ঢাকার রাজনীতিতে সাম্প্রতিক উত্তেজনা যেন নতুন মোড় নিয়েছে। জাতীয় পার্টির কাকরাইল কার্যালয়ের সামনে টানা দুই দিন ধরে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। শুক্রবার রাতে শুরু হওয়া সহিংসতার রেশ কাটতে না কাটতেই শনিবার সন্ধ্যায় ফের একই স্থানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়। এতে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
শনিবার সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া এই হামলার দায় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চলছে দোষারোপ। জাতীয় পার্টি অভিযোগ করছে, গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরাই তাদের অফিসে হামলা চালিয়েছে। অপরদিকে গণঅধিকার পরিষদ বলছে, তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিল প্রেসক্লাব ও নয়া পল্টন ঘুরে শেষ হয়েছে, আর তারা কোনো হামলার সঙ্গে যুক্ত নয়। এই দ্বন্দ্বমুখর বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
এদিকে শুক্রবার রাতে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষের সময় গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর সেনা ও পুলিশের লাঠিপেটায় গুরুতর আহত হন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মাথায় আঘাতের কারণে তার শারীরিক অবস্থা এখনো শঙ্কামুক্ত নয়। সেনা ও পুলিশের হামলার অভিযোগে নুরকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর থেকে দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং ন্যায্য তদন্তের দাবি তুলেছে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আইএসপিআর জানায়, শুক্রবার রাতে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা জনতার সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতেই তাদের সদস্যরা হস্তক্ষেপ করেছে এবং জননিরাপত্তা রক্ষার্থে বলপ্রয়োগ করা হয়। কিন্তু গণঅধিকার পরিষদ এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে দাবি করছে, জাতীয় পার্টিকে রক্ষার জন্যই তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। হাইকোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস হাসপাতালে নুরের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন এবং প্রয়োজন হলে বিদেশে চিকিৎসার আশ্বাস দিয়েছেন। সরকার বলেছে, এ ঘটনায় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, এবং যে-ই জড়িত থাকুক না কেনো জবাবদিহির বাইরে কেউ থাকবে না।
এই ঘটনার পর ঢাকায় ও বিভিন্ন জেলায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলার খবর পাওয়া গেছে। ফলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে পড়ছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে নির্বাচনকে ব্যাহত করতে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থির করার চেষ্টা চলছে। জামায়াতও একই সুরে বলেছে, ঘটনাগুলো কাকতালীয় নয়; বরং একটি মহল পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, শুক্রবারের ঘটনায় উসকানি ছিল এবং এতে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে নির্বাচন সময়মতো হবে কি না তা নিয়ে। তবে তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতি নির্বাচন পেছানোর মতো নয়, বরং রাজনৈতিক সুবিধা নিতেই এ ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
গণঅধিকার পরিষদের দাবি, জাতীয় পার্টিকে আগামী নির্বাচনে বিরোধী শক্তি বানানোর জন্য গোয়েন্দা সংস্থা সক্রিয় হয়েছে। জাতীয় পার্টি আবার বলছে, তাদের দলের একাংশ নুরের সঙ্গে সখ্যতা রাখছে এবং সেখান থেকেই এই হামলার পেছনে উসকানি থাকতে পারে।
রাজনীতির মাঠে এই সহিংসতা এবং পারস্পরিক অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ সামনে এনেছে বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক চর্চা আদৌ কতটা সম্ভব? আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত নির্বাচন ঘিরে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষ এবং নুরের ওপর হামলার ঘটনাই মূল আলোচ্য।
এই মুহূর্তে দেশের মানুষ উদ্বেগ নিয়ে তাকিয়ে আছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও সরকারের আশ্বাসের দিকে। তবে ইতিহাস বলে, এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিভাজন দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য শুভ লক্ষণ নয়। যারা আহত হয়েছেন তাদের চিকিৎসা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সহিংসতার দায়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
আপনার মতামত জানানঃ