Trial Run

কৃষি বিজ্ঞানীদের ওপর নজরদারি, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

ছবি : ভোরেরপাতা

দেশের শীর্ষ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বিনা) ডিজি ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়ম আর ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিনিয়র বিজ্ঞানীদের কক্ষে কক্ষে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে নজরদারী করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এনিয়ে খোদ বিজ্ঞানী সমিতি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভেতরে-বাইরে চাপা ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, বিনার বর্তমান ডিজি গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ এবং উপকেন্দ্রসমূহ উন্নয়ন র্শীষক প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। ২০১৬ সালের ১২এপ্রিল কৃষি মন্ত্রনালয়ের যুগ্ম সচিব ড.আব্দুর রৌফের নেতৃত্বে গঠিত ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি এ ঘটনায় অভিযুক্ত মির্জা মোফাজ্জল ইসলামদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তা ধামাচাপা গেলে লবিংয়ের জোরে সিনিয়রদের ডিঙিয়ে ড.মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম ডিজি পদ ভাগিয়ে নেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ডিজি পদ লাভ করেই ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেছেন ড.মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম। সিনিয়র বিজ্ঞানীদের কক্ষে কক্ষে বসিয়েছেন সিসি ক্যামেরা। এতে ভুক্তভোগীরা বিব্রত বোধ করলেও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।

তবে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (গবেষনা) ড. হুসনে আরা বেগম। তিনি জানান, আমার রুমে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এতে খুব খারাপ লাগে। কিন্তু কী বলব, বলে তিনি আর কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (প্রশিক্ষন ও পরিকল্পনা) ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ডিজি মহোদয় আমাদের জুনিয়র। তিনি ডিজি হয়েছেন লবিংয়ে। এনিয়ে আমার কিছু বলার নেই। তবে তিনি কেন আমাদের কক্ষে সিসি ক্যামেরা বসিয়েছেন তা বুঝতে পারিনি। লজ্জায় উনাকেও কিছু বলিনি। তাছাড়া চাকরী করি সব কথা বলতেও পারছি না।

সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী সমিতি সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের হয়রানি-অনিয়ম ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টির অভিযোগে ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর ড. কামরুজ্জামানকে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা হতে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কীটতত্ত্ব বিভাগে বদলি করেন সাবেক ডিজি ড.বীরেশ কুমার গোস্বামী। কিন্তু বর্তমান ডিজি পক্ষপাতিত্ব করে বিধি লঙ্ঘন করে ড. কামরুজ্জামানকে পুনরায় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখায় নিয়ে আসেন।

অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানের ডিজির প্রতিহিংসার অনল থেকে রেহাই পাননি বীরমুক্তিযোদ্ধার সন্তান উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের বিজ্ঞানী কে.এম. ইয়াদন নবী। তিনি কিডনী ট্রান্সপ্লান্টেড রোগী। অথচ তাকে অমানবিক আচরণ প্রকাশের মধ্য দিয়ে জামালপুরে বদলির আদেশ দেয়া হয়েছে। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, টানা ১৭ বছর দৈনিক মুজুরি ভিত্তিতে ড্রাইভার পদে কর্মরত থাকা ৩ জন ড্রাইভারকে বর্তমান ডিজি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে তুচ্ছ ঘটনায় বাদ দিয়েছেন। ফলে বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের অদক্ষ ড্রাইভার দিয়ে গাড়ি চালানোর কারণে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর ঢাকা যাবার পথে শ্রীপুর নয়ণপুরে এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয় একটি স্টাফ বাস। এতে অনেক কর্মকর্তা আহত হয় এবং গাড়িটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

ভুক্তভোগীরা আরো জানায়, ডিজি ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম কথায় কথায় কৃষিমন্ত্রী মহোদয়ের দোহাই দেন। সম্প্রতি বদলির আদেশেও তিনি মন্ত্রী মহোদয়ের নাম ব্যবহার করছেন।

বিনা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর এক আদেশে বিনার ৩৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলির আদেশ দেন  ডিজি। ফলে এ আদেশে ক্ষুব্ধ বিজ্ঞানী সমিতি চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি এক জরুরি সভায় বদলির আদেশে বেশ কিছু অসঙ্গতি উল্লেখ করে আদেশ পুনর্বিবেচনার জন্য ৮ দফা দাবি জানিয়ে রেজুলেশন পাশ করেন। ওই রেজুলেশনে তুচ্ছ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র-জুনিয়র বিজ্ঞানীদের সাথে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অশোভন আচরণসহ কারণ দর্শানোর বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। ফলে দেশের কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম গতিশীল রাখার স্বার্থে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি বলেও জানান বিজ্ঞানী সমিতির নেতারা।

বিনার বিজ্ঞানী সমিতি সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ হারুন অর রশিদ দাবি করেন, অসঙ্গতিপূর্ণ এ ধরনের বদলির আদেশে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দেশের কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম। আশা করছি বিজ্ঞানী সমিতির দাবিগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিবেশ বজায়ে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন কর্তৃপক্ষ।

ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, ২০১৯ সালের ৩ অক্টোবর বর্তমান ডিজি বিনার বিজ্ঞানী সমিতির নির্বাচনে সভাপতি পদে এবং তার সহধর্মীণি শামসুন্নাহার বেগম যুগ্ম সম্পাদক পদে নির্বাচন করেছিলেন। ওই নির্বাচনে তারা বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হন। মূলত ওই ক্ষোভের কারণেই এ বদলির আদেশ দেয়া হয়েছে।

তবে এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম। তিনি বলেন, ইনটেনশনালি কারো কারো অভিযোগ থাকতে পারে। তবে বদলির আদেশে কোন ক্ষোভ বা অনিয়ম নেই। এতে মন্ত্রী মহোদয়সহ সবাই খুশি।

ডিজি আরো বলেন, সারাদেশে বিনার মোট ১৩টি উপ-কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে এসব বদলি করা হয়। এতে ইনটেনশনালি মাত্র দুই তিনজন নাখোশ হতে পারে। তবে এ বদলির আদেশ স্বাভাবিক বদলি কার্যক্রম মাত্র।

ডিজি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অনেক পুরনো। এটা শেষ হয়ে গেছে। মূলত উদ্দেশ্যমূলকভাবে ওই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছিল।’

সংশ্লিষ্টরা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, লবিংযের জোরে ডিজি হতে পারলে প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম আর ক্ষমতার দাপট দেখানোর বিষয়টা স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। তাদের পেছনে অলৌকিক শক্তির হাত থাকে বলে এসব করার সাহস দেখান তারা। নিজেদের ইচ্ছামতো শাসন করতে থাকেন। দেশের কৃষি অবস্থা এমনিতেই অস্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রকদের অনিয়ম, দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারে পিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যাশিত ফলাফলও ব্যহত হচ্ছে।দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক পর্যায় নিয়ে আসার জন্য দেশের শীর্ষ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটকে(বিনা)স্বচ্ছভাবে কাজ করার জন্য উপযুক্ত লোকবল এবং পরিবেশ তৈরীর আহ্বান জানান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৮১৯

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ