ভাবুন, পৃথিবীর বাতাসে এমন একটি উপাদান বিপুল পরিমাণে রয়েছে, যা উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেই উপাদান সরাসরি বাতাস থেকে গ্রহণ করে বেশির ভাগ উদ্ভিদ তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারে না। কোটি কোটি বছর ধরে প্রকৃতির নিজস্ব প্রক্রিয়া এই ঘাটতি পূরণ করেছে। কিন্তু একসময় মানুষ এমন একটি প্রযুক্তি আবিষ্কার করল, যার সাহায্যে বাতাসের উপাদানকে রূপান্তর করে তৈরি করা সম্ভব হলো কৃষিজমির জন্য প্রয়োজনীয় সার। এর ফলে শুধু কৃষির উৎপাদন বাড়ল না, বদলে গেল জনসংখ্যার গতিপথ, শিল্পের কাঠামো এবং যুদ্ধের ইতিহাসও।
বিজ্ঞানের এই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি নাম—ফ্রিটজ হাবার ও কার্ল বশ। তাঁদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একটি আবিষ্কার, যা আধুনিক সভ্যতার খাদ্যব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এই প্রযুক্তি কোটি কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে এর সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার যুদ্ধের জন্য বিস্ফোরক তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ যে প্রযুক্তি মানুষের ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করেছে, সেটিই যুদ্ধের ক্ষমতা বাড়ানোর উপকরণ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে নাইট্রোজেনের গুরুত্ব। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৭৮ শতাংশই নাইট্রোজেন গ্যাস। উদ্ভিদের বৃদ্ধি, প্রোটিন তৈরি এবং জীবজগতের নানা গুরুত্বপূর্ণ জৈব প্রক্রিয়ায় নাইট্রোজেন অপরিহার্য। কিন্তু বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন সাধারণত এমন একটি স্থিতিশীল অণু হিসেবে থাকে, যা অধিকাংশ উদ্ভিদ সরাসরি ব্যবহার করতে পারে না। উদ্ভিদের প্রয়োজন হয় ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিক যৌগে থাকা নাইট্রোজেন।
প্রকৃতিতে এই রূপান্তরের ব্যবস্থা রয়েছে। বজ্রপাত, মাটির অণুজীব এবং জীবজগতের বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাইট্রোজেন ব্যবহারযোগ্য যৌগে পরিণত হয়। উদ্ভিদ মাটি থেকে এসব পুষ্টি গ্রহণ করে। প্রাণীরা উদ্ভিদ বা অন্য প্রাণী খাওয়ার মাধ্যমে নাইট্রোজেন পায়। মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহ পচে আবার পুষ্টি মাটিতে ফিরে আসে। এভাবেই প্রকৃতিতে নাইট্রোজেনের চক্র চলতে থাকে।
কিন্তু মানুষের খাদ্যচাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হতে শুরু করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শহর সম্প্রসারণ এবং কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ার ফলে আরও বেশি খাদ্য উৎপাদনের প্রয়োজন দেখা দেয়। শুধু জমির পরিমাণ বাড়িয়ে এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব ছিল না। প্রয়োজন ছিল একই জমিতে অধিক ফসল উৎপাদনের। আর সে জন্য দরকার ছিল মাটিতে পর্যাপ্ত পুষ্টি সরবরাহ।
কৃষকেরা বহু আগে থেকেই গোবর, কম্পোস্ট, ফসলের অবশিষ্টাংশ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা বাড়ানোর চেষ্টা করতেন। বিভিন্ন অঞ্চলে গুয়ানো বা পাখির বিষ্ঠা থেকেও সার সংগ্রহ করা হতো। কিন্তু এসব উৎসের সরবরাহ সীমিত ছিল। শিল্পায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল—পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের খাবার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন কি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব?
উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে এই প্রশ্ন বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছিল। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নাইট্রোজেনযুক্ত রাসায়নিকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার ছিল বিস্ফোরক তৈরি। সে সময় বিভিন্ন দেশে নাইট্রেটের সরবরাহ, বিশেষ করে চিলির খনি থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক নাইট্রেট, কৃষি ও সামরিক শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে নাইট্রোজেনের বিকল্প উৎস তৈরি করা কেবল বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ ছিল না; এটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রয়োজনেও পরিণত হয়েছিল।
এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন জার্মান রসায়নবিদ ফ্রিটজ হাবার। ১৯০০-এর দশকে তিনি বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেন ব্যবহার করে অ্যামোনিয়া তৈরির পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেন। অ্যামোনিয়া হলো নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেনের সমন্বয়ে গঠিত একটি রাসায়নিক যৌগ। এটি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের নাইট্রোজেন সার তৈরি করা যায়।
সমস্যাটি ছিল, নাইট্রোজেন অণুর দুই পরমাণুর মধ্যে বন্ধন অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে সাধারণ অবস্থায় নাইট্রোজেনকে অন্য পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়া করানো সহজ নয়। হাবারকে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হয়েছিল, যেখানে নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেন বিক্রিয়া করে অ্যামোনিয়া তৈরি করতে পারে। উচ্চ চাপ, উচ্চ তাপমাত্রা এবং উপযুক্ত অনুঘটক ব্যবহার করে তিনি পরীক্ষাগারে এই রাসায়নিক রূপান্তর সম্ভব করেন।
১৯০৯ সালে হাবার তাঁর পদ্ধতির কার্যকারিতা প্রদর্শন করেন। কিন্তু পরীক্ষাগারে সামান্য পরিমাণ অ্যামোনিয়া তৈরি করা আর একটি শিল্পকারখানায় বিপুল পরিমাণে তা উৎপাদন করা এক বিষয় নয়। শিল্পপর্যায়ে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন ছিল এমন যন্ত্রপাতি, যা দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা ও প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদনকে করতে হতো ধারাবাহিক, নিরাপদ এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।
এখানেই সামনে আসেন আরেক জার্মান রসায়নবিদ ও প্রকৌশলী কার্ল বশ। তিনি হাবারের পরীক্ষাগারভিত্তিক পদ্ধতিকে শিল্পকারখানায় ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার কাজ করেন। উচ্চ চাপ সহ্য করতে সক্ষম যন্ত্রপাতি, বিশেষ ধাতু, চুল্লি এবং উৎপাদনব্যবস্থা তৈরি করা ছিল বিশাল প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। বশ ও তাঁর সহকর্মীদের কাজের ফলে অ্যামোনিয়া উৎপাদন পরীক্ষাগারের সীমা পেরিয়ে শিল্পপর্যায়ে পৌঁছায়।
এই প্রযুক্তি ইতিহাসে হাবার-বশ প্রক্রিয়া নামে পরিচিত। ১৯১৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জার্মানির ওপাউতে এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বের প্রথম শিল্পপর্যায়ের অ্যামোনিয়া উৎপাদন কারখানা চালু হয়। এর মাধ্যমে কৃষি ও রাসায়নিক শিল্পের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেনকে ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিক পদার্থে রূপান্তর করার প্রযুক্তি তখন আর পরীক্ষাগারের কৌতূহল ছিল না; এটি হয়ে উঠল বৃহৎ শিল্পব্যবস্থার অংশ।
এই আবিষ্কারের প্রভাব সবচেয়ে গভীরভাবে দেখা যায় কৃষিতে। অ্যামোনিয়া থেকে উৎপাদিত নাইট্রোজেন সার ফসলের বৃদ্ধি ও ফলন বাড়াতে সাহায্য করে। গাছের পাতা, কাণ্ড এবং অন্যান্য অংশের বৃদ্ধির জন্য নাইট্রোজেন প্রয়োজন। পর্যাপ্ত নাইট্রোজেন পেলে অনেক ফসল দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং উৎপাদন বাড়তে পারে। তবে ফলন কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করে মাটির অবস্থা, পানি, বীজ, আবহাওয়া, অন্যান্য পুষ্টি উপাদান এবং সার ব্যবহারের পদ্ধতির ওপর।
কৃত্রিম নাইট্রোজেন সার কৃষিকে এমন একটি সুবিধা দেয়, যা আগে অনেক অঞ্চলে সহজলভ্য ছিল না। কৃষকেরা শুধু প্রাকৃতিকভাবে মাটিতে থাকা নাইট্রোজেন বা সীমিত জৈব সারের ওপর নির্ভর না করে শিল্পে উৎপাদিত সার ব্যবহার করতে পারেন। ফলে অনেক দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানো সহজ হয়। পরবর্তী সময়ে উন্নত বীজ, সেচ, কৃষিযন্ত্র, কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য কৃষিপ্রযুক্তির সঙ্গে সার ব্যবহারের সমন্বয় খাদ্য উৎপাদনে বড় পরিবর্তন আনে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীর জনসংখ্যার ইতিহাস। আধুনিক খাদ্যব্যবস্থায় কৃত্রিম নাইট্রোজেন সারের অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে গবেষকেরা মনে করেন, বর্তমানে বেঁচে থাকা পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষের খাদ্য উৎপাদন কোনো না কোনোভাবে এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। তবে এই হিসাবকে সরাসরি এমন অর্থে নেওয়া ঠিক হবে না যে সার আবিষ্কার না হলে ঠিক অর্ধেক মানুষ পৃথিবীতে থাকত না। এটি খাদ্য উৎপাদনে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সারের অবদান সম্পর্কে একটি আনুমানিক হিসাব, কোনো বিকল্প ইতিহাসের নিশ্চিত জনসংখ্যাগত পূর্বাভাস নয়।
তবু এই তথ্য আবিষ্কারটির গুরুত্ব বোঝাতে যথেষ্ট। আজ আমরা যে বিপুল পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন করি, তার পেছনে রয়েছে এমন এক শিল্পপ্রযুক্তি, যা বাতাসের একটি উপাদানকে কৃষিজমির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিতে রূপান্তর করতে পারে। এই প্রযুক্তি না থাকলে একই পরিমাণ খাদ্য উৎপাদনের জন্য আরও বেশি জমি, ভিন্ন কৃষিব্যবস্থা অথবা অন্য পুষ্টির উৎসের ওপর নির্ভর করতে হতো। ফলে বিশ্ব খাদ্যব্যবস্থার বর্তমান রূপ অনেকটাই ভিন্ন হতে পারত।
কিন্তু এই আবিষ্কারের ইতিহাসের আরেকটি দিক রয়েছে, যা একে আরও জটিল করে তোলে। হাবার-বশ প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত অ্যামোনিয়া থেকে নাইট্রিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন নাইট্রোজেনযুক্ত রাসায়নিক তৈরি করা যায়। এসব রাসায়নিক সার উৎপাদনের পাশাপাশি বিস্ফোরক তৈরিতেও ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে খাদ্য উৎপাদনে বিপ্লব ঘটানো প্রযুক্তি সামরিক শিল্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই দ্বৈত ভূমিকার তাৎপর্য স্পষ্ট হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জার্মানির জন্য বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় নাইট্রেট সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। সমুদ্রপথে সরবরাহের ওপর বাধা সৃষ্টি হওয়ায় বিস্ফোরক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের বিকল্প উৎসের গুরুত্ব বেড়ে যায়। শিল্পপর্যায়ে অ্যামোনিয়া উৎপাদনের প্রযুক্তি জার্মানিকে নাইট্রোজেনযুক্ত রাসায়নিক উৎপাদনের একটি নতুন ভিত্তি দেয়। এর মাধ্যমে কৃষির পাশাপাশি যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু উপকরণ উৎপাদনও সম্ভব হয়।
এই ইতিহাসের সঙ্গে ফ্রিটজ হাবারের ব্যক্তিগত জীবনও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অ্যামোনিয়া সংশ্লেষণে তাঁর অবদানের জন্য তিনি ১৯১৮ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান; পুরস্কারটি তাঁকে ১৯১৯ সালে প্রদান করা হয়। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির রাসায়নিক যুদ্ধ কর্মসূচিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। বিশেষ করে বিষাক্ত গ্যাসের সামরিক ব্যবহারের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা বিজ্ঞানীর সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন: হাবার-বশ প্রক্রিয়া নিজে বিষাক্ত গ্যাসের অস্ত্র নয়। এটি নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেন থেকে অ্যামোনিয়া তৈরির একটি শিল্পপ্রযুক্তি। কিন্তু সেই প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত রাসায়নিক এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পজ্ঞান বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। ইতিহাসের এই দ্বৈততা দেখায়, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মূল্যায়ন করতে হলে তার প্রযুক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি তার ব্যবহার, সামাজিক প্রভাব এবং নৈতিক প্রশ্নও বিবেচনা করতে হয়।
কৃষির ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির মূল্য সম্পূর্ণ ইতিবাচক নয়। নাইট্রোজেন সার অতিরিক্ত বা ভুলভাবে ব্যবহার করলে মাটির পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। বৃষ্টির পানি ও সেচের মাধ্যমে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন নদী, হ্রদ ও অন্যান্য জলাশয়ে পৌঁছাতে পারে। এতে শৈবালের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং জলজ প্রাণীর ক্ষতির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। সার উৎপাদন ও ব্যবহারের সঙ্গে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের সম্পর্কও রয়েছে। তাই আধুনিক কৃষির চ্যালেঞ্জ হলো সার ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করা এবং পরিবেশগত ক্ষতি কমানো।
বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এই ইতিহাস বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের খাদ্য উৎপাদনে ইউরিয়া ও অন্যান্য রাসায়নিক সারের ভূমিকা রয়েছে। জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বাড়াতে পুষ্টি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সার ব্যবহারের সঙ্গে উৎপাদন খরচ, আমদানিনির্ভরতা, কৃষকের আর্থিক চাপ এবং পরিবেশের ভারসাম্যের বিষয়গুলোও যুক্ত। তাই ভবিষ্যতের কৃষি পরিকল্পনায় সুষম সার প্রয়োগ, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জৈব পদার্থের ব্যবহার এবং উন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
হাবার ও বশের আবিষ্কারের প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর পৃথিবী আবারও খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশের দ্বৈত সংকটের মুখোমুখি। একদিকে জনসংখ্যা ও খাদ্যচাহিদা রয়েছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির অবক্ষয়, পানি দূষণ এবং কৃষির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা এখন এমন প্রযুক্তি ও কৃষিপদ্ধতি উন্নয়নের চেষ্টা করছেন, যা কম সম্পদ ব্যবহার করে বেশি খাদ্য উৎপাদন করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে আরও দক্ষ সার প্রয়োগ, উন্নত ফসল, জৈবিক নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ এবং সার উৎপাদনে কম কার্বন নির্গমনকারী প্রযুক্তি।
বাতাস থেকে অ্যামোনিয়া তৈরির আবিষ্কার তাই শুধু অতীতের কোনো বৈজ্ঞানিক সাফল্যের গল্প নয়। এটি দেখায়, একটি মৌলিক রাসায়নিক সমস্যার সমাধান কীভাবে পুরো পৃথিবীর খাদ্যব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি সতর্ক করে দেয় যে বিজ্ঞানের শক্তি কখনো একমুখী নয়। যে প্রযুক্তি ক্ষুধা কমাতে পারে, সেটিই সামরিক শিল্পকে শক্তিশালী করতে পারে; যে সার ফসলের ফলন বাড়ায়, তার অপব্যবহার পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত হাবার-বশ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, মানুষের ইতিহাস শুধু যুদ্ধ, রাজনীতি কিংবা সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন দিয়ে তৈরি হয় না। কখনো কখনো একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া, একটি শিল্পকারখানা এবং কয়েকজন বিজ্ঞানীর দীর্ঘ গবেষণাও সভ্যতার গতিপথ বদলে দেয়। আমরা প্রতিদিন যে রুটি, ভাত, শাকসবজি কিংবা অন্যান্য খাবার খাই, তার পেছনের উৎপাদনব্যবস্থায় এমন প্রযুক্তির অবদান রয়েছে, যা একসময় অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছিল।
বাতাসের নাইট্রোজেনকে ব্যবহারযোগ্য পুষ্টিতে রূপান্তরের এই আবিষ্কার তাই মানবসভ্যতার এক বিরল দ্বৈত উত্তরাধিকার। এটি কোটি কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদনকে সম্ভব করেছে, আবার যুদ্ধ ও পরিবেশের ইতিহাসেও গভীর ছাপ রেখেছে। বিজ্ঞানের প্রকৃত শক্তি এখানেই—এটি শুধু আমাদের পৃথিবীকে বদলায় না, আমরা সেই পরিবর্তনকে কীভাবে ব্যবহার করব, সেই দায়িত্বও আমাদের সামনে তুলে ধরে।
আপনার মতামত জানানঃ