
নামের মধ্যে অক্টোবর, অথচ বার্ষিকী আসে নভেম্বরে। ইতিহাসের বইয়ে যে ঘটনাকে বলা হয় ‘অক্টোবর বিপ্লব’, সেটিকেই স্মরণ করা হয় ৭ নভেম্বর। প্রথমবার শুনলে মনে হতে পারে, কোথাও তারিখ ভুল হয়েছে। কিংবা বিপ্লবের নামের সঙ্গে তার ঘটনার সময় মেলে না। আসলে দুটিই ঠিক। একই দিনকে দুটি ক্যালেন্ডার দুইভাবে চিহ্নিত করেছিল।
১৯১৭ সালে রাশিয়ায় ব্যবহৃত হতো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। অন্যদিকে ইউরোপের বহু দেশে তখন চালু ছিল গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার, যা আজ আন্তর্জাতিকভাবে নাগরিক জীবনে ব্যবহৃত হয়। সেই সময়ে দুই পঞ্জিকার ব্যবধান ছিল ১৩ দিন। ফলে রাশিয়ার পুরোনো পঞ্জিকার ২৫ অক্টোবর ছিল গ্রেগরীয় পঞ্জিকার ৭ নভেম্বর। ঘটনাটি একবারই ঘটেছিল; তারিখ লেখা হয়েছিল দুইভাবে।
এই ছোট্ট ব্যাখ্যার আড়ালে আছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব, ধর্মীয় ঐতিহ্য, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক স্মৃতির দীর্ঘ ইতিহাস। ক্যালেন্ডার এখানে সময় গোনার উপকরণের পাশাপাশি একটি যুগের পরিচয়ও বহন করছে।
তেরো দিনের ব্যবধান তৈরি হলো কীভাবে?
প্রাচীন রোমে জুলিয়াস সিজারের সংস্কারের মাধ্যমে চালু হওয়া জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে প্রতি চার বছরে একবার অধিবর্ষ ধরা হয়। ফলে বছরের গড় দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৩৬৫.২৫ দিন। কিন্তু ঋতুচক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত সৌরবছরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৬৫.২৪২২ দিন। পার্থক্যটি বছরে প্রায় ১১ মিনিট হলেও শতাব্দীর পর শতাব্দী জমে তা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে ঋতুর অবস্থানের ব্যবধান বাড়ায়।
এই সমস্যা সংশোধনের উদ্দেশ্যে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরির উদ্যোগে ১৫৮২ সালে নতুন পঞ্জিকা চালু হয়। প্রথমে যে দেশগুলো সংস্কারটি গ্রহণ করেছিল, সেখানে ৪ অক্টোবরের পরের দিন ধরা হয় ১৫ অক্টোবর। তারিখের তালিকা থেকে দশটি দিন বাদ গেলেও মানুষের জীবনে সময়ের প্রবাহ থেমে যায়নি। বৃহস্পতিবারের পর যথারীতি শুক্রবারই এসেছিল।
নতুন ব্যবস্থায় অধিবর্ষের নিয়মও বদলানো হয়। চার দিয়ে বিভাজ্য বছর সাধারণত অধিবর্ষ হলেও শতাব্দীবর্ষের ক্ষেত্রে আরও একটি শর্ত থাকে: সেটিকে ৪০০ দিয়েও বিভাজ্য হতে হবে। তাই ১৯০০ সাল গ্রেগরীয় হিসাবে অধিবর্ষ ছিল না, কিন্তু ২০০০ সাল ছিল। জুলিয়ান হিসাবে দুটিই অধিবর্ষ।
এই আলাদা নিয়মের কারণে দুই পঞ্জিকার ব্যবধান সব যুগে সমান নয়। শুরুতে যে সংশোধন ছিল দশ দিনের, ১৯১৭ সালে এসে ব্যবধান দাঁড়িয়েছিল তেরো দিনে। তাই পুরোনো কোনো তারিখকে নতুন পঞ্জিকায় রূপান্তরের সময় সব ক্ষেত্রে তেরো দিন যোগ করা ঠিক নয়; কোন বছরের ঘটনা, সেটিও জানতে হবে।
গ্রেগরীয় পঞ্জিকা ইউরোপের সব দেশ একসঙ্গে গ্রহণ করেনি। ধর্মীয় বিভাজন ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কারণে পরিবর্তন এসেছে ভিন্ন সময়ে। রাশিয়াতেও পুরোনো পঞ্জিকা দীর্ঘদিন বজায় ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগে একই দিনের জন্য দুই তারিখ ব্যবহারের প্রয়োজন হতো।
১৯১৭: এক বছরে দুই বিপ্লব
অক্টোবর বিপ্লব বুঝতে হলে তার আগের বিপ্লবটির কথাও মনে রাখতে হয়। ১৯১৭ সালের প্রথম বিপ্লবেই জারতন্ত্রের পতন ঘটে। পুরোনো পঞ্জিকায় সেটি ‘ফেব্রুয়ারি বিপ্লব’; গ্রেগরীয় হিসাবে তার প্রধান ঘটনাগুলো মার্চে। যুদ্ধের চাপ, খাদ্যসংকট, ধর্মঘট ও রাজতন্ত্রের প্রতি ক্ষোভ সেই আন্দোলনের পটভূমি তৈরি করেছিল।
জার দ্বিতীয় নিকোলাসের সিংহাসনত্যাগের পর রাশিয়ায় অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু রাজতন্ত্রের পতন যুদ্ধ ও সামাজিক সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান আনেনি। অস্থায়ী সরকারের পাশাপাশি শ্রমিক ও সৈনিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সোভিয়েত বা পরিষদগুলোও রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ‘সোভিয়েত’ শব্দটির অর্থ এখানে পরিষদ; তখনো সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে রাষ্ট্র গঠিত হয়নি।
এখানে একটি প্রচলিত বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি। অক্টোবর বিপ্লবে বলশেভিকরা সরাসরি জারকে ক্ষমতাচ্যুত করেনি। জারতন্ত্রের পতন ঘটেছিল আগেই। লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিকদের অক্টোবরের পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল অস্থায়ী সরকার। দুটি বিপ্লবকে এক করে দেখলে ১৯১৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হারিয়ে যায়।
পেত্রোগ্রাদে, আজকের সেন্ট পিটার্সবার্গে, পুরোনো পঞ্জিকার ২৪–২৫ অক্টোবর বলশেভিক নেতৃত্বাধীন বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র ও সরকারি স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নেয়। অস্থায়ী সরকারের অবস্থান ছিল উইন্টার প্যালেসে। ২৫ অক্টোবরের রাত পেরিয়ে ২৬ অক্টোবরের প্রথম প্রহরে সেখানে থাকা মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেগরীয় হিসাবে ঘটনাপ্রবাহটি ৬–৮ নভেম্বর পর্যন্ত বিস্তৃত।
তাহলে শুধু ৭ নভেম্বর কেন? কারণ দীর্ঘ ঘটনাপ্রবাহের স্মারক হিসেবে ২৫ অক্টোবর, অর্থাৎ নতুন পঞ্জিকায় ৭ নভেম্বর, প্রতিষ্ঠিত হয়। কোনো বিপ্লবের একটি বার্ষিকী থাকা মানে তার সব ঘটনা সেদিনের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই ঘটেছিল, এমন নয়।
জানুয়ারির পর হঠাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি
বলশেভিকরা ক্ষমতায় আসার পর নাগরিক জীবনে ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। রাশিয়ার প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরির বিবরণ অনুযায়ী, পুরোনো পঞ্জিকার ২৪ জানুয়ারি ১৯১৮, নতুন হিসাবে ৬ ফেব্রুয়ারি, পশ্চিম ইউরোপীয় পঞ্জিকা গ্রহণের ডিক্রি গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত ছিল, ৩১ জানুয়ারির পরের দিনকে ১ ফেব্রুয়ারি না বলে ১৪ ফেব্রুয়ারি ধরা হবে।
মানুষ তেরো দিন ঘুমিয়ে থাকেনি, কোনো দিনও বাস্তব সময় থেকে উধাও হয়নি। বদলেছিল নাগরিক তারিখের নাম। আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে পঞ্জিকার সংখ্যাগুলো এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। ১৯১৮ সালে পরিবর্তনটি করেছিল তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার সরকার। ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন ক্যালেন্ডার বদলাল’ বললে পরবর্তী রাষ্ট্রের নাম আগের সময়ে বসানো হয়; সোভিয়েত ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় ১৯২২ সালে।
নতুন পঞ্জিকা চালু হওয়ার পর বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকী এল ৭ নভেম্বর ১৯১৮। নাম থেকে গেল ‘অক্টোবর বিপ্লব’। কারণ নামটি জন্ম নিয়েছিল ঘটনার সময় রাশিয়ায় প্রচলিত পঞ্জিকা অনুসারে। পরবর্তী নাগরিক পঞ্জিকা পরিবর্তন সেই প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক পরিচয় মুছে দেয়নি।
বিষয়টি মনে রাখার জন্য তিনটি মিল যথেষ্ট:
| ঘটনা | জুলিয়ান বা পুরোনো পঞ্জিকা | গ্রেগরীয় বা নতুন পঞ্জিকা |
|---|---|---|
| ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সূচনার প্রচলিত তারিখ | ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯১৭ | ৮ মার্চ ১৯১৭ |
| অক্টোবর বিপ্লবের স্মারক তারিখ | ২৫ অক্টোবর ১৯১৭ | ৭ নভেম্বর ১৯১৭ |
| উইন্টার প্যালেসে মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার | ২৬ অক্টোবরের প্রথম প্রহর | ৮ নভেম্বরের প্রথম প্রহর |
তারিখের পরেও যে ইতিহাস থাকে
ক্যালেন্ডারের হিসাব পরিষ্কার করলেই বিপ্লবের মূল্যায়ন শেষ হয় না। সমর্থকদের কাছে অক্টোবর ছিল শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণের সূচনা। বিরোধীদের কাছে এটি ছিল বলশেভিকদের ক্ষমতা দখল ও বহুদলীয় রাজনীতির সম্ভাবনা সংকুচিত হওয়ার মোড়। পরবর্তী গৃহযুদ্ধ, দমননীতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভবনের অভিজ্ঞতা এই বিতর্ককে আরও গভীর করেছে।
এখানে প্রয়োজন ঘটনা, পরবর্তী স্মরণ এবং রাজনৈতিক মূল্যায়নকে আলাদা করে বোঝা। কোন পঞ্জিকায় ঘটনাটি ঘটেছিল—এটি যাচাইযোগ্য প্রশ্ন। ঘটনাটি মুক্তির সূচনা ছিল কি না—এটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক বিতর্ক। একটি প্রশ্নের উত্তর অন্যটির বিচার নিজে থেকে নির্ধারণ করে না।
একইভাবে বিপ্লবের বহুল পরিচিত দৃশ্য আর ঘটনার সম্পূর্ণ ইতিহাসও এক নয়। উইন্টার প্যালেস দখল গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু বিপ্লবকে কেবল একটি ভবনের সামনে মানুষের সমাবেশের ছবিতে আটকে রাখলে যুদ্ধ, খাদ্যসংকট, রাজনৈতিক সংগঠন এবং অস্থায়ী সরকারের কর্তৃত্বহীনতার পটভূমি আড়ালে পড়ে।
‘অক্টোবর’ নামটি তাই একটি পুরোনো তারিখের চেয়ে বেশি কিছু বহন করে। এর মধ্যে সংরক্ষিত আছে ঘটনার সময়কার ভাষা ও পরবর্তী রাজনৈতিক স্মৃতি। বার্ষিকী নভেম্বরের পঞ্জিকায় এলেও ঐতিহাসিক নামটি সেই পুরোনো অক্টোবরের সাক্ষ্য হয়ে রয়ে গেছে।
ইতিহাসের বইয়ে কোনো তারিখের পাশে ‘ওল্ড স্টাইল’ বা ‘নিউ স্টাইল’, সংক্ষেপে ওএস বা এনএস লেখা থাকলে তাই সেটি বাড়তি অলংকার নয়। লেখক জানিয়ে দিচ্ছেন, কোন ক্যালেন্ডারে দিনটি গোনা হয়েছে। অনুবাদ বা সংক্ষেপ করার সময় এই চিহ্ন বাদ দিলে একই ঘটনাকে ভিন্ন দিনের বলে মনে হতে পারে।
অক্টোবর বিপ্লবের নাম অক্টোবর, বার্ষিকী নভেম্বরে—কারণ সময়ের ঘটনাটি একই, তাকে চিহ্নিত করার পঞ্জিকা দুটি। এই সামান্য পার্থক্য বোঝা ইতিহাস পড়ার একটি বড় অভ্যাস শেখায়: শুধু তারিখ মুখস্থ করলে চলে না; সেই তারিখ কোন ব্যবস্থায় লেখা হয়েছিল, সেটিও জানতে হয়।
আপনার মতামত জানানঃ