিয়া এক কঠিন সমীকরণের মুখে দাঁড়িয়ে।
এই সংকটের বৃহত্তর অর্থ হলো লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠা। শীতল যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে আধুনিক কালে মাদকবিরোধী যুদ্ধ—ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপ বহুবার অঞ্চলটির রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। পেত্রোর বক্তব্য সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলছেন, সাম্রাজ্যবাদী স্বপ্নে অন্ধ হলে তারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়—এই উত্তেজনা কি সামরিক সংঘাতে রূপ নেবে, নাকি কূটনীতির পথেই সমাধান হবে? আপাতত পেত্রোর কণ্ঠে উদ্বেগের পাশাপাশি একটি স্পষ্ট বার্তা আছে: কলম্বিয়া যুদ্ধ চায় না, কিন্তু সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসও করতে রাজি নয়। এই অবস্থানই আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র–কলম্বিয়া সম্পর্কের দিকনির্দেশ ঠিক করে দেবে।
আপনার মতামত জানানঃ