Trial Run

কাশ্মীরও এক ফিলিস্তিন: ‘ভারতের সাথে সুসম্পর্ক কাশ্মীরিদের সাথে প্রতারণা’

ছবি: সংগৃহীত

কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান বিবাদ আজকের নয়। এই দুই দেশ বিভিন্ন সময়ে নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের জোর চেষ্টা চালালেও কাশ্মীর প্রশ্নে থেমে গেছে সব প্রচেষ্টাই। নতুন করে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠার মাঝেই আবার কাশ্মীর নিয়ে নতুন হাওয়ায় বদলে যাচ্ছে সমীকরণ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট ভোলকান বোজকির মন্তব্যের পর পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের স্পষ্ট ভাষায় সম্পর্কের পুনর্নির্মাণে অনীহা, পরিস্থিতিকে আরও কি জটিল করে তুললো? 

এদিকে এই দুই দেশের টানাপোড়েনে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ এক দুর্বিষহ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। চাকরি নেই, নিরাপত্তা নেই, খাদ্য নেই, আশ্রয় নেই, আধুনিক সুযোগ সুবিধা নেই। নিজ দেশে তারা উদ্বাস্তু হয়ে বাস করছে।       

তবুও দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীরের পুরোটাই নিজেদের দাবি করে আসছে ভারত ও পাকিস্তান। একসময় রাজার শাসন ছিল পৃথিবীর ভূস্বর্গখ্যাত জম্মু–কাশ্মীরে। ১৯৪৭ সালের ভারত উপমহাদেশ ভাগের পর এটি ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। অঞ্চলটি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একাধিকবার যুদ্ধ হয়েছে। পরে যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে অঞ্চলটি দুই ভাগে ভাগে করে নেয় দুটি দেশ। তবে ভারতের অংশে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা।

এরপর, ২০১৯ সালের আগস্টে ভারত জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে। ফলে কাশ্মীর এতদিন যে বিশেষ অধিকার পেত, তা এর মাধ্যমে খারিজ হয়ে যায়। একই সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যটিকে ভেঙে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়। এর একটি হলো লাদাখ, অন্যটি জম্মু-কাশ্মীর।

ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক নয়

এ মুহূর্তে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা মানেই হচ্ছে কাশ্মীরের জনগণের সঙ্গে বেইমানি করা, বলে মন্তব্য করলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। খবর আলজাজিরার। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের সঙ্গে টেলিফোন সেশনে আলাপকালে রোববার এ মন্তব্য করেন ইমরান খান। 

তিনি আরও বলেন, আগে কাশ্মীর সমস্যার সঠিক সমাধান, পরে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন। এছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের পক্ষে দুদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া ঠিক হবে না। পাকিস্তান এমন উদ্যোগ নিলে তা কাশ্মীর অঞ্চলে নিহত লক্ষাধিক মানুষের সঙ্গে প্রতারণা হবে।

অঞ্চলটিতে যারা এখনও নিজেদের স্বাধীনতার জন্য লড়ছেন, তাদের সঙ্গেও বেইমানি হবে বলে মন্তব্য করেন ইমরান খান। ইমরান আরও বলেন, আমি ক্ষমতায় বসার পরের দিন থেকেই কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

এদিকে, সম্প্রতি পাকিস্তান সফরে এসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট ভোলকান বোজকির বলেছেন, ভারত-পাকিস্তান দুদেশের পক্ষে আলাদাভাবে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এ ইস্যুতে দুই দেশেরই অহেতুক কথার লড়াই বন্ধ করতে হবে। তবে ইস্যুটিকে আরও গুরুত্ব দিয়ে যেন জাতিসংঘে উত্থাপন করা হয় সে বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন তিনি।

জাতিসংঘের উপর ক্ষুব্ধ ভারত

এদিকে, কাশ্মীর নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ভোলকান বোজকারের দেয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারত। বৃহস্পতিবারই  কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের আরও বেশি জোর গলায় সরব হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন ভোলকান।  জম্মু ও কাশ্মীরের অবস্থান যাতে পরিবর্তন না হয়, এ জন্য সব পক্ষকেই পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। 

এর জবাবে এবার ভারত জানিয়েছে, কাশ্মীর নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির মন্তব্য অযৌক্তিক এবং দুঃখজনক। ভোলকানের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েন মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি বলেন, পাকিস্তান সফরকালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি ভোলকান বোজকারের কাশ্মীর নিয়ে করা এই অযৌক্তিক মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করছি আমরা। ভোলকান বলেছেন যে পাকিস্তানের উচিত কাশ্মীর ইস্যু জাতিসংঘে উত্থাপন করা, এই মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।

এর আগে কাশ্মীরের পরিস্থিতিকে ফিলিস্তিনের সঙ্গে তুলনা টেনেছিলেন ভোলকান। যা ভালো চোখে দেখেনি ভারত। ইসলামাবাদে পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশির সঙ্গে বৈঠকের পরে তুর্কি এ কূটনীতিক  কাশ্মীর নিয়ে এমন মন্তব্য করেছিলেন। 

২০১৯ সালে সংবিধানের ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার করে ভারত জম্মু ও কাশ্মীরকে দুই ভাগে ভাগ করে লাদাখকে পৃথক কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা দেয়। যা নিয়ে আপত্তি তুলেছিল পাকিস্তান। যদিও ভারত এই বিষয়টিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে দাবি করে এসেছে।

কাশ্মীরি যুবকের আত্মহত্যা

২০১৯ সালে ভারত সরকারের মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে। এই ঘটনার পর অঞ্চলটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। বিক্ষোভ বন্ধ করতে কেন্দ্র সরকার এক বছরের বেশি সময় ধরে অঞ্চলিতে জরুরি অবস্থা জারি রাখে। কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের পর অঞ্চলটির ৫ লাখের বেশি সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। 

গত ছয় মাসে কাশ্মীরের অন্তত ছয়জন সরকারি চাকরিজীবীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এছাড়া গত দুই বছর ধরে প্রায় দেড়শজন শিক্ষকের বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে।

আড়াই বছর ধরে বাবার বেতন বন্ধ। এই হতাশায় আত্মহত্যা করেছেন কাশ্মীরের এক যুবক। কাতারভিত্তিক আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, নিহত যুবকের নাম শোয়াইব বশির মীর। তিনি ভারত শাসিত কাশ্মীরের কুলগ্রাম জেলার অভিল গ্রামের বাসিন্দা। নিহত শোয়াইব মনোবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। 

খবরে বলা হয়, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শোয়াইব বশির মীর অভিল গ্রামের একটি আপেল বাগান থেকে তার বন্ধু মোহাম্মদ আব্বাসকে ডাকেন। মীর তার বন্ধু আব্বাসকে তার ধারণকৃত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করতে বলেন।

ওই ভিডিওতে ২৪ বছর বয়সী মীর বলেন, আড়াই বছর ধরে যাদের বেতন বন্ধ, আমি সেসব শিক্ষকদের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করছি।  বেতন বন্ধ সমস্যার সমাধানের জন্য আত্মহত্যা করছেন উল্লেখ করে মীর জানান, তার বাবার বেতনও স্থগিত। 

ভিডিওতে শোয়াইব ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে বলেন, আমরা কল্পনার বাইরে খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি। বিষপানে আত্মহত্যার আগে কাশ্মীরের ওই যুবক পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।    

আলজাজিরার খবরে বলা হয়, মীরের আত্মহত্যা কাশ্মীরের সরকারি চাকরিজীবীরা কত দুর্দশায় আছেন সেটা প্রকাশ্যে এনেছে। মীরের বাবা বশির আহমেদ মীর বছরের পর বছর ধরে বেতন পান না।  কাশ্মীরের বিদ্রোহীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তার বেতন আটকে রাখা হয়েছে। 

কাশ্মীরে সেনা অভিযান

গত মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের শোপিয়ান এলাকায় নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। এ সময় সেনাসদস্যরা আরও একজনকে আটক করেছেন।

কাশ্মীরের পুলিশ জানিয়েছে, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে দক্ষিণ কাশ্মীরের শোপিয়ানের কানিগাম এলাকায় বুধবার রাতে হানা দেন নিরাপত্তারক্ষীরা। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন তারা।  নিরাপত্তারক্ষীদের দেখেই গুলি চালাতে শুরু করেন বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। এ সময় পাল্টা জবাব দেওয়া শুরু করে নিরাপত্তাবাহিনী, বুধবার রাতভর চলে এই গোলাগুলি। 

বৃহস্পতিবার সকালে অ্যানকাউন্টার শেষ হয়।  তার পর ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।  এ সময় তৌসিফ আহমেদ নামে একজন আটক করে নিয়ে আসে সেনাসদস্যরা।

এসডব্লিউ/এমএন/এসএস/১৯০৭ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ