বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তপ্ত অঙ্গনে আবারও সহিংসতার আগুন জ্বলে উঠেছে। বিজয়নগরে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষ, পুলিশের লাঠিচার্জ এবং নুরুল হক নুরের রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে গমন—সবকিছুই এক ভয়াবহ বার্তা বহন করছে। কে বা কারা এই সহিংসতা ঘটালো, কেন নুরুল হক নুরকে বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হলো, কিংবা উপদেষ্টাদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় ছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন জনমনে আলোড়ন তুলেছে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বিজয়নগরে প্রথম দফায় সংঘর্ষ বাঁধে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের কর্মীদের মধ্যে। সাংবাদিকরাও এই হামলার শিকার হন। পরিস্থিতি শান্ত না হতেই রাত সোয়া ৮টার দিকে ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। গণঅধিকার পরিষদের নেতারা জাপা কার্যালয়ের সামনে সমবেত হলে তাদের সঙ্গে জাপা নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে উপস্থিত হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মাত্র দশ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল স্থানত্যাগের জন্য। কিন্তু দলীয় নেতারা অবস্থান করলে শুরু হয় ব্যাপক লাঠিচার্জ। সেখানেই মারাত্মক আহত হন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর।
নুর ছাড়াও আহত হন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান, সদস্য হাসান তারেক, উত্তর শাখার সাধারণ সম্পাদক ফারজানা কিবরিয়া, মেহবুবা ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ জেলা সদস্য সচিব আনিসুর রহমান ও একজন পুলিশ কর্মকর্তা। রক্তাক্ত নেতাকর্মীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি—ইট-পাটকেল ছোড়া থেকে শুরু করে লাঠিপেটা, সবই ছিল পরিকল্পিত।
ঘটনার পরই পাল্টাপাল্টি অভিযোগে উত্তপ্ত হয় রাজনৈতিক অঙ্গন। গণঅধিকার পরিষদ বলছে, জাপা ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের সহযোগিতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি অভিযোগ করছে—গণঅধিকার পরিষদের হামলায় তাদের নেতাকর্মীরাও আহত হয়েছেন। জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী ও দলের প্রেস সেক্রেটারি খন্দকার দেলোয়ার জালালী দাবি করেছেন, তাদের কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও ফের হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সংঘর্ষের কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে জাপা কর্মীদের সরিয়ে দেন এবং গণঅধিকার পরিষদের নেতাদেরও এলাকা ছাড়তে বলেন। এত দ্রুত সেনা মোতায়েন হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—তাদের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল কি না?
সব মিলিয়ে প্রশ্নগুলোর তালিকা এখন দীর্ঘ হচ্ছে: কেন বারবার নুরুল হক নুরকে হামলার লক্ষ্য বানানো হয়? রাজনৈতিক পর্দার আড়ালে কোনো উপদেষ্টা বা প্রভাবশালী মহলের সমন্বয় আছে কি? সেনাবাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ কি শুধু নিরাপত্তা রক্ষার জন্য, নাকি এর পেছনে ছিল আরও বড় কোনো কৌশল?
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক অস্থির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিজয়নগরের এই সহিংসতা কেবল একটি ঘটনার বিবরণ নয়, বরং এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর অস্থিরতার ইঙ্গিত। সহিংসতার রাজনীতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা আরও ক্ষয় হবে। আর প্রশ্ন থেকে যাবে—ক্ষমতার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়ের জায়গাটা কোথায়?
আপনার মতামত জানানঃ