
আমরা প্রায়ই বলি, ‘আমি জানি।’ রাজনীতি থেকে ধর্ম, ন্যায়বিচার থেকে ভালো জীবন—প্রায় সব বিষয়েই আমাদের কোনো না কোনো দৃঢ় অবস্থান থাকে। কিন্তু কেউ যদি জানতে চান, ‘আপনি যা জানেন বলে মনে করছেন, সেটি কেন সত্য?’—তখন উত্তর দেওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। মত থাকা আর সেই মতের পক্ষে ভালো কারণ থাকা যে এক নয়, সক্রেটিসের দর্শন এই অস্বস্তিকর পার্থক্যটির সামনে আমাদের দাঁড় করায়।
প্রাচীন এথেন্সের এই দার্শনিকের গুরুত্ব শুধু তাঁর কিছু বিখ্যাত বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সঙ্গে কথোপকথনকে তিনি বিশ্বাস ও জীবনযাপন যাচাইয়ের ক্ষেত্র করে তুলেছিলেন। তাঁর দর্শনের দরজা তাই এমন একটি প্রশ্ন দিয়েও খোলা যায়: আমি যে জীবন বেছে নিচ্ছি, তা নিয়ে সত্যিই ভেবেছি কি?
যে সক্রেটিসকে আমরা পড়ি
সক্রেটিসের জীবনকাল সাধারণভাবে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬৯ থেকে ৩৯৯ ধরা হয়। তিনি নিজে কোনো দর্শনগ্রন্থ লিখে যাননি। তাঁর চিন্তা জানতে হয় প্লেটো, জেনোফন ও অন্যদের রচনার মাধ্যমে। এসব বিবরণের উদ্দেশ্য ও উপস্থাপনা এক নয়। ঐতিহাসিক সক্রেটিস এবং লেখকদের নির্মিত সক্রেটিসকে আলাদা করার সমস্যাটিই গবেষণায় ‘সক্রেটীয় সমস্যা’ নামে পরিচিত।
ফলে প্লেটোর সংলাপে সক্রেটিসের মুখে উচ্চারিত প্রতিটি তত্ত্বকে বিনা প্রশ্নে ঐতিহাসিক সক্রেটিসের নিজস্ব মত বলা যায় না। বিশেষত প্লেটোর পরিণত দর্শনকে তাঁর শিক্ষকের নামে চালানো বিভ্রান্তিকর। এখানে আলোচনা প্রধানত প্লেটোর সংলাপে পাওয়া সক্রেটীয় প্রশ্নপদ্ধতি ও নৈতিক ভাবনাকে কেন্দ্র করে।
না-জানাকে চিনতে পারার জ্ঞান
সক্রেটিসের নামে ‘আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না’ বাক্যটি বহুল প্রচলিত। কিন্তু এটিকে প্লেটোর ‘অ্যাপোলজি’র হুবহু বক্তব্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সেখানে তাঁর অবস্থানের মূল তাৎপর্য হলো: যা জানেন না, তা জানেন বলে মনে না করা।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের জ্ঞানের সীমা মেনে নেওয়া মানে সব জ্ঞান অস্বীকার করা নয়। বরং কোথায় যাচাই প্রয়োজন, সেটি বুঝতে পারা।
আজকের তথ্যপ্রবাহে এই মনোভাবের ব্যবহারিক মূল্য আছে। কোনো খবর বারবার দেখলেই সত্য হয় না; পরিচিত ব্যক্তি বললেই নির্ভরযোগ্য হয় না। আবার নিজের পছন্দের ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য মনে হওয়াও তার প্রমাণ নয়। এগুলো সক্রেটিসের সরাসরি উদাহরণ নয়; তাঁর আত্মপরীক্ষার ভাবনার সমকালীন প্রয়োগ।
নিজেকে প্রশ্ন করা যায়: আমি তথ্যটি জানি, নাকি শুনেছি? এর বিপক্ষে প্রমাণ এলে বিবেচনা করব কি? অন্য পক্ষ একই কথা বললে কি আমার বিচার বদলে যেত?
প্রশ্ন দিয়ে বিশ্বাসের ভিত পরীক্ষা
সক্রেটীয় অনুসন্ধানকে কেবল একের পর এক প্রশ্ন ছোড়া মনে করলে ভুল হবে। এর একটি পরিচিত রূপ হলো ‘এলেংখোস’: কথোপকথনে কোনো দাবিকে বক্তার স্বীকৃত অন্য বিশ্বাসগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করা। অসংগতি ধরা পড়লে প্রথম দাবিটি সংশোধনের প্রয়োজন হয়।
প্লেটোর ‘ইউথিফ্রো’তে আলোচনার বিষয় পবিত্রতা। কোনো কাজ পবিত্র বলেই দেবতারা সেটি ভালোবাসেন, নাকি দেবতারা ভালোবাসেন বলেই সেটি পবিত্র? প্রশ্নটি অনুমোদন এবং অনুমোদনের কারণের মধ্যে পার্থক্য সামনে আনে।
এই পদ্ধতির আধুনিক প্রয়োগ ভাবুন। কেউ বললেন, ‘আমার দল যা করে, সেটিই ন্যায়সংগত।’ তাঁকে জিজ্ঞেস করা যায়, অন্য দল একই কাজ করলে কি তা ন্যায়সংগত হবে? উত্তর বদলে গেলে বোঝা যায়, বিচারটির ভিত্তি হয়তো কাজের প্রকৃতি নয়, পরিচয়।
তবে কারও যুক্তিতে অসংগতি পাওয়া মানেই বিপরীত বক্তব্য সত্য প্রমাণিত হয় না। প্রশ্নকারীও ভুল করতে পারেন। অনুসন্ধানের সততা নির্ভর করে নিজের দাবিকেও একই পরীক্ষায় তোলার ওপর। সক্রেটিসের পদ্ধতিকে অপমান কিংবা তর্কে জেতার কৌশলে নামিয়ে আনলে তার শিক্ষামূল্য কমে যায়।
মানুষ কি জেনেশুনে অন্যায় করে?
সক্রেটীয় নীতিচিন্তার একটি আলোচিত দিক হলো জ্ঞান ও ভালো কাজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ‘প্রোটাগোরাস’ সংলাপে সক্রেটিস এমন অবস্থান তুলে ধরেন যে মানুষ স্বেচ্ছায় মন্দের দিকে যায় না; ভালো-মন্দের বিচারে ভুল তার আচরণকে বিপথে নেয়।
এখানে নৈতিক জ্ঞান বলতে শুধু ‘চুরি খারাপ’ বাক্যটি মুখস্থ থাকা বোঝালে তাঁর বক্তব্য দুর্বল মনে হবে। ভাবনাটি আরও গভীর: নিজের জীবনের প্রকৃত ভালো কী, তা সঠিকভাবে বুঝতে পারা।
ধরা যাক, কেউ প্রতারণায় লাভ করছে। সে তাৎক্ষণিক সুবিধাকে জীবনের ভালো হিসেবে ধরছে, কিন্তু আস্থা, সম্পর্ক ও নিজের নৈতিক অবস্থানের ক্ষতিকে ছোট করছে। সক্রেটীয় প্রশ্ন হবে: লাভটি আদৌ কতটা ভালো?
তবু আপত্তি থেকে যায়। মানুষ অনেক সময় ক্ষতি বুঝেও লোভ, ভয় বা আসক্তির কাছে নতি স্বীকার করে। আবার সামাজিক পরিস্থিতিও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তাই সক্রেটীয় অবস্থানকে মানুষের সব অন্যায়ের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা বলা কঠিন। এর মূল্য হলো নৈতিক শিক্ষায় বোঝাপড়াকে গুরুত্ব দেওয়া; এর সীমা হলো আবেগ, অভ্যাস ও ক্ষমতার ভূমিকা যথেষ্ট ধরা পড়ছে কি না, সেই প্রশ্ন।
অন্যায় সহ্য করার চেয়েও অন্যায় করা কেন খারাপ?
‘গর্গিয়াস’-এ প্লেটোর সক্রেটিস যুক্তি দেন, অন্যায়ের শিকার হওয়ার চেয়েও অন্যায় করা বড় নৈতিক ক্ষতি। এর পেছনে রয়েছে নিজের চরিত্রকে বিকৃত করার আশঙ্কা। ক্ষমতা দিয়ে ইচ্ছেমতো কাজ করতে পারা তাই ভালো জীবনের নিশ্চয়তা নয়।
‘ক্রিটো’তে একই নৈতিক দৃঢ়তার আরেক প্রকাশ দেখা যায়: অন্যায়ের প্রতিশোধে অন্যায় করা গ্রহণযোগ্য নয়।
এ থেকে ভুক্তভোগীকে চুপ করে থাকার নির্দেশ টানা ঠিক হবে না। আজকের আলোচনায় এই নীতির প্রয়োগ হতে পারে—অন্যায়ের প্রতিরোধ ও জবাবদিহির দাবি তুলব, কিন্তু সেই নামে নিরপরাধের ক্ষতি বৈধ করব না। প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা যেন নিজের ন্যায়ের মানদণ্ড ধ্বংস না করে।
এই ভাবনা ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি জনজীবনেও কঠিন পরীক্ষা আনে। নিজের পক্ষের অন্যায়কে ছাড় দিয়ে বিপক্ষের অন্যায়ের বিচার চাইলে নৈতিক অবস্থানটি কতটা টেকে?
বিবেক, আইন ও মৃত্যুদণ্ডের জটিলতা
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ সালে এথেন্সে সক্রেটিসের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড হয়। তরুণদের বিপথগামী করা এবং নগরীর দেবতাদের বিষয়ে ধর্মীয় অভিযোগ ছিল মামলার অংশ। তবে ঘটনাটিকে শুধু ‘প্রশ্ন করায় হত্যা’ বলা ইতিহাসকে অতিসরল করে; তাঁর বিচারকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমিও ছিল।
‘ক্রিটো’তে পালানোর প্রস্তাব বিবেচনার সময় তিনি শুধু বেঁচে থাকার সুবিধা দেখেন না; পালানো ন্যায়সংগত হবে কি না, সেটিও পরীক্ষা করেন। সংলাপে নগরীর আইনের সঙ্গে নাগরিকের দায়ের যুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আবার ‘অ্যাপোলজি’তে তাঁকে অন্যায় আদেশ অমান্যের ঘটনাও বলতে দেখা যায়। ফলে সক্রেটিসকে রাষ্ট্রের সব আদেশ নিঃশর্তভাবে মানার প্রবক্তা বানানো চলে না। এই দুই রচনার সম্পর্ক নিয়ে ব্যাখ্যাগত বিতর্ক আছে।
তাঁর জীবন থেকে যে প্রশ্নটি উঠে আসে, তা সহজ নয়: নিজের সুবিধা, নাগরিক দায় এবং নৈতিক বিচারের মধ্যে বিরোধ হলে কী করব? তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিমত করা যায়; কিন্তু সিদ্ধান্তের কারণ পরীক্ষা করার প্রয়োজন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
আত্মপরীক্ষা কি শুধু নিজের দিকে তাকানো?
‘অ্যাপোলজি’তে আত্মপরীক্ষাহীন জীবন নিয়ে সক্রেটিসের বিখ্যাত মন্তব্য পাওয়া যায়। এর তাৎপর্য প্রতিদিন নিজেকে দোষ দেওয়া নয়; নিজের মূল্যবোধ ও কাজের সম্পর্ক যাচাই করা।
আমি সম্মানের কথা বলি, অথচ দুর্বলকে অপমান করি কি? মতপ্রকাশের অধিকার চাই, কিন্তু ভিন্নমত শুনতে অস্বস্তি হয় কেন? আমি যে সাফল্য চাই, তার জন্য কী ত্যাগ করছি?
এসব প্রশ্নের উত্তর একদিনে শেষ হয় না। আত্মপরীক্ষাকে অতিরিক্ত আত্মদোষারোপে পরিণত করলে তা অসুস্থ চক্রও হতে পারে। প্রয়োজন এমন চিন্তা, যা ভুল শনাক্ত করার পাশাপাশি পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়।
সক্রেটিসের উত্তরাধিকার তাই শুধু সন্দেহ নয়; নিজের বিশ্বাসের দায় নেওয়ার আহ্বানও। আমরা কী ভাবছি, কেন ভাবছি এবং সেই ভাবনা আমাদের কেমন মানুষ করছে—এই সম্পর্কটি পরীক্ষা করা।
প্রজ্ঞার শুরু হয়তো সব উত্তর হাতে পাওয়ায় নয়। শুরু হতে পারে তখন, যখন আমরা নিজের সবচেয়ে প্রিয় উত্তরটিকেও প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাতে রাজি হই।
আপনার মতামত জানানঃ