
একজন মানুষ সারা জীবন সমাজের চোখে সফল হওয়ার চেষ্টা করলেন। ভালো ফল, সম্মানজনক পেশা, গ্রহণযোগ্য জীবন। তারপর একদিন মনে হলো, এত কিছু অর্জনের পরও জীবনটি যেন তাঁর নিজের নয়। তিনি যা চেয়েছেন বলে ভেবেছিলেন, তার কতটুকু আসলে অন্যদের প্রত্যাশা?
ফ্রিডরিখ নিটশের দর্শনে প্রবেশের একটি দরজা এই অস্বস্তি। আমরা কীভাবে বাঁচব, তার উত্তর কোথা থেকে পাই? পরিবার, ধর্ম, রাষ্ট্র কিংবা জনমত যে মূল্যবোধ দেয়, সেগুলো আমরা গ্রহণ করেছি কেন? আর পুরোনো উত্তর ভেঙে গেলে নতুন অর্থ তৈরি করার সামর্থ্য আমাদের আছে কি?
নিটশে পাঠককে নিশ্চিন্ত করার চেয়ে অস্থির করেন বেশি। সেই অস্থিরতার উদ্দেশ্য কেবল ভাঙা নয়; নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও।
একটি স্লোগানের আড়ালে অর্থের সংকট
‘ঈশ্বর মৃত’—নিটশের সবচেয়ে পরিচিত এবং প্রায়ই প্রসঙ্গবিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহৃত ঘোষণা। ‘দ্য গে সায়েন্স’-এর ১২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে এক উন্মাদের মুখে কথাটি আসে। শ্রোতাদের অনেকে আগে থেকেই অবিশ্বাসী; তবু তারা ঘোষণাটির গভীরতা বুঝতে পারে না।
এটি কোনো দেবতার শারীরিক মৃত্যুর বিবরণ নয়। আধুনিক ইউরোপে খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে গেলে সত্য, নৈতিকতা ও জীবনের অর্থের পুরোনো ভিত্তির কী হবে—সেই সাংস্কৃতিক সংকটের নাটকীয় প্রকাশ।
এখানেই নিহিলিজম বা মূল্য ও অর্থের সংকট গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো নিশ্চয়তা হারিয়ে মানুষ ভাবতে পারে, কোনো কিছুরই মূল্য নেই। নিটশে এই অবস্থাকে নিছক উদ্যাপন করেন না; তা অতিক্রমের সম্ভাবনা খোঁজেন।
আজ এই প্রশ্নের সমকালীন প্রয়োগ ভাবা যায়। কোনো মতাদর্শের প্রতি বিশ্বাস হারালেই কি বিচারবোধের প্রয়োজন শেষ হয়? একটি কর্তৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে আমরা কি আরেকটি কর্তৃত্বের অনুসারী হয়ে যাচ্ছি? নিটশের রচনায় আজকের এসব উদাহরণ নেই; কিন্তু তাঁর সংকটবোধ এগুলো ভাবতে সাহায্য করে।
ভালো-মন্দেরও কি ইতিহাস আছে?
‘অন দ্য জিনিয়লজি অব মোরালিটি’তে নিটশে প্রচলিত নৈতিক মূল্যবোধের উৎপত্তি ও মূল্য পরীক্ষা করেন। আমরা যাকে ভালো বলি, তা কোন জীবনপরিস্থিতিতে ভালো বলে স্বীকৃতি পেয়েছিল? কোন ধরনের মানুষ ও ক্ষমতার সম্পর্ক এই বিচারকে গড়ে তুলেছে?
তিনি ‘প্রভু নৈতিকতা’ ও ‘দাস নৈতিকতা’র পার্থক্য টানেন। তাঁর বংশানুসন্ধানে প্রথম ধরনের মূল্যায়ন আত্মপ্রত্যয়ী উৎকর্ষকে কেন্দ্র করে; দ্বিতীয়টির উত্থানে ভূমিকা রাখে ‘রেসঁতিমঁ’—অবরুদ্ধ ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা, যা মূল্যবোধ তৈরির শক্তি হয়ে ওঠে। এটি তাঁর বিতর্কিত ঐতিহাসিক-মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা; ইতিহাসের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নয়।
এই ধারণার একটি ব্যবহার হতে পারে নিজের নৈতিক ক্রোধ পরীক্ষা করা। আমি কি কোনো কাজের প্রকৃত ক্ষতির বিরোধিতা করছি, নাকি কারও সাফল্যে আহত হয়ে তাকে অনৈতিক ঘোষণা করছি? অন্যকে ছোট করা কি আমার নিজের অপূর্ণতার বিকল্প সান্ত্বনা?
তবে এই প্রশ্ন উল্টোদিকেও করতে হবে। নিপীড়িতের প্রতিবাদকে শুধু ঈর্ষা বা ক্ষোভ বলে উড়িয়ে দেওয়া ক্ষমতাবানের সুবিধা হতে পারে। অন্যায়ের বাস্তব প্রমাণকে কোনো মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে বাতিল করা চলে না। নিটশের সন্দেহ করার পদ্ধতি মূল্যবান হতে পারে, কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্তও প্রমাণ ও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।
ক্ষমতার ইচ্ছা: নিজেকে বদলানো, অন্যকে শাসন?
‘উইল টু পাওয়ার’ বা ‘ক্ষমতার ইচ্ছা’ নিটশের চিন্তার বহুল আলোচিত ধারণা। এর ব্যাপ্তি ও দার্শনিক অবস্থান নিয়ে গবেষকদের মতভেদ আছে। এক প্রভাবশালী ব্যাখ্যায় এটি বাধা অতিক্রম, সামর্থ্য বৃদ্ধি ও নিজের কার্যকর শক্তিকে প্রসারিত করার প্রবণতা।
একজন শিল্পী সহজ জনপ্রিয়তার বদলে কঠিন কাজ শেখেন; একজন মানুষ নিজের দীর্ঘদিনের ভীরুতাকে চ্যালেঞ্জ করেন। এই উদাহরণগুলো আত্মোত্তরণের দিকটি বোঝাতে পারে। কিন্তু এগুলো দিয়েই নিটশের সমস্ত ক্ষমতাচিন্তা ব্যাখ্যা করা যাবে না।
‘বিয়ন্ড গুড অ্যান্ড ইভিল’-এ তিনি আধিপত্য ও শোষণ সম্পর্কেও কঠোর বক্তব্য দেন। কাজেই তাঁর ক্ষমতার ধারণাকে নিছক আত্মউন্নয়নের কোমল ভাষায় অনুবাদ করলে পাঠ অসম্পূর্ণ থাকে।
আজকের পাঠকের কাজ হতে পারে একটি স্পষ্ট পার্থক্য রাখা: নিজের সামর্থ্য বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যের মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার দাবি এক নয়। নিটশের কাছ থেকে আত্মোত্তরণের প্রশ্ন নেওয়া যায়; আধিপত্যের নৈতিক ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
অতিমানব এবং উট, সিংহ, শিশুর রূপক
‘দাস স্প্রাখ জারাথুস্ট্রা’র ‘উবারমেনশ’কে বাংলায় সাধারণত ‘অতিমানব’ বলা হয়। এটি জনপ্রিয় সংস্কৃতির অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাধর নায়ক নয়; প্রচলিত মানুষের অবস্থাকে ছাড়িয়ে নতুন মূল্য সৃষ্টির একটি দার্শনিক আদর্শ। এর ব্যাখ্যা নিয়েও বিতর্ক আছে।
একই বইয়ে আত্মার তিন রূপান্তর—উট, সিংহ ও শিশু—ধারণাটিকে অন্য দিক থেকে ভাবতে সাহায্য করে। উট ভার বহন করে; সিংহ প্রতিষ্ঠিত ‘তোমাকে করতেই হবে’-এর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা দাবি করে; শিশু নতুন সূচনা ও সৃষ্টির প্রতীক। সিংহের প্রত্যাখ্যান প্রয়োজনীয় হলেও নতুন মূল্য সৃষ্টির কাজ তাতেই শেষ হয় না।
আমাদের জীবনে এর প্রয়োগ হতে পারে পরিচয় ও পছন্দের পুনর্বিবেচনা। বাবা-মায়ের প্রত্যাশা প্রত্যাখ্যান করেই কি স্বাধীন হয়ে গেলাম? সমাজের সব রীতিকে তুচ্ছ করলেই কি নিজের জীবন গড়লাম? প্রত্যাখ্যানের পরে কী গ্রহণ করছি এবং কেন—সেই প্রশ্নটি থেকে যায়।
এখানে স্বাধীনতা শুধু বাধা সরানোর ঘটনা নয়। নিজের পছন্দের জন্য কারণ, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ব তৈরি করাও প্রয়োজন। এটি নিটশের রূপক থেকে নেওয়া একটি সমকালীন পাঠ, তাঁর সর্বসম্মত ব্যাখ্যা নয়।
একই জীবন আবার বাঁচতে চাইব?
‘দ্য গে সায়েন্স’-এর ৩৪১ নম্বর অনুচ্ছেদে নিটশে কল্পনা করতে বলেন: এই জীবন, প্রতিটি আনন্দ ও যন্ত্রণাসহ, একই ক্রমে অসংখ্যবার ফিরে এলে প্রতিক্রিয়া কী হবে? ‘শাশ্বত প্রত্যাবর্তন’কে জীবন-স্বীকৃতির পরীক্ষা হিসেবে পড়া যায়, যদিও এর বিশ্বতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও আছে। ‘আমোর ফাতি’—নিয়তিকে ভালোবাসা—তাঁর জীবনের প্রতি সম্মতির আরেক গুরুত্বপূর্ণ অভিব্যক্তি।
এই প্রশ্নের ব্যবহার নিজের বর্তমান সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করায়। আজ যা করছি, তা কি কেবল ভয় বা অভ্যাসে করছি? জীবনটি পাল্টাতে চাইলে কোন জায়গা থেকে শুরু করব?
তবে এখান থেকে কারও বেদনা ভালোবাসতে বাধ্য হওয়ার নির্দেশ আসে না। নির্যাতন থেকে সরে আসা, চিকিৎসা নেওয়া বা অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়া জীবনকে গ্রহণ করার বিরোধী নয়। ভুক্তভোগীকে ‘আরও শক্ত হও’ বলে দায় চাপালে আত্মোত্তরণের ভাষাই নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে।
অতীত বদলানো যায় না; কিন্তু তার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক ও পরবর্তী কাজ নিয়ে ভাবা যায়। জীবনকে ‘হ্যাঁ’ বলা এই পাঠে বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে সম্ভাবনার দিকে কাজ করা।
নিটশেকেও প্রশ্ন করতে হবে
তাঁর দর্শনকে নির্বিচারে গ্রহণের বড় বাধা তাঁর নিজের লেখা। ‘বিয়ন্ড গুড অ্যান্ড ইভিল’-এ সমান অধিকারের বিরোধিতা, নারীর অধস্তনতার পক্ষে বক্তব্য এবং অভিজাতের উৎকর্ষের জন্য বহু মানুষের ত্যাগকে গ্রহণ করার ভাষা আছে। আধুনিক সমান মানবমর্যাদার বিচারে এগুলো গভীরভাবে আপত্তিকর।
তাই নিটশেকে শুধু মুক্তচিন্তার অনুপ্রেরণাদাতা বানালে তাঁর বিপজ্জনক দিক আড়াল হয়। আবার তাঁকে একটি স্লোগানে বাতিল করলে তাঁর তীক্ষ্ণ মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নগুলোও হারিয়ে যায়।
তাঁর দৃষ্টিকোণবাদও সতর্কভাবে পড়া দরকার। ‘জিনিয়লজি’র তৃতীয় প্রবন্ধে তিনি জ্ঞানকে দৃষ্টিকোণনির্ভর বলেন এবং বহু দৃষ্টিকোণ কাজে লাগিয়ে বোঝাপড়া সমৃদ্ধ করার কথা বলেন। সেখান থেকে ‘সব দাবি সমান সত্য’ সিদ্ধান্ত সরাসরি আসে না।
এই ধারণা আজ সংবাদপাঠেও কাজে লাগতে পারে। ভিন্ন মানুষের অভিজ্ঞতা শুনব, নিজের অবস্থানের সীমা বুঝব—কিন্তু প্রমাণ, যুক্তি ও যাচাইয়ের দাবি ছেড়ে দেব না।
নিটশের সবচেয়ে ফলপ্রসূ পাঠ হয়তো তাঁকে অনুসরণে শেষ হয় না। তাঁর প্রশ্ন নিজের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ায় হয়: আমার নৈতিকতা কতটা বিবেচিত, কতটা ক্ষোভের আশ্রয়? আমার স্বাধীনতা কতটা সৃষ্টিশীল, কতটা অন্যের বিরোধিতার ওপর নির্ভরশীল? আমি কি নিজের জীবনের দায়িত্ব নিচ্ছি, নাকি একটি প্রস্তুত ব্যাখ্যার আড়ালে থাকছি?
জীবনকে ‘হ্যাঁ’ বলা সহজ আশাবাদের স্লোগান নয়। নিজের সীমা, ভুল ও অসমাপ্ততার মুখোমুখি হয়েও অর্থপূর্ণভাবে বাঁচার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া—নিটশের দর্শন সেই কঠিন প্রশ্নটিই রেখে যায়।
আপনার মতামত জানানঃ