Trial Run

পাকিস্তানের সাথে গণহত্যার পক্ষে বাংলাদেশ!

আজ গণহত্যা দিবস

ছবি: সংগৃহীত

আজ ভয়াল ২৫ মার্চ, জাতীয় গণহত্যা দিবস। মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত হত্যাযজ্ঞের দিন। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঠাণ্ডা মাথায় নিরস্ত্র, নিরপরাধ ও ঘুমন্ত সাধারণ বাঙালির ওপর যেভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যার নজির। বাংলাদেশ ২৫ মার্চ কালো রাতে ভয়াবহ গণহত্যার শিকার হলেও আশ্চর্যজনকভাবে তার অবস্থান গণহত্যার পক্ষেই।  শ্রীলঙ্কায় তামিলদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধকালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার ইস্যুতে জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশ ভোট দিয়েছে।এনিয়ে চলছে সংশ্লিষ্ট মহলে সমালোচনা।

শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে একটি রেজুলেশন উত্থাপন করা হয়েছে। গত ২৩ মার্চ মঙ্গলবার জাতিসংঘে রেজুলেশনটি উত্থাপন করে ভোটাভুটি হয়। কাউন্সিলের ৪৭ সদস্য এর পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দেয়। রেজুলেশটির পক্ষে ভোট পড়ে ২২টি, আর বিপক্ষে ভোট পড়েছে ১১টি। ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে ১৪টি দেশ।

মূলত যুক্তরাজ্য, জার্মানি, কানাডাসহ ইউরোপের আরও ৭টি দেশ শ্রীলংকার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে রেজুলেশনটি জাতিসংঘে উপস্থাপন করে।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য দেশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া রেজুলেশনটির পক্ষে ভোট দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের তিনটি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান শ্রীলঙ্কার পক্ষে তথা রেজুলেশনের বিপক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে দুই সদস্য রাষ্ট্র ভারত ও নেপাল।

গতকাল বুধবার (২৪ মার্চ) মুঠোফোনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ বরাবরই প্রতিবেশী দেশগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। শ্রীলঙ্কার পক্ষে মানবাধিকার কাউন্সিলে সমর্থন দেওয়া তারই বহিঃপ্রকাশ।

অনলাইন দ্য ডিপ্লোম্যাটে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেন দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ডিপ্লোম্যাট রিস্ক ইন্টেলিজেন্সের গবেষণা বিষয়ক পরিচালক অভিজনান রেজ। তিনি লিখেছেন, এই প্রস্তাবে শ্রীলঙ্কায় তামিল সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের বিষয়ে কথা বলা হয়েছে। এতে শ্রীলঙ্কা সরকারকে গৃহযদ্ধের সময় ভয়াবহভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের আইন মারাত্মক আকারে লঙ্ঘনসহ সব যুদ্ধাপরাধের দ্রুত, পূর্ণাঙ্গ এবং পক্ষপাতিত্বহীন তদন্ত নিশ্চিত করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এ সংক্রান্ত সব অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

স্বতন্ত্র তামিল রাষ্ট্রের দাবিতে পরিচালিত গৃহযুদ্ধ প্রায় আড়াই যুগ স্থায়ী হয় এবং তাতে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ লোকের মৃত্যু হয় বলে জাতিসংঘের অনুমান। ২০০৯ সালে তামিল বিদ্রোহের অবসান ঘটার পর জাতিসংঘ উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনে। তবে শ্রীলঙ্কার সরকার তখন দাবি করেছিল যে তামিল যোদ্ধারা বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তখন চরম নিষ্ঠুরতার অভিযোগ ওঠে। সদ্য ঢাকা সফর করে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে তখন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং তার ভাই গোতাবায়া রাজাপক্ষে ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

গোতাবায়া ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে আসীন রয়েছেন। তার পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা গৃহযুদ্ধকালীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্ত ও জবাবদিহির বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার যে অঙ্গীকার করেছিলেন, গোতাবায়া সরকার সেগুলো বাস্তবায়ন থেকে পিছিয়ে যাওয়ায় এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। তামিল বিদ্রোহ দমনের ওই অভিযানে গোতাবায়া সরাসরি নেতৃত্ব দেন। তিনি এর আগে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীতে ছিলেন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে অবসর নিয়ে রাজনীতিতে যোগ দেন।

বিশ্লেষকরা বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শ্রীলঙ্কা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে সমর্থন না দিলে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এভাবে হানা দেওয়া সম্ভব হতো না এবং বাঙালিদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ এতটা ব্যাপকতা পেত না। ভারতের ওপর দিয়ে বিমান পরিচালনার অনুমতি না থাকায় তখন পাকিস্তান কলম্বোয় জ্বালানি নেওয়ার বিরতি নিয়ে ভারত সাগরের ওপরের করিডর দিয়ে ঢাকায় সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র পাঠায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কলামিস্ট আসিফ নজরুল তার ফেসবুক আইডি থেকে তিনি জানিয়েছেন, শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধকালের শেষদিকে তামিলদের বিরুদ্ধে নারকীয় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। সাউথ এশিয়ান ফর হিউম্যান রাইটস-এর নির্বাহী সদস্য থাকার সময় আমি বহুবার শ্রীলঙ্কা গেছি। বহু স্থানীয় মানুষের কাছে এসব অপরাধের হৃদয়বিদারক বিবরণ শুনেছি।

কাল এসব অপরাধের জন্য বিচারের প্রশ্ন উঠেছিল জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে। আমি আশ্চর্য হয়েছি দেখে যে বিচারের প্রস্তাবের বিপক্ষে অন্য কিছু দেশের সাথে সাথে বাংলাদেশও ভোট দিয়েছে।

তিনি বলেন, নিজ দেশে ১৯৭১ সালে গণহত্যার ভয়াবহ ইতিহাস আছে আমাদের, এই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাই আমরা, এরজন্য পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিচার চাই। আর আমরা নিজেরা কিনা ভোট দেই শ্রীলঙ্কায় গণহত্যার বিচারের প্রস্তাবের বিপক্ষে!

তিনি আরও বলেন, আমি বুঝি আঞ্চলিক রাজনীতি বলে একটা বিষয় আছে। কিন্তু নৈতিকতা বলেও তো একটা বিষয় আছে। বাংলাদেশ এটলিস্ট ভোটদানে বিরত থাকতে পারতো এক্ষেত্রে। তা না করে বাংলাদেশ কেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে সহায়তাকরী শ্রীলঙ্কার জন্য এমন অনৈতিক ও স্ববিরোধী অবস্থান নিলো?

এদিকে আজ ভয়াল ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কালরাত’ স্মরণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—আজ ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগের যৌথ উদ্যোগে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে সংযুক্ত থাকবেন (ভার্চুয়ালি) দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি। এছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনসমূহ সারা দেশে অনুরূপ কর্মসূচি গ্রহণ করবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আজ বাদ জোহর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে কালরাতে শাহাদতবরণকারী শহিদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দেশের সব মসজিদে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আহ্বান জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ যেখানে গণহত্যার মত ভয়াবহ মানবধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে, সেখানে শ্রীলঙ্কার গণহত্যা ইস্যুতে দেশটির পক্ষে ভোট দিয়ে বাংলাদেশ এটাই জানিয়ে দিলো যে, দেশটি গণহত্যার পক্ষে রয়েছে। অথচ এই গণহত্যাকে সামনে রেখেই জাতীয় গণহত্যা দিবস উপলক্ষে দেশব্যাপী শোক প্রকাশের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশ আসলে গণহত্যার পক্ষে আছে নাকি বিপক্ষে আছে এতে তার কথা ও কার্যকলাপে এখনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৪৪৬ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগীতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগীতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগীতার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 37
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    37
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ