Trial Run

মুক্তিযোদ্ধা ভাতায় অনিয়ম, স্বেচ্ছায় ফেরত দিচ্ছেন অভিযুক্তরা

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ভাতা পাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) নামে সফটওয়্যারে যুক্ত করার পর নানা অনিয়ম বেরিয়ে আসছে। এরপর কেউ কেউ নিজেরাই অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া ভাতা ফেরত দিচ্ছেন।

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তালিকা এমআইএস সফটওয়্যারে তোলার আগে দেশে ভাতাপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯২ হাজার জন। বছরের পর বছর ধরে জেলা প্রশাসনের তালিকার ভিত্তিতেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা পাঠানো হতো। কিন্তু এমআইএসের মাধ্যমে তথ্যভান্ডার তৈরির পর গত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের ভাতা পাঠাতে গিয়ে দেখা যায়, সংখ্যাটি হঠাৎ ২১ হাজার কমে গেছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এমআইএসে নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল। এরপর আরও এক মাস কেটেছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত রোববার পর্যন্ত আগের ভাতাপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ১৫ হাজার জনের নাম এমআইএসে আসেনি। সন্দেহ করা হচ্ছে, এদের অনেকে দুই জায়গা থেকে অথবা অনিয়মের মাধ্যমে ভাতা নিতেন। ভাতা নেওয়ার জন্য যারা এসব অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের নিয়ে সাধারণ বীর মুক্তিযোদ্ধারা লজ্জিত।

অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া ভাতা ফেরত দেওয়া ব্যক্তিদের একজন সিরাজগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা আমজাদ হোসেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে দুই উপজেলা থেকে (সিরাজগঞ্জের কাজীপুর ও বগুড়ার ধুনট) ভাতা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। চিঠিতে তিনি ধুনট থেকে পাওয়া ভাতা বাতিলের অনুরোধ জানিয়েছেন। পাশাপাশি ধুনট থেকে নেওয়া ভাতা ফেরত দেবেন বলে উল্লেখ করেছেন।

এদিকে গত রোববার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কাজীপুর ও ধুনটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) চিঠি দিয়ে আমজাদ হোসেনের ভাতা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আমজাদ হোসেন এখনো অবৈধভাবে নেওয়া ভাতা ফেরত দেননি। তিনি ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছেন। চিঠিতে তার আত্মসাৎ করা টাকার হিসাব তৈরি করতে বলা হয়েছে।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমানের স্ত্রী ছালেহা খাতুনের মৃত্যুর পর তার নামে ভুয়া হিসাব খুলে মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতার প্রায় ৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক দুই নেতা মো. এনামুল হক বিশ্বাস ও মোহাম্মদ আলী। বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর এই দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজেরাই ভাতার টাকা ফেরত দিয়েছেন।

যারা অনিময় করে ভাতা নিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে ‘সরকারি পাওনা আদায় আইন–১৯১৩’ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের তালিকায় বিভিন্ন সময় আট হাজার জনকে পাওয়া গেছে, যারা বীর মুক্তিযোদ্ধা নন।

দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা এখন মাসে ১২ হাজার টাকা করে ভাতা পান। এ ছাড়া দুই ঈদে ১০ হাজার টাকা করে ২০ হাজার টাকা, বিজয় দিবসে ৫ হাজার টাকা ও নববর্ষে ২ হাজার টাকা ভাতা পান। সব মিলিয়ে বছরে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা।

দেশে বর্তমানে তালিকাভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৩৩ হাজার। কেউ কেউ আইনি জটিলতার কারণে ভাতা পান না। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার এ পর্যন্ত আট হাজার মুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল করেছে। সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তার নাম বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি বরিশালে ৬ হাজার ৪৫৬ জন মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী ভাতার প্রায় চার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাবদ এই টাকা ছাড় করেছে তারা। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন, তাদের হাতে এই টাকা এখনও পৌঁছায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত জেলা প্রশাসক, বরিশালের কার্যালয় থেকেই এই গরমিল শুরু। কিন্তু জেলা প্রশাসন বলছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মন্ত্রণালয় থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বাবদ প্রায় চার কোটি টাকা কম দেয়া হয়েছে। এদিকে এ ঘটনার পর ইতোমধ্যে বরিশালে চারজন জেলা প্রশাসক বদলি হয়েছেন। কিন্তু আজও এ সমস্যার সমাধান হয়নি। ভাতাও বুঝে পাননি মুক্তিযোদ্ধারা।

এসডব্লিউ/পিএ/কেএইচ/১৯৪৭ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ