Trial Run

কারা কর্তৃপক্ষকে বোকা বানিয়ে আসামির চম্পট

পুলিশ কিংবা আদালতের ভুলে অনেক নিরাপরাধীর কারাভোগের মত ঘটনা প্রায়ই ঘটে। ঘটে কারাগার থেকে আসামি পালিয়ে যাবার মত ঘটনাও। আবার নামের মিল কিংবা পিতার নামে কিঞ্চিৎ মিল থাকার কারণেও অনেকে বিনাপরাধে কারাভোগ করার ঘটনাও ঘটে থাকে। এবার নামের মিল থাকায় কারা কর্তৃপক্ষকে বোকা বানিয়ে কারাগার থেকে সবার সামনে দিয়ে বুক সটান করে আসামি চলে গেছে। ঘটনাটি ঘটে শরীয়তপুর কারাগারে। নিজের নামের সাথে মুক্তি পাওয়া আরেকজনের নামের কিছুটা মিল থাকায় চালাকি করে আসামি নিজে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে যায় কারাগার থেকে।

পালিয়ে যাওয়া আসামির নাম লিটন ফরাজী, আর মুক্ত হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কথা আসামি লিটন সিকদারের। লিটন সিকদার সেজে কারাগার থেকে জামিনের কাগজপত্র দেখিয়ে বেরিয়ে গেছেন লিটন ফরাজী। এখন এই আসামিকে ঢাকা, শরীয়তপুর ও বরিশালে হন্যে হয়ে খুঁজছেন কারা কর্মকর্তারা। ঘটনাটি শরীয়তপুর কারাগারের। ঘটেছে গত রোববার (৪ এপ্রিল) সন্ধ্যায় শরীয়তপুর কারাগারে। আজ মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত আসামিকে খুঁজে পায়নি কারাগার কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে এই ঘটনায় গতকাল সোমবার (৫ এপ্রিল) থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে শরীয়তপুর জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষ। তবে শরীয়তপুরের জেল সুপার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে গতকাল সোমবার কারা মহাপরিদর্শককে জানিয়েছেন।

শরীয়তপুর কারাগার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, লিটন ফরাজীর বাড়ি বরিশালের উজিরপুর। ঢাকার বাসা বাসাবোতে। তার নামে ৩ টি মামলা রয়েছে। আর লিটন সিকদারের বাড়ি শরীয়তপুরে। শরীয়তপুর কারাগারের জেল সুপার গোলাম হোসেন সোমবার (৫ এপ্রিল) কারা মহাপরিদর্শককে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে বিষয়টিকে জামিনে ভুল মুক্তি বলে উল্লেখ করা হয়।

এই বিষয়ে চিঠিতে জানানো হয়, লিটন সিকদারের (বাবা আনোয়ার হোসেন সিকদার) পরিবর্তে হাজতি লিটন ফরাজী (বাবা আবদুর রব ফরাজী) শরীয়তপুর কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় জেলার ও ডেপুটি জেলারের বিরুদ্ধে কারা বিধিমোতাবেক লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

শরীয়তপুর কারাগারের জেলার (ভারপ্রাপ্ত) আমিরুল ইসলামের পালং মডেল থানায় করা জিডির আবেদনে বলা হয়েছে, ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় তিনি দুজন আসামিকে বিধিমোতাবেক মুক্তি দেন। কিন্তু দাপ্তরিক অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে লিটন সিকদার সেজে প্রতারণা করে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন লিটন ফরাজী।

এদিকে কারা কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্ত করার জন্য বরিশাল বিভাগের ডিআইজি (প্রিজন) টিপু সুলতানকে প্রধান করে তিন সদস্যর একটি কমিটি গঠন করেছে। আজ মঙ্গলবার তাঁরা শরীয়তপুর জেলা কারাগার পরিদর্শন করে ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছেন।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কারাগারের সুপার গোলাম হোসেন জাতীয় এক দৈনিককে বলেন, অসতর্কতার কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। জামিনের কাগজ আসার পরে তা যাচাইবাছাই করে হাজতিদের মুক্তি দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় জেলার, ডেপুটি জেলার ও একজন কারারক্ষী যুক্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে একজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। আর দুজন কর্মকর্তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। তাদের ব্যাখ্যা পেলে তা ঊর্ধ্বতন কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। তারাই পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।

জেলা কারাগার সূত্র জানায়, গোসাইরহাট থানার একটি চুরির মামলার আসামি লিটন ফরাজী ও লিটন সিকদার। তারা দুজন রাজবাড়ী ও খুলনার দুটি মামলারও আসামি। লিটন ফরাজী বরিশালের উজিরপুর উপজেলার দামুরকাঠি গ্রামের আবদুর রব ফরাজীর ছেলে। আর লিটন সিকদার খুলনার খালিশপুরের আনোয়ার সিকদারের ছেলে। গত ১১ মার্চ তাঁদের শরীয়তপুর জেলা কারাগারে আনা হয়।

গত রোববার শরীয়তপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে গোসাইরহাট থানার ওই মামলায় তাদের জামিন দেওয়া হয়। আর খুলনা ও রাজবাড়ীর মামলায় লিটন সিকদার জামিনে থাকলেও লিটন ফরাজী জামিনে ছিলেন না। রোববার আদালত থেকে চুরির মামলায় জামিনের কাগজ কারাগারে পৌঁছালে কারা কর্তৃপক্ষ লিটন সিকদারকে না ছেড়ে লিটন ফরাজিকে সন্ধ্যায় মুক্তি দেয়। আর লিটন সিকদারকে আটক রাখে।

লিটন সিকদারের স্বজনেরা বিষয়টি নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। তখন তাদের নজরে আসে নামের ভুলে লিটন ফরাজী কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। পরে সোমবার রাতে লিটন সিকদারকে জেলা কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

এমন তথ্য গোপন করে কেবল কারাগার থেকেই নয়, উচ্চ ও নিম্ন আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে আসামিরা। জালিয়াতি বন্ধে সুপ্রিমকোর্ট থেকে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা দেওয়াসহ একাধিক মামলা হয়েছে। কিন্তু এরপরও থামছে না জামিন জালিয়াতি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত কয়েক মাসে অন্তত পাঁচটি জামিন জালিয়াতির ঘটনা হাইকোর্টে ধরা পড়েছে। শুধু হত্যা মামলায় নয়, জাল নথি সৃজনের পাশাপাশি তথ্য গোপন ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অস্ত্র, ধর্ষণ ও মাদক মামলাসহ বিভিন্ন গুরুতর মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন নেওয়া হচ্ছে। জামিন নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুয়া এফআইআর, চার্জশিট, জব্দ তালিকা দাখিল করা হচ্ছে।

অভিযোগের গুরুত্ব কমিয়ে তৈরি করা কাগজপত্র দেখিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করে পক্ষে নেওয়া হচ্ছে আদেশ। ফৌজদারি বিবিধ শাখায় এসব ঘটনা বেশি ঘটছে। এসব জালিয়াতিতে একাধিক চক্র জড়িত। জামিন আদেশের কপি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এর আগে ফৌজদারি মিস শাখার জমাদার মঞ্জু রানী কৈরীকে বরখাস্ত করে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। এরপর কিছুদিন জামিন জালিয়াতির ঘটনা থেমে ছিল। সম্প্রতি আবারও বেশ কয়েকটি জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে।

সূত্র জানায়, হাইকোর্টের নির্দেশে নথি ও জামিন জালিয়াতির ঘটনায় এ পর্যন্ত প্রায় ৬০টির মতো মামলা করেছে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। এর মধ্যে ফৌজদারি বিবিধ শাখা থেকে ৩৯টি, রিট শাখা থেকে নয়টি, ফৌজদারি আপিল শাখা থেকে দুটি এবং অন্যান্য শাখা থেকে ১০টি মামলা করা হয়। এসব মামলা তদন্ত ও বিচারাধীন রয়েছে।

এছাড়া গত বছরের নভেম্বরে প্রতারণার মাধ্যমে হাইকোর্ট থেকে জামিন নেওয়ার ঘটনায় সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী, গোপালগঞ্জ আদালতের চার কর্মকর্তাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। শাহবাগ থানায় মামলা দুটি হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে মামলাগুলো ঝুলে আছে বিচারিক আদালতে, নিষ্পত্তি খুবই কম।

জানতে চাইলে হাইকোর্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা জাতীয় এক দৈনিককে বলেন, জামিন জালিয়াতি রোধে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত আছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘জামিন জালিয়াতির ঘটনায় সুপ্রিমকোর্টের পক্ষ থেকে যেসব মামলা হয়েছে সেগুলোর তদন্ত চলছে। জালিয়াতিতে কারা জড়িত তা পুলিশের তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নামের মিল থাকায় একদিকে নিরাপরাধীর শাস্তি হচ্ছে অন্যদিকে প্রতারণা করে আসামি পালিয়ে যাচ্ছে। দুটোই কর্তৃপক্ষের ভুলে। এসবই জানিয়ে দেয় আমাদের আইন আদালত কতটা সতর্ক ও দায়িত্বশীল।

তারা বলেন, সুপ্রিমকোর্টে একের পর এক জামিন জালিয়াতির খবর শুনছি। বিশেষ করে মাদক ও অস্ত্র মামলার ক্ষেত্রে এসব জালিয়াতি হয়। জামিন জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে পরে আর নেওয়া হয় না। এভাবেই অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

এসডব্লিউ/পিএ/কেএইচ/১৭২১ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগীতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগীতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগীতার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ