একটি ছোট শিশু তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাগুলোর একটি হিসেবে বিদ্যালয় বা মাদ্রাসাকে বিশ্বাস করে। মা-বাবা সন্তানকে শিক্ষকের হাতে তুলে দেন এই আশায় যে, সেখানে সে শিক্ষা পাবে, ভালো মানুষ হয়ে উঠবে। কিন্তু সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই যদি কোনো শিশুর সঙ্গে যৌন হয়রানি বা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের অভিযোগ ওঠে, তখন প্রশ্নটি আর শুধু একজন শিক্ষককে ঘিরে থাকে না; প্রশ্ন ওঠে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে। টঙ্গীর একটি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণির এক শিশুকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে শিশুটির বাবার চড় মারার ঘটনাটি এখন সেই প্রশ্নগুলোই সামনে নিয়ে এসেছে।
বিবিসি বাংলার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুটির বাবা অভিযোগ করেছেন, তাঁর মেয়ের সঙ্গে মাদ্রাসার এক শিক্ষক যৌন নিপীড়নমূলক আচরণ করেছেন এবং বিষয়টি অভিভাবকদের জানালে শিশুটিকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, শিক্ষক সবার উদ্দেশে ভালো ফল করলে চুমু দেওয়ার কথা বলেছিলেন, কিন্তু কাউকে চুমু দেননি। অর্থাৎ, ঘটনাটি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আদালত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—একটি শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা অভিযোগকে কোনোভাবেই তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেখা যায়, শিশুটির বাবা অভিযুক্ত শিক্ষককে চড় মারছেন। এ নিয়ে জনমত বিভক্ত। একদল বলছেন, সন্তানের সম্ভাব্য নিপীড়নের অভিযোগ শুনে একজন বাবা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তাঁকে সহজে দোষারোপ করা যায় না। অন্যদিকে, কেউ কেউ বলছেন, অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, কাউকে মারধর করে বিচার করার অধিকার ব্যক্তির নেই। এই দুই অবস্থানের মধ্যে আবেগের সংঘাত থাকলেও মূল প্রশ্নটি হলো—একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা কতটা দৃশ্যমান এবং কার্যকর?
পুলিশের দায়িত্ব কি শুধু চড় মারার ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া? অবশ্যই নয়। পুলিশের দায়িত্ব হলো অভিযোগের প্রতিটি দিক নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে কাউকে মারধর, হামলা বা ভাঙচুরের অভিযোগ থাকলে সেটিও তদন্ত করতে হবে। টঙ্গীর ঘটনায় পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটির বাবার করা মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি মাদ্রাসার অধ্যক্ষের করা পাল্টা মামলায় শিশুটির বাবাকে গ্রেপ্তারের জন্য কাজ করছে পুলিশ। অধ্যক্ষের মামলায় মাদ্রাসায় ভাঙচুর, শিক্ষকদের মারধর এবং ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। এসব অভিযোগও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
কিন্তু এখানেই জনমনে অস্বস্তির জায়গাটি তৈরি হয়। একটি শিশুর সম্ভাব্য যৌন নিপীড়নের অভিযোগ যখন সামনে আসে, তখন সেই শিশুর নিরাপত্তা, মানসিক অবস্থা, অভিযোগের প্রমাণ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির জবাবদিহি নিয়ে রাষ্ট্র কতটা তৎপর—সেটিই মানুষের প্রথম প্রশ্ন হওয়া স্বাভাবিক। একই ঘটনায় শিশুটির বাবার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা ও গ্রেপ্তারের উদ্যোগের খবর সামনে এলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি সন্তানের পক্ষে দাঁড়ানোর চেয়ে প্রতিবাদকারীকে আইনের মুখোমুখি করাই বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে?
এই প্রশ্ন তোলা যায়, তোলা উচিতও। তবে এর উত্তর দিতে হলে তদন্তের ফল, দুই মামলার অভিযোগ এবং পুলিশের প্রকৃত পদক্ষেপ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রয়োজন। শুধু গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেই পুলিশ শিশুর অভিযোগকে উপেক্ষা করছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি পাল্টা মামলা হয়েছে বলে শিশুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের গুরুত্ব কমে যায় না। আইনের নিরপেক্ষতা প্রমাণিত হয় তখনই, যখন অভিযোগকারী, অভিযুক্ত এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিষয়ে একই ন্যায়সংগত মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়।
তবু সমাজের গভীরে থাকা একটি ভয়কে অস্বীকার করা যায় না। শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর যদি মানুষ মনে করে, বিচার চাইতে গেলে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হবে, তাহলে ভবিষ্যতে অনেক অভিভাবক অভিযোগ জানাতে ভয় পেতে পারেন। কোনো পরিবার সামাজিক অপমান, প্রভাবশালী মহলের চাপ কিংবা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার আশঙ্কায় চুপ করে থাকতে পারে। আর এই নীরবতাই সম্ভাব্য নির্যাতনকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই অভিযোগকারী পরিবার যেন নিরাপদে কথা বলতে পারে, শিশুর পরিচয় গোপন থাকে এবং কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়াই তদন্তে সহযোগিতা করতে পারে—তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
প্রশ্ন হলো, এ ধরনের ঘটনায় অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় কীভাবে? সব সময় অপরাধীকে সরাসরি রক্ষা করার মধ্য দিয়েই নয়; কখনো হয় অভিযোগকে গুরুত্ব না দিয়ে, কখনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার অজুহাতে ঘটনা আড়াল করে, কখনো ভুক্তভোগী শিশুকে দোষারোপ করে, আবার কখনো সাক্ষী ও অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়ে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা কিংবা শিক্ষকের সম্মান তাঁকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। আবার অভিযোগ উঠেছে বলেই কাউকে বিচার ছাড়াই অপরাধী ঘোষণা করাও ন্যায়বিচার নয়। শিশু সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার—দুটিই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক পরিবার গভীর আস্থা নিয়ে সন্তানকে পাঠায়। সেই আস্থার সুযোগ নিয়ে কোনো শিক্ষক অনৈতিক আচরণ করলে তা শুধু একটি শিশুর ক্ষতি করে না; পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের বিশ্বাসকে আঘাত করে। আবার বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযোগের কারণে সব শিক্ষক বা সব মাদ্রাসাকে একই চোখে দেখাও যুক্তিসংগত নয়। প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যেখানে ভালো শিক্ষকরা নিরাপদ পরিবেশে কাজ করবেন, শিশুরা নির্ভয়ে শিখবে এবং কোনো অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠান নিজেই তা আড়াল না করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাবে।
শিশুর সম্মতি, নিরাপদ ব্যক্তিগত পরিসর এবং শারীরিক সীমারেখা সম্পর্কে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে ছোট শিশুরা অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ কীভাবে বর্ণনা করতে হয়, তা বুঝতে পারে না। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, ভয় না দেখানো এবং বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করে মানসিক চাপ না বাড়ানো প্রয়োজন। অভিযোগ উঠলে প্রশিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমে শিশুবান্ধব পরিবেশে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। প্রমাণ নষ্ট হওয়ার আগেই যথাযথ প্রক্রিয়ায় তা সংরক্ষণ করাও জরুরি।
অন্যদিকে, সন্তানের প্রতি কোনো অন্যায় হয়েছে বলে মনে হলে অভিভাবকের ক্ষোভ ও মানসিক যন্ত্রণা বোঝা কঠিন নয়। কিন্তু সেই ক্ষোভ থেকে মারধর, হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলে মূল অভিযোগের তদন্ত জটিল হতে পারে এবং নতুন আইনি বিরোধ তৈরি হতে পারে। একজন অভিভাবকের দায়িত্ব সন্তানের পাশে দাঁড়ানো; আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে সন্তানকে রক্ষা করতে গিয়ে অভিভাবককে নিজের হাতে বিচার তুলে নিতে না হয়। পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা তখনই বাড়বে, যখন অভিযোগ জানানোর পর তারা দ্রুত, সংবেদনশীল ও নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার নিশ্চয়তা পাবে।
টঙ্গীর ঘটনায় তাই দুটি প্রশ্নকে আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, শিশুটির সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা কী? দ্বিতীয়ত, শিশুটির বাবার বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর বা লুটপাটের অভিযোগের ভিত্তি কতটা শক্ত? একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে অন্যটির নিষ্পত্তি করা যাবে না। শিক্ষক নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে অন্যায় আচরণের প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। আবার শিশুর অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। বাবার বিরুদ্ধেও কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় তার বিচার হতে পারে। কিন্তু কোনো পক্ষের পরিচয়, আবেগ কিংবা সামাজিক প্রভাব যেন তদন্তকে পরিচালিত না করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুর নিরাপত্তা কোনো দল, ধর্ম, প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানের চেয়ে ছোট বিষয় নয়। একটি শিশুর সম্ভাব্য নিপীড়নের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে উত্তেজনা ছড়ানো সহজ, কিন্তু সত্য উদ্ঘাটন করা কঠিন। সেই কঠিন কাজটিই করতে হবে পুলিশ, তদন্তকারী সংস্থা, আদালত এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে। অভিযুক্তের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযোগকারীর নিরাপত্তা এবং অভিযুক্তের ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার অধিকারও রক্ষা করতে হবে।
সবশেষে প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, শিশুটির বাবা কেন চড় মারলেন কিংবা পুলিশ কেন তাঁকে গ্রেপ্তার করতে চাইছে। আরও বড় প্রশ্ন হলো—আমাদের দেশে একজন অভিভাবক কি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে সন্তানের সঙ্গে অন্যায় হলে আইন তাঁর পাশে দাঁড়াবে? একটি শিশু কি ভয় ছাড়াই বলতে পারবে, কেউ তার সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করেছে? আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি নিজের সম্মান রক্ষার চেয়ে শিশুর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেবে?
আইন যদি কেবল ঘটনার পর মানুষকে গ্রেপ্তার করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে শিশুর নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা তৈরি হবে না। আইনকে একই সঙ্গে অপরাধ প্রতিরোধ করতে হবে, ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দিতে হবে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না—কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের নামে আইনবহির্ভূত শাস্তিকেও স্বাভাবিক করা যাবে না। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি প্রতিশোধে নয়, ন্যায়বিচারে; আর ন্যায়বিচারের প্রথম শর্ত হলো, কোনো শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে কখনোই অবহেলা না করা।
আপনার মতামত জানানঃ