বাংলাদেশে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বড়। পরিবারগুলো সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠায় ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন, নৈতিক শিক্ষা, শৃঙ্খলাবোধ এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার আশায়। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসায় সন্তানকে হাফেজ বানানোর স্বপ্ন বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সেই বিশ্বাসের জায়গায় যখন শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও নৈতিক ভিত্তি নিয়ে। যে প্রতিষ্ঠানে শিশুরা ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করবে, সেখানেই যদি তাদের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে সেই সংকটকে আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না।
সম্প্রতি বিবিসি বাংলা প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। প্রতিবেদনে স্থানীয় গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্যের বরাতে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কওমি মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে প্রায় দেড় ডজন যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেই অন্তত ১৩ জন ছেলে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব তথ্য অপরাধের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়; বরং প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলোর একটি অংশমাত্র হতে পারে। কারণ, এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে লজ্জা, ভয়, সামাজিক চাপ এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলার ঝুঁকি অনেক ভুক্তভোগীকে নীরব থাকতে বাধ্য করে।
এই নীরবতার পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের সমাজে প্রতিষ্ঠিত কিছু গভীর ধারণা। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা মানেই ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া—এমন ভুল ধারণা অনেকের মধ্যে কাজ করে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও কেউ কেউ বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের পরিবর্তে অভিযোগকারীর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অথচ ধর্মীয় শিক্ষা এবং অপরাধের বিচার দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কোনো ব্যক্তি ধর্মীয় পরিচয় বহন করেন বলে তিনি আইনের ঊর্ধ্বে চলে যেতে পারেন না। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সেই প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও ন্যায়সংগত নয়। প্রয়োজন হলো নির্দিষ্ট অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উঠে আসা এক সাবেক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা এই সমস্যার ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। ছদ্মনামে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি জানান, মাত্র সাত বছর বয়সে কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হন। পরে অন্য একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পরও একই ধরনের নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই অভিজ্ঞতার মানসিক ক্ষত তাঁর জীবন থেকে মুছে যায়নি। এমনকি পরিবারকেও তিনি দীর্ঘদিন বিষয়টি জানাতে পারেননি। এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি শিশুর ওপর সংঘটিত অপরাধের বিবরণ নয়; এটি এমন একটি পরিবেশের দিকেও ইঙ্গিত করে, যেখানে শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও নিরাপদে কথা বলার সুযোগ পায় না।
শৈশবে যৌন নির্যাতন একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। অপরাধের পর শিশুর মধ্যে ভয়, অপরাধবোধ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা, পড়াশোনায় অমনোযোগ কিংবা মানুষের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নিজেকেই ঘটনার জন্য দায়ী ভাবতে শুরু করে। অথচ একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা জরুরি—কোনো শিশু যৌন নির্যাতনের জন্য দায়ী নয়। শিশুর সম্মতি, নীরবতা কিংবা ভয়কে ব্যবহার করে কোনো ধরনের যৌন আচরণকে বৈধতা দেওয়া যায় না। অপরাধের দায় অপরাধীর, শিশুর নয়।
এ ধরনের নির্যাতন প্রকাশ না পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো ক্ষমতার অসমতা। আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের দৈনন্দিন জীবন অনেকাংশে শিক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক এবং অপেক্ষাকৃত বয়স্ক শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কোথায় যাবে, কখন ঘুমাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কীভাবে পড়বে—এসব বিষয়ে তাদের স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে। কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি যখন সেই কর্তৃত্বের অপব্যবহার করেন, তখন শিশুর পক্ষে প্রতিবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে। শাস্তির ভয়, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, বাড়িতে ফেরত পাঠানোর হুমকি কিংবা পরিবারের কাছে অবিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার ভীতি তাকে নীরব রাখতে পারে।
বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা বেশি। কারণ, সেখানে তারা দিনের একটি বড় অংশ নয়, বরং প্রায় পুরো সময় কাটায়। অনেক শিশু পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে অভিভাবকের সাহায্য পাওয়ার সুযোগও সীমিত হতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, তদারকি ব্যবস্থা এবং অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি কার্যকর না হলে ঝুঁকি বাড়ে। তবে আবাসিক ব্যবস্থা নিজেই নির্যাতনের কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। সমস্যা তৈরি হয় যখন আবাসিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দায়িত্ব, ক্ষমতা ও তদারকির মধ্যে ভারসাম্য থাকে না।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নির্যাতনের শিকার কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে অন্যের ওপর নির্যাতন চালাতে পারে। প্রতিবেদনে সাবেক শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে এমন অভিজ্ঞতার কথা এসেছে। তবে এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। শৈশবে নির্যাতনের শিকার হওয়া মানেই কেউ ভবিষ্যতে নির্যাতনকারী হয়ে উঠবে, এমন নয়। অধিকাংশ ভুক্তভোগী অপরাধী হয়ে ওঠেন না। কিন্তু নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, মানসিক আঘাত, সহিংস পরিবেশে বেড়ে ওঠা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকার কারণে কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকর আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তাই শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; ভুক্তভোগীর মানসিক সহায়তা, নিরাপদ পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনও জরুরি।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার সুনাম নষ্ট হবে, শিক্ষার্থী কমে যাবে কিংবা অনুদান বন্ধ হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কা থেকে কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্ত শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়াকেই সমস্যার সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু একজন অভিযুক্তকে অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেওয়া হলে সেখানে নতুন শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আবার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তাই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাউকে সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার দায়িত্ব কি শিশুদের নিরাপত্তার চেয়ে বড় হতে পারে? উত্তর অবশ্যই না। কোনো অভিযোগ সত্য হলে তা গোপন করে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি সাময়িকভাবে রক্ষা করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপরীতে, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান দেখাতে পারে যে তারা অপরাধকে প্রশ্রয় দেয় না। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের কাছে পরিবারগুলো শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, নৈতিক আদর্শেরও প্রত্যাশা করে।
বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসাগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারির সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে সরকারি হিসাবের বরাতে দেশে প্রায় ২৫ হাজার কওমি মাদ্রাসা এবং প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে ঘিরে পরিচালিত একটি শিক্ষাব্যবস্থায় শিশু সুরক্ষার কার্যকর নীতিমালা থাকা অপরিহার্য। কিন্তু বিভিন্ন বোর্ডের অধীনে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর একক ও সমন্বিত তদারকির ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য উঠে এসেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান আবার কোনো বোর্ডের আওতায়ও নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম, পাঠ্যসূচি, পরীক্ষা ও সনদ প্রদানের জন্য বিভিন্ন বোর্ড কাজ করলেও শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কতটা কার্যকর, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কোনো বোর্ডের অধীনে থাকা মানেই একটি প্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য নিরাপদ—এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। একইভাবে বোর্ডের বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শনাক্ত করা এবং তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করাও জরুরি। তবে শুধু নিবন্ধন বা সদস্যপদ প্রদান করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত পরিদর্শন, নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই, অভিযোগ তদন্ত এবং নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরস্পরবিরোধী নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, শিক্ষা যে ধারারই হোক না কেন, প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সাধারণ বিদ্যালয়, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা কিংবা আবাসিক শিক্ষাকেন্দ্র—কোনো প্রতিষ্ঠানই এই দায়িত্বের বাইরে থাকতে পারে না। শিশু সুরক্ষার নীতিমালা, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত তত্ত্বাবধায়ক এবং নিয়মিত নিরীক্ষা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে কওমি মাদ্রাসার কয়েকটি বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের মারধর নিষিদ্ধ করা এবং সুরক্ষা কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বেফাকের একজন প্রতিনিধিও বলেছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ছাত্র সুরক্ষা কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু নির্দেশনা জারি করা আর বাস্তবে তা কার্যকর করা এক বিষয় নয়। প্রশ্ন হলো, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কমিটি সত্যিকার অর্থে কাজ করছে কি না, অভিযোগ পাওয়ার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের রেকর্ড রাখা হচ্ছে কি না এবং ভুক্তভোগী শিশুকে নিরাপদ রাখা হচ্ছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করা যাবে না।
একটি কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থায় অভিযোগ জানানোর একাধিক নিরাপদ পথ থাকা উচিত। শিশু যেন শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছেই অভিযোগ জানাতে বাধ্য না হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ অভিযোগের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকলে অভ্যন্তরীণ তদন্ত পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্বাধীন অভিযোগ গ্রহণব্যবস্থা, অভিভাবকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের বয়স উপযোগী ভাষায় তাদের ব্যক্তিগত সীমারেখা, নিরাপদ ও অনিরাপদ আচরণ এবং সাহায্য চাওয়ার উপায় শেখানো প্রয়োজন।
অভিভাবকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর আগে প্রতিষ্ঠানটির আবাসনব্যবস্থা, শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়কদের পরিচয়, শিশুদের সঙ্গে আচরণ এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া উচিত। সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে এবং তার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে মনোযোগ দিতে হবে। শিশু হঠাৎ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ভয় পেলে, প্রতিষ্ঠানে ফিরতে না চাইলে, অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ হয়ে গেলে কিংবা কোনো ঘটনার কথা ইঙ্গিত করে বললে তাকে বকাঝকা না করে শান্তভাবে কথা শোনা প্রয়োজন। তবে এসব লক্ষণ একাই নির্যাতনের প্রমাণ নয়; প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তান অভিযোগ করলে প্রথমেই তাকে অবিশ্বাস করা বা পরিবারের সম্মানের কথা বলে চুপ করিয়ে দেওয়া যাবে না।
অভিযোগের মুখে থাকা শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করাও অপরিহার্য। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনায় ভুক্তভোগীর নাম, ছবি বা এমন তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুকে সামাজিক অপমান, হয়রানি এবং পুনরায় মানসিক আঘাত থেকে রক্ষা করতে হবে। শিশুর বক্তব্য গ্রহণের সময় প্রশিক্ষিত ব্যক্তির সহায়তা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা এবং আইনগত পরামর্শ নিশ্চিত করা উচিত। বিচারপ্রক্রিয়ায় শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্য অনলাইনে গোপন পরিচয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমন উদ্যোগ নীরবতার দেয়াল ভাঙতে সাহায্য করতে পারে। তবে অনলাইনে অভিযোগ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সব অভিযোগের সত্যতা যাচাই হয়ে যায় না। প্রতিটি অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বক্তব্য দেওয়ার কারণে তাকে হুমকি, সামাজিক চাপ কিংবা প্রতিশোধের মুখোমুখি হতে না হয়।
ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হেফাজতে ইসলামও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তদন্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। এসব বক্তব্যকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করা প্রয়োজন। ধর্মীয় নেতৃত্ব যদি প্রকাশ্যে জানায় যে শিশু নির্যাতন গুরুতর অপরাধ এবং কোনো অপরাধীকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে রক্ষা করা হবে না, তাহলে সামাজিকভাবে অভিযোগকারীদের কথা বলার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, কওমি মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করা মানে ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে আক্রমণ করা নয়। বরং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সৎ শিক্ষক ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা রক্ষা করা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্যই এই আলোচনা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা না করে ন্যায়সংগত তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীর পরিচয় ধর্মীয়, সামাজিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক যা-ই হোক, বিচারপ্রক্রিয়ায় তার প্রভাব পড়া উচিত নয়।
একটি শিশুকে হাফেজ বানানোর স্বপ্ন যেমন মূল্যবান, তেমনি তার নিরাপদ শৈশব, শারীরিক অখণ্ডতা এবং মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় শিক্ষা শিশুকে নৈতিকতা শেখানোর কথা; সেই শিক্ষার পরিবেশেই যদি কোনো শিশু ভয়, অপমান কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। শুধু বিবৃতি, নির্দেশনা কিংবা সাময়িক তদন্ত দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি, নিরপেক্ষ বিচার, অভিযোগকারীর সুরক্ষা, অভিভাবকের সচেতনতা এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাস্তবভিত্তিক শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা।
শিশুদের নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার বিনিময়যোগ্য বিষয় নয়। বরং একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় সেখানে সবচেয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীটি কতটা নিরাপদ, তার অভিযোগ কতটা গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস কতটা রয়েছে—তার মাধ্যমে। ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রাখতে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে, সেই শিক্ষার পরিবেশে কোনো শিশুকে যেন নীরবে নির্যাতন সহ্য করতে না হয়। কারণ শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি মানবিক, সামাজিক এবং নৈতিক কর্তব্য।
আপনার মতামত জানানঃ