বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘জাতীয় সরকার’ শব্দবন্ধটি নতুন নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে এটি নতুন করে ভারী অর্থ বহন করছে। ১২ই ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী যখন নির্বাচন–পরবর্তী জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে, আর বিএনপি যখন জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই দুই প্রস্তাব কি আসলে একই স্রোতের দুই নাম, নাকি ভিন্ন দুই রাজনৈতিক কৌশল?
এই প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান–এর সাম্প্রতিক বৈঠক। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর সমবেদনা জানাতে গিয়ে হওয়া এই বৈঠকটি আনুষ্ঠানিকভাবে শোকের পরিসরেই সীমাবদ্ধ ছিল বলা হলেও, বৈঠকের পর জামায়াত আমিরের বক্তব্য রাজনীতির ময়দানে নতুন জল্পনার জন্ম দেয়। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগে সবাই মিলে বসে জাতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এই বক্তব্যে কোনও স্পষ্ট কাঠামো না থাকলেও, ‘সরকার গঠনের আগে আলোচনা’—এই বাক্যাংশটিই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ এই বক্তব্যকে ইঙ্গিতপূর্ণ বলছেন। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরকার গঠনের আগে আলোচনা মানেই কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং ক্ষমতার কাঠামোয় অংশীদার হওয়ার সম্ভাব্য দরকষাকষির ইশারা। যদিও জামায়াত প্রকাশ্যে দাবি করছে, তারা কোনও নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগির কথা বলেনি, বরং সব দলের সহযোগিতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার কথা বলেছে।
এই অবস্থানে পৌঁছনোর পেছনে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের পর ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেখানে রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে সম্ভব কি না—এই প্রশ্নটি সামনে এসেছে। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক কাঠামো—সব ক্ষেত্রেই ভঙ্গুরতার অভিযোগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াত বলছে, এককভাবে সরকার চালানো কঠিন, তাই জাতীয় সরকার প্রয়োজন।
অন্যদিকে বিএনপির অবস্থান শব্দে কাছাকাছি হলেও অর্থে আলাদা। দলটি বহু আগেই ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ ধারণা সামনে এনেছিল। ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনের সময় ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপি স্পষ্টভাবে বলেছিল, তাদের সঙ্গে আন্দোলনে থাকা দলগুলোকে নিয়ে তারা সরকার গঠন করতে চায়। সেখানে জামায়াতকে সচেতনভাবেই বাদ রাখা হয়েছিল। এখন নির্বাচন–পরবর্তী বাস্তবতায়ও বিএনপি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি বলেই দলটির শীর্ষ নেতারা জানাচ্ছেন।
এই দুই অবস্থানের পার্থক্য বোঝার জন্য ‘জাতীয় সরকার’ আর ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’—এই দুই ধারণার ভেতরের রাজনীতি বুঝতে হয়। জামায়াতের জাতীয় সরকার প্রস্তাব মূলত শর্তসাপেক্ষ। দলটি তিনটি শর্ত সামনে এনেছে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনায় গৃহীত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন। এই শর্তে যারা রাজি হবে, তাদের নিয়েই সরকার গঠনের কথা বলছে জামায়াত। এর মধ্যে এক ধরনের নৈতিক উচ্চভূমি দখলের চেষ্টা যেমন আছে, তেমনি বিএনপির অতীত দুর্নীতির অভিযোগের দিকে সূক্ষ্ম ইঙ্গিতও রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
বিএনপি অবশ্য বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখছে। দলটির নেতাদের যুক্তি, সব দলকে নিয়ে সরকার গঠন করলে সংসদে কার্যকর বিরোধী দল থাকবে না। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এমনিতেই সংসদ একপক্ষীয় হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে; সেখানে আবার সব বড় দল সরকারে থাকলে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। বিএনপি তাই সরকার পরিচালনায় সহযোগিতা আর ক্ষমতার অংশীদার হওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রাখতে চাইছে।
এই অবস্থানগত পার্থক্যের পেছনে রয়েছে গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক যে ক্রমেই টানাপোড়েনের দিকে গেছে, তা প্রকাশ্য। যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াতকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত না করা, পাল্টা অভিযোগ–বক্তব্য—সব মিলিয়ে দুই দলের মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়েছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর সেই দূরত্ব আরও বেড়েছে। এখন তারা নির্বাচনের মাঠেও দুই আলাদা শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
জামায়াত ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ প্রায় দশটি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে একটি জোট গড়েছে। বিএনপি অন্যদিকে তাদের যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের নিয়ে আলাদা শিবিরে। এই বাস্তবতায় নির্বাচন পরবর্তী সরকার গঠনে তারা একে অপরকে বাদ রেখেই পরিকল্পনা সাজাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবু রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। নির্বাচনের ফলাফল যদি এমন হয় যে কোনও একক জোট স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তাহলে আপস–সমঝোতার দরজা খুলতেই পারে। তখন আজকের এই জাতীয় সরকার বনাম জাতীয় ঐকমত্যের সরকার বিতর্ক নতুন রূপ নিতে পারে। লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, জামায়াত মূলত ক্ষমতার সঙ্গে থাকতে চায় এবং সেই বাস্তবতা থেকেই তারা সরকার গঠনের আগেই আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। যদিও জামায়াত এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ, বাস্তব রাজনীতিতে তাদের অবস্থান যে কৌশলগত, তা স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে, বিএনপি–জামায়াত একসঙ্গে জাতীয় সরকার গঠন করবে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া কঠিন। প্রকাশ্য অবস্থান, নির্বাচনী সমীকরণ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস—সবকিছু মিলিয়ে এই সম্ভাবনা আপাতত কম বলেই মনে করছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাস্তবতা দ্রুত বদলায়। নির্বাচন–পরবর্তী পরিস্থিতি, সংসদের অঙ্ক এবং জনমতের চাপ—এই তিনের সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত ঠিক করে দেবে, জাতীয় সরকার কেবল আলোচনার শব্দ হয়েই থাকবে, নাকি বাস্তব ক্ষমতার কাঠামোতে রূপ নেবে।
আপনার মতামত জানানঃ