
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অস্থিরতা নতুন করে চোখে পড়ছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংস ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং এই সহিংসতা ক্রমে প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে এবং এর ছায়া পড়ছে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে পুরো রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর। ঢাকার ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদিকে দিনে-দুপুরে গুলি করে হত্যার ঘটনা যেন সেই বাস্তবতারই এক প্রতীকী চিত্র। তফসিল ঘোষণার পরদিনই রাজধানীর ব্যস্ত এলাকায় এমন হত্যাকাণ্ড শুধু জনমনে আতঙ্কই ছড়ায়নি, বরং নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।
এই একটি ঘটনা নয়। চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যার ঘটনা, কক্সবাজারে প্রার্থীকে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে হুমকি, নরসিংদীতে দোকান ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা—সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সহিংসতার একটি ধারাবাহিক চিত্র তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই সারাদেশে শত শত রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছে শতাধিক মানুষ এবং আহত হয়েছে হাজারো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মব ভায়োলেন্স ও গণপিটুনির মতো ঘটনাও, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে আসছে, তা হলো—এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য বারবার বলছে, সব সহিংস ঘটনাকে সরাসরি রাজনৈতিক বা নির্বাচনকেন্দ্রিক বলা ঠিক নয়। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, সমাজে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি একটি বড় কারণ, যার দায় শুধু নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপানো যায় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, সহিংসতার ধরন ও মাত্রা ততই রাজনৈতিক রং ধারণ করছে, এবং এর প্রভাব সরাসরি ভোটের মাঠে পড়ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও এখানে বড় আলোচনার বিষয়। বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, হামলা বা সহিংসতা চলাকালেও পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মানববন্ধনে হামলার সময় পুলিশের সামনে সহিংসতা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে শক্ত অবস্থান না নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। একইভাবে, ওসমান হাদি হত্যার দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে গণমাধ্যম কার্যালয় ও রাজনৈতিক স্থাপনায় হামলার ঘটনায়ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে সেই নির্দেশনার প্রতিফলন কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত না হলে সহিংসতা কমার বদলে অনেক সময় বেড়ে যায়। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলো যখন একে অপরকে দোষারোপ করে এবং প্রশাসনকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করার অভিযোগ তোলে, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অস্ত্রের সহজলভ্যতা। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের দিন দেশের বিভিন্ন থানায় অস্ত্র ও গুলি লুটের যে ঘটনা ঘটেছিল, তার পুরোপুরি সমাধান এখনো হয়নি। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলির একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই অস্ত্রগুলোই যে সাম্প্রতিক সহিংসতায় ব্যবহৃত হচ্ছে না, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ফলে নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার নিরাপত্তা ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একদিকে দলগুলো নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ করছে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ আসছে। মনোনয়ন বাণিজ্য, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দলীয় প্রার্থিতা নিয়ে বিরোধ—এসব কারণেও সহিংসতা বাড়ছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। বিশেষ করে মনোনয়ন দাখিল ও প্রত্যাহার ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, তা অনেক সময় সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নেয়।
নির্বাচনী প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই হামলা, ভাঙচুর ও হুমকির ঘটনা ঘটছে—এটি ভবিষ্যতের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। অতীতের নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, প্রচারণা শুরুর পর সহিংসতার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এবারও যদি একই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা যেভাবেই হোক একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে চায়। তবে শুধু ঘোষণায় নয়, বাস্তব পদক্ষেপেই এর প্রমাণ দিতে হবে। সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা, দোষীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা—এসবই এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। নির্বাচন মানেই প্রতিপক্ষকে দমন বা ভয় দেখানো নয়; বরং জনগণের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরার একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সহিংসতা ও প্রাণহানির এই ঊর্ধ্বগতি শুধু নির্বাচন কমিশনের জন্যই নয়, পুরো রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে নির্বাচনের বৈধতা, অংশগ্রহণ এবং জনগণের আস্থা—সবকিছুই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এই সময়ে বাংলাদেশ যে গণতান্ত্রিক পথে এগোতে চায়, তার সফলতা অনেকটাই নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হয় তার ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ