Trial Run

‘আগুন নেভালে মেরে ফেলা হবে’: সালথায় কয়েক হাজার মানুষের ধ্বংসযজ্ঞ 

ছবি: সংগৃহীত

গুজব ছড়িয়ে সালথার সোনাপুর ইউনিয়নে তাণ্ডব চালিয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। আগুন আর ভাঙচুরের প্রতিযোগিতায় হাজার হাজার মানুষ। গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত অব্দি সালথায় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন একজন। আহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন। ঘটনার আগে পুলিশের গুলিতে অনেকে মারা গেছে, এমন গুজব ছড়ানো হয়। আবার গুজব ছড়ানো হয়, মাদ্রাসার মুহতামিমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিন গুজব ছড়িয়ে হামলা চালানো হয় ফরিদপুরের সালথা থানা, উপজেলা কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন সরকারি কার্যালয় ও আবাসিক ভবনে। আগুন দেওয়া হয় কার্যালয় এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনারের (এসি ল্যান্ড, ভূমি) গাড়িতে। 

ঘটনার সূত্রপাত

সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে সালথার সোনাপুর ইউনিয়নের ফুকরা বাজারে করোনা মোকাবিলায় সরকারি বিধিনিষেধের কার্যকারিতা পরিদর্শনে যান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মারুফা সুলতানা খান। এ সময় তার গাড়ি থেকে কয়েকজন নেমে কয়েকজনকে লাঠিপেটা করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

ফুকরা বাজারের ব্যবসায়ী পিকুল শেখ বলেন, এসি ল্যান্ডের গাড়িটি সন্ধ্যায় বাজারে আসে। পরে ওই গাড়ি থেকে কয়েকজন নেমে বাজারের তিন-চারজনকে লাঠিপেটা করেন। এ ঘটনায় বাজারের লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে এসি ল্যান্ড দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

লাঠিপেটায় নটাখোলা গ্রামের মো. জাকির হোসেন মোল্লা (৪৫), নিজামউদ্দিন (৩৬) ও মঞ্জুর শেখসহ (৩৩) কয়েকজন আহত হন।

তবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মারুফা সুলতানা বলেন, তার গাড়ি থেকে কেউ নেমে কাউকে লাঠিপেটা করেনি। ওই বাজারে তিনি কিছু লোককে সংঘবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান। তাদের গতিবিধি ভালো মনে না হওয়ায় তিনি দ্রুত তারা লোকজন নিয়ে চলে যান এবং বিষয়টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিকুজ্জামানকে জানান।

মারুফা সুলতানা আরও বলেন, খবর পেয়ে সালথা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ বাজারে গেলে উত্তেজিত জনতা তাদের ওপর হামলা করে। এতে মিজানুর রহমানের মাথা ফেটে যায়। এরপর পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে সালথা থানা ঘেরাও এবং উপজেলার বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়, স্থাপনা ও বাসভবনে ভাঙচুর ও আগুন দেয় হামলাকারীরা।

সালথা থানার ওসি আশিকুজ্জামানও বলেন, এসি ল্যান্ডের কথা শুনে পুলিশের একটি দল ফুকরা বাজারে গেলে তাদের ওপর হামলা হয়।

কয়েক হাজার লোকের তাণ্ডব 

স্থানীয় লোকজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কয়েক হাজার লোক উপজেলা কমপ্লেক্স ও থানার সামনে জড়ো হয়। এ সময় তারা কমপ্লেক্স ও থানার ফটকে আগুন দেয়। রাত সাড়ে নয়টার দিকে উপজেলা কমপ্লেক্সের ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে যায়। 

একপর্যায়ে তারা ইউএনওর বাসভবন, উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের বাসভবন, উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনে হামলা চালায়। উপজেলা কমপ্লেক্সের নিচতলায় উপজেলা ত্রাণ কর্মকর্তার কার্যালয়, নির্বাচন কার্যালয়, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার অফিসে আগুন দেওয়া হয়। 

এ ছাড়া এ সময় ত্রাণসামগ্রীও লুট করা হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় ইউএনও ও এসি ল্যান্ডের দুটি গাড়ি ও বিভিন্ন আসবাব। এ ছাড়া তিনটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ ও পাঁচটি ভাঙচুর করা হয়। ভাঙচুর করা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালও।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র বলছে, ফায়ার সার্ভিসের কার্যালয় উপজেলা কমপ্লেক্সের সামনে হলেও তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারেনি। হামলাকারীদের প্রতিরোধের মুখে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বেরই হতে পারেননি।

সালথা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা আগুন নেভানোর উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু এর আগে দেড় থেকে দুই হাজার লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমাদের ঘেরাও করে। হামলাকারীরা আমাদের হুমকি দেয়, আগুন নেভালে মেরে ফেলা হবে।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র বলেছে, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ উপজেলা চত্বরে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা-ভাঙচুর চালায়। এর মধ্যেই থানা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন জুবায়ের হোসেন (২০)। নিহত জুবায়ের হোসেনের বাড়ি উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের রামকান্তপুর গ্রামে। তিনি একটি মাদ্রাসার ছাত্র বলে জানা গেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। পরে সালথা পুলিশের সঙ্গে যোগ দেন অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব ও আনসার সদস্যরা। তারা ৫৮৮টি শটগানের গুলি, ৩২টি কাঁদানে গ্যাসের শেল, ২২টি সাউন্ড গ্রেনেড এবং ৭৫টি রাইফেলের গুলি ছুড়ে রাত ১২টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সালথা উপজেলা কমপ্লেক্স, থানা এবং আশপাশের এলাকা ঘুরে তাণ্ডবের চিত্র দেখা যায়। উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনওর বাসভবনের অধিকাংশ কাচই ভাঙা। উপজেলা কমপ্লেক্স চত্বর আর থানা চত্বরে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ইটের টুকরো। উপজেলা কমপ্লেক্সে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালের সামনে আধা পোড়া কাঠ পড়ে আছে। পড়ে আছে অনেক ইটের টুকরো। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালের সামনেও একই পরিস্থিতি। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের সব কাচ ভেঙে গেছে।

গুজব রটিয়ে পরিকল্পিত হামলা

সালথা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ওয়াদুদ মাতুব্বর বলেন, ১৫ দিন ধরে হেফাজতে ইসলামের সমর্থকেরা সালথায় উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ফেসবুকে বিভিন্ন মিথ্যাচার প্রচার করে পরিকল্পিতভাবে এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। 

বাহিরদিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ (মুহতামিম) আকরাম আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, পুলিশের গুলিতে সাত-আটজন নিহত হয়েছে— এ জাতীয় নানা গুজব ছড়িয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে।

সালথার ইউএনও হাসিব সরকার বলেন, গুজব ছড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সোমবার বিকালে রামকান্তপুর এলাকায় লকডাউন বাস্তবায়ন করতে যাই। সেখানে মানুষের জটলা সৃষ্টি হলে আমি ফিরে আসি। 

সেখানে পুলিশের একটি দল পাঠানো হয়। পরে স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের বাগবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে পুলিশের এসআই মিজানুর রহমানের ওপর হামলা চালায় স্থানীয়রা। হামলায় মিজানুর রহমানের মাথা ফেটে যায়।

তিনি আরও বলেন, পুলিশ চলে আসার পর স্থানীয় একটি চক্র গুজব রটায় যে, পুলিশের গুলিতে স্থানীয় কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বাহিরদিয়া মাদ্রাসার দুই মওলানাকে গ্রেপ্তারের পর মারধর করা হচ্ছে। এর জেরে রাত ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ উপজেলা চত্বরে লাঠিসোটা নিয়ে ঢুকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ইউএনওর গাড়ি, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) গাড়ি ও তিনটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয় তারা।

ফরিদপুর জেলা প্রশাসক অতুল সরকার এবং পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামানও সোমবারের ঘটনাকে পরিকল্পিত বলে মন্তব্য করেছেন। জেলা প্রশাসক বলেন, অশুভ শক্তি সংঘবদ্ধ হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান বলেন, এই হামলার ঘটনায় ফুকরা বাজারের ঘটনার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

৪ হাজার জনকে আসামি করে পুলিশের মামলা

থানায় হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে গতকাল রাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে একটি মামলার করা হয়। ঘটনায় চার হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে সালথা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মিজানুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি করেন। 

এসআই মিজানুর ঘটনার রাতে ফুকরা বাজার এলাকায় জনতার হামলায় আহত হন। পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছেন সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশিকুজ্জামান।

সালথা থানার ওসি মো. আশিকুজ্জামান বলেন, থানায় হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি করে। মামলার এজাহারভুক্ত তিন আসামিকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে।

সালথার সহিংস ঘটনা নিয়ে আরও মামলা হবে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ে তাণ্ডব চালানোয় সেসব প্রতিষ্ঠান আগামী দু’এক দিনের মধ্যে মামলাগুলো করবে।

সালথার বর্তমান পরিস্থিতি শান্ত আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশ ও র‍্যাবের পাশাপাশি টহল দিচ্ছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা।

জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, ঘটনা তদন্তে ছয় সদস্যের দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর একটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসলিমা আলীকে। অপর কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আসলাম মোল্লাকে। আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে এ দুই কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

এসডব্লিউ/এমএন/এসএস/১৭৪৩ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগীতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগীতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগীতার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 47
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    47
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ