Trial Run

তিস্তা নিয়ে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ, পানিবণ্টনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিল ভারত

গতকাল ৪ ফেব্রুয়ারী সকাল ১০টার দিকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ ফ্লাইটে দিল্লি থেকে ঢাকায় পৌঁছান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করার পাশাপাশি গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে আলোচনা করতেই এস জয়শংকরের এই ঢাকা সফর।

প্রসঙ্গত, মুজিব জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আগামী ২৬শে মার্চ দু’দিনের সফরে ঢাকায় আসার কর্মসূচি রয়েছে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারত সরকার আগের অবস্থানেই আছে। এছাড়া সীমান্তে হত্যা বন্ধের পাশাপাশি স্পর্শকাতর ওই এলাকায় যেকোনো মূল্যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

এদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন জানান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরের সঙ্গে নিরাপত্তা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্য, পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়নসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এস জয়শংকর।

এ সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে তার দেশ বাংলাদেশের পাশে থাকবে। বাংলাদেশ সারা বিশ্বে আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। এ দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিব বর্ষ আমাদের দেশের জন্যও অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। আমাদের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আমরা শুধু আলোচনার মাধ্যমেই যেকোনো সংকটের সমাধান করতে পারি।

ড. এস জয়শংকর বলেছেন, করোনাকালে দেশের বাইরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম ও স্মরণীয় সফর হবে ঢাকা। ২৬-২৭ মার্চের প্রস্তাবিত ওই সফর প্রস্তুতিতে ঢাকা ও দিল্লির প্রতিনিধিরা কাজ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এ সফর খুবই স্মরণীয় হবে, কারণ এটি করোনা মহামারীর পর ভারতের বাইরে তার প্রথম এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশে দ্বিতীয় সফর।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের তাৎপর্য আমাদের ‘আগে প্রতিবেশী’ এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির জন্য ক্রমবর্ধমান প্রাসঙ্গিকতার মধ্যে নিহিত রয়েছে। আমরা বাংলাদেশকে কেবল দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, বিস্তৃত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও মূল প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করি। আমাদের সম্পর্কের প্রতিটি অর্জন গোটা অঞ্চলকে প্রভাবিত করে। সবাই জানেন, আমরা অন্যদের কাছে এ সম্পর্ককে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরি।

তিস্তার পানিবন্টনে অনাগ্রহ ভারতের

বাংলাদেশকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করলেও ভারতের কাজেকর্মে বন্ধুত্বের পরিচয় সচারচর মেলে না। ভারত ও বাংলাদেশ ছয়টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু তিস্তা নদীর পানিবণ্টন সমস্যা সমাধানে কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা গেছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আলোচনা করেছি। আমাদের পানি সম্পদ সচিবরা শিগগিরই বৈঠকে বসবেন। আমি নিশ্চিত তারা এটা আলোচনা করবেন। আমি জানি আপনারা সবাই এ বিষয়ে ভারত সরকারের অবস্থান জানেন এবং সেটার কোনো পরিবর্তন হয়নি।’

প্রসঙ্গত, তিস্তার পানি নিয়ে ভারতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সম্মতি না পাওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিতে উপনীত হতে পারছেনা গত কয়েক বছর ধরেই।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনীহা

কলকাতার বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এ বি পি আনন্দকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  জানান, তিস্তা নিয়ে আমার রাজ্যের স্বার্থে যা করার, আমি তাই করব। 

ওরা আমাদের না জানিয়ে নিজেদের ইচ্ছে মতো সব করে, একবার জানাবার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করে না। হয়তো সব কিছু সেরেও নিয়েছে। সব কিছু সেরে নিয়ে যদি আমাকে বলো স্ট্যাম্প মারার জন্য, আমি বলব সরি। 

তিনি আরও বলেছিলেন যে বাংলাদেশকে তিনি খুবই ভালবাসেন, যতটা সম্ভব সাহায্য বাংলাদেশকে তিনি করবেন নিজের রাজ্যকে বাঁচিয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ইন্সটিটিউট অফ ফরেন পলিসি স্টাডিজের ভিজিটিং প্রফেসর ও কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক জয়ন্ত রায় জানান, গঙ্গার পানিবন্টন চুক্তি হওয়ার সময়ে আমাদের হাতে প্রচুর তথ্য পরিসংখ্যান ছিল। কিন্তু তিস্তার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। খুবই কম তথ্য রয়েছে তিস্তার পানিপ্রবাহ নিয়ে। কিন্তু আমরা দেখতে পাই যে তিস্তার পানিপ্রবাহ অত্যন্ত ক্ষীণ। এই অবস্থায় পানিবণ্টন হলেও কারও যে লাভ হবে, তা মনে হয় না। শতকরা ৫০ ভাগ পানিও যদি আমরা দিয়ে দিই, তাতে যে বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান হবে, তা মনে হয় না। যেটা করা উচিত, তা হল দুই দেশের প্রতিনিধি, নদী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পর্যালোচনা করা। তাতেই সমস্যা মিটতে পারে।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী বলেন, তিস্তা সমস্যা সমাধানে ভারত সরকারের উচিত হবে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সিকিমকেও এই আলোচনায় যুক্ত করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, তিস্তা নদী সিকিম পাহাড় থেকে নেমে এসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে যায়। এটাই হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল যে তিস্তার পানিবণ্টনে পশ্চিমবঙ্গ আর সিকিমকে যুক্ত করা। যদি আগাম আলোচনা হয়, তাহলে সমস্যা মিটতে দেরী হওয়ার কথা নয়। এটাই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী দাবি করছেন। একটা কথা তো ঠিক, এ রাজ্যে যে সরকারই থাকুক, এখানকার কৃষকদের স্বার্থ তো তারা দেখবেই।

বিবিসি-র প্রাক্তন সহকর্মী ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ সুবীর ভৌমিক বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তাসহ বেশ কিছু ইস্যুতে যে ভূমিকা রাখছেন, তাতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সার্বিক উন্নতি স্বত্বেও দুই বাংলার বোঝাপড়ায় একটা ক্ষত থেকে যাচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতাটা রাজনৈতিক কারণে। এটা কি দিল্লিকে চাপে রাখার জন্য না কি বাংলাদেশে, বলা মুশকিল। তার কোনও সমীকরণ আছে যে কারণে উনি চান না শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ লাভবান হোক- এগুলো উনিই জানেন, আমি জানি না। কিন্তু এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না কারও যে তার এই ভূমিকাটা দুই বাংলার সম্পর্কের জন্য ভাল হচ্ছে না।

মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইন্সটিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজের পরিচালক ড. শ্রীরাধা দত্ত বলেন, দিল্লি বা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, সবার সঙ্গেই আওয়ামী লীগ খুব ভাল সম্পর্ক রাখতে পারে, কারণ ওদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা আমাদের সঙ্গে মিলে যায়। আমি নিশ্চিত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও সেটা জানেন এবং কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার আগে নিশ্চয়ই তিনি এটা মাথায় রাখেন। সমস্যাটা হচ্ছে রাজ্য আর কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে যে মনোমালিন্য চলছে, তার জন্যই মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টাকে অন্য চোখে দেখছেন।

অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা পশ্চিমবঙ্গের কাছে খুব জরুরী। এটা ঠিকই যে তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি হলে শেখ হাসিনার সরকারের রাজনৈতিকভাবে সুবিধা হবে। কিন্তু যদি শেখ হাসিনার সরকার না থাকে, যদি অন্য কেউ আসে, বিশেষত যাদের পেছনে জামায়াতের মতো একটা শক্তি থাকবে, তাতে মারাত্মক অবস্থা হবে পশ্চিমবঙ্গের। সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠী যদি ওখানে আক্রান্ত হয়, তারা এরাজ্যে এসে আশ্রয় নেবে। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিকভাবে ঠিক হবে না বিষয়টার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ানো। তবে মমতা ব্যানার্জীর কিছু রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাও রয়েছে, সেটাও আমাদের বুঝতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এরাজ্যে যে ২৭% মুসলমান ভোট, তার একটা বিরাট অংশ কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট ব্যাঙ্ক। আবার এটাও ঠিক যে এই ভোট ব্যাঙ্কের একটা বড় অংশ বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাকে পছন্দ করে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাই খুব ব্যালেন্স করে এমনভাবে চলতে হয় যাতে ওই মুসলমান ভোট ব্যাঙ্ক কোনোভাবেই চটে না যায়।

বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা বিপন্ন 

তিস্তা অববাহিকার ৫ হাজার ৪২৭টি গ্রামের মানুষ তাদের জীবিকার জন্য এই নদীর ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। তাই তিস্তার পানির প্রবাহ কমে যাওয়া আমাদের জীবন ও জীবিকায় আঘাতস্বরূপ। তিস্তা অববাহিকার ৮ হাজার ৫১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। আর সমতল ভূমিতে তিস্তা অববাহিকার পরিমাণ ৪ হাজার ১০৮ বর্গ কিলোমিটার, যার প্রায় অর্ধেক অংশ পড়েছে বাংলাদেশের সীমানায়। 

দুই দেশই তিস্তার পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সময়ে নদীর ওপর ও আশপাশে ব্যাপক অবকাঠামো তৈরি করেছে। ভারত এই মুহূর্তে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচ কার্যক্রমের জন্য তিস্তার পানি ব্যবহার করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ তিস্তার পানি ব্যবহার করছে শুধু পরিকল্পিত সেচ দেওয়ার কাজে।

যদিও গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভারতের একচেটিয়া পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশ অংশে তিস্তার পানি ক্রমাগত কমে গেছে। এর দরুন তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১২টি উপজেলা যথা- ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, নীলফামারী সদর, সৈয়দপুর, রংপুর সদর, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ, গঙ্গাচরা, পার্বতীপুর, চিরিরবন্দর ও খানসামা, যারা তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি জমিতে সেচসুবিধা পেয়ে থাকে, তাদের কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ভারত তার ৬৮ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমির সেচের চাহিদা মিটিয়ে যে পরিমাণ পানি ছাড়ে, তা দিয়ে বোরো মৌসুমে আমাদের সেচ চাহিদার অর্ধেকও পূরণ করা যায় না। 

১৯৯৭ সালে বাংলদেশে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কিউসেক, যা ২০০৬ সালে নেমে আসে ১ হাজার ৩৪৮ কিউসেকে এবং ২০১৪ সালে পানির প্রবাহ এসে দাঁড়ায় মাত্র ৭০০ কিউসেক, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এসডব্লিউ/এসএস/২০১৭ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 45
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    45
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ