রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সম্ভাব্য নাশকতা সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ এবং জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে পরিচালিত তৎপরতা শনাক্ত করা—গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে এগুলো অন্যতম। একটি রাষ্ট্রের সরকার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই তথ্য যখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হয়ে ওঠে, বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় কিংবা রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে চলে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে—গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কি তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছে, নাকি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে পড়ছে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই প্রশ্ন নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দল দমন, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর নজরদারি, গুম, গ্রেপ্তার এবং বিরোধী মত নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সেই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করা। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও যদি গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে একই ধরনের বিতর্ক সামনে আসে, তাহলে তা কেবল একটি বক্তব্যের বিতর্ক থাকে না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর প্রকাশিত বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজশাহীর একটি জনসভায় তিনি অভিযোগ করেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী একসঙ্গে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সরকারের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে বলেও তিনি জানান। তাঁর বক্তব্যে সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ এবং দেশের ভেতরে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির প্রচেষ্টার কথাও উঠে আসে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, এটি কেবল দুটি রাজনৈতিক পক্ষের সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে অভিযোগ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার, সেই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সরকারপ্রধানের প্রকাশ্য বক্তব্যের মাধ্যমে তা রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে আসার প্রশ্ন। অভিযোগটি সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই সেটি রাজনৈতিক বিতর্কের প্রধান উপাদান হয়ে উঠলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বোঝা জরুরি। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধ প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। গোয়েন্দা সংস্থা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য পেতে পারে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হতে পারে, সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করা যেতে পারে কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক করা যেতে পারে। কিন্তু গোয়েন্দা তথ্য সব সময় আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের সমতুল্য নয়। তথ্যের উৎস, নির্ভরযোগ্যতা, প্রেক্ষাপট এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে অর্থ নিয়ে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ গুরুতর। এমন অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকলে সংশ্লিষ্ট অর্থের উৎস, লেনদেনের পথ, অর্থ গ্রহণকারী ব্যক্তি এবং অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে তদন্ত হওয়া উচিত। একইভাবে শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে পরিকল্পিত নাশকতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু শ্রমিকদের প্রকৃত বেতনসংক্রান্ত দাবি, কর্মপরিবেশের সমস্যা কিংবা মালিকপক্ষের সঙ্গে বিরোধকে যথাযথ তদন্ত ছাড়া রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। শ্রমিক অসন্তোষ এবং পরিকল্পিত নাশকতা এক বিষয় নয়; দুটির মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে প্রমাণের প্রয়োজন।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বক্তব্যেও এই পার্থক্যের গুরুত্ব উঠে এসেছে। তাঁদের বক্তব্যের সারকথা হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করা এবং পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে থেকে তথ্য সংগ্রহ করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবরের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারপ্রধান যখন প্রকাশ্যে গোয়েন্দা তথ্যের উৎসের বিষয়টি সামনে আনেন, তখন সংশ্লিষ্ট সংস্থার ভবিষ্যৎ কার্যক্রমও জটিলতার মুখে পড়তে পারে।
এই উদ্বেগের একটি বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার কাজের বড় অংশই তথ্যের গোপনীয়তা, উৎসের নিরাপত্তা এবং বিশ্লেষণের নিরপেক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। সংস্থার সংগৃহীত তথ্য যদি নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক বক্তৃতায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে তথ্য সংগ্রহকারী ব্যক্তি, তথ্যদাতা কিংবা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের পেশাগত মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সরকারপ্রধান গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জনসাধারণকে সতর্ক করতে পারবেন না। জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি, সহিংসতার পরিকল্পনা কিংবা বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা থাকলে জনগণকে অবহিত করা সরকারের দায়িত্বের অংশ হতে পারে। প্রশ্ন হলো, কী ধরনের তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে, কতটুকু প্রকাশ করা হচ্ছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জনসাধারণকে নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক করা আর কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রকাশ্যে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা এক বিষয় নয়।
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিরোধী দলের অবস্থান। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর জামায়াতে ইসলামী অভিযোগ করেছে, সরকার নিজের ব্যর্থতা ও অপকর্মের দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। দলটির নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন তৎপরতা সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য থাকলে সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহও প্রশ্ন তুলেছেন, একজন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করে বিরোধী দলের ওপর নজরদারির বিষয়টি প্রকাশ্যে বলতে পারেন কি না।
বিরোধী দলের এসব বক্তব্যও রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ। তাই সেগুলোকেও প্রমাণিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। একইভাবে সরকারপ্রধানের বক্তব্যের ভিত্তিতেও কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য ধরে নেওয়া যায় না। উভয় পক্ষের বক্তব্য যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক অভিযোগের নিষ্পত্তি জনসভা, সংবাদ সম্মেলন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য দিয়ে নয়; বরং প্রমাণ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা এই বিতর্ককে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী দলগুলোর ওপর নজরদারি এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের নেতাকর্মীরা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের অভিযোগ করে আসছিলেন। এসব অভিযোগের বিভিন্ন দিক নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন, সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনা হয়েছে। তবে প্রতিটি নির্দিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে ঘটনা, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
একটি সরকার পরিবর্তিত হওয়ার অর্থ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া নয়। কোনো সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে যদি রাজনৈতিক নির্দেশনা, অনানুষ্ঠানিক প্রভাব কিংবা জবাবদিহির ঘাটতির মধ্যে কাজ করে থাকে, তাহলে শুধু নেতৃত্ব বদলের মাধ্যমে সেই সমস্যা দূর হয় না। প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দায়িত্বের সুস্পষ্ট সীমা, পেশাগত মানদণ্ড এবং স্বাধীন তদারকির ব্যবস্থা। অন্যথায় রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারের ধরনও পাল্টাতে পারে, কিন্তু দলীয় প্রভাবের কাঠামো অক্ষুণ্ন থেকে যেতে পারে।
এখানে এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের মতো সংস্থার দায়িত্ব এবং কার্যক্রমের পরিধিও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু কোন সংস্থা কোন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করবে, কীভাবে সেই তথ্য যাচাই করবে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে তার এখতিয়ার কতটুকু—এসব বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ যদি কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে তার আইনগত ভিত্তি ও প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হওয়া উচিত। শুধু বিরোধী মত প্রকাশ কিংবা সরকারের সমালোচনা করার কারণে কোনো ব্যক্তি বা দলকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
গোয়েন্দা সংস্থার নিরপেক্ষতা রক্ষার জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্যও প্রয়োজন। একদিকে সংস্থাগুলোকে সরকারের বৈধ নির্দেশনার অধীনে কাজ করতে হবে, অন্যদিকে তাদের পেশাগত মূল্যায়ন যেন দলীয় স্বার্থের কাছে পরাজিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। গোয়েন্দা তথ্যের অপব্যবহার হলে তার তদন্তের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে সংস্থার গোপনীয়তা রক্ষার অজুহাতে অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহার আড়াল করার সুযোগও থাকা উচিত নয়।
এ ক্ষেত্রে সংসদীয় তদারকি, প্রাসঙ্গিক আইন ও বিধির আধুনিকায়ন, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা এবং অভিযোগ যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গোয়েন্দা কার্যক্রমের সব তথ্য প্রকাশ্যে আনা সম্ভব নয়, কারণ তাতে জাতীয় নিরাপত্তা ও তথ্যের উৎস ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কিন্তু গোপনীয়তা বজায় রেখেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গোপনীয়তা এবং জবাবদিহি পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং পরস্পরকে পরিপূরক করে।
আরেকটি বিষয় হলো, রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিটি ঘটনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা এড়িয়ে চলা। কোনো দেশে শ্রমিক আন্দোলন, রাজনৈতিক বিক্ষোভ কিংবা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দেখা দিলে তার পেছনে বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে। আবার এসব পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সহিংসতা বা নাশকতার চেষ্টা করার ঘটনাও অসম্ভব নয়। তাই সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব হলো সম্ভাব্য দুই দিকই বিবেচনায় নেওয়া। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত না করে আগেভাগে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা যেমন কঠিন হয়, তেমনি নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন।
তারেক রহমানের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কের নিষ্পত্তি তাই শুধু আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে কথিত যোগাযোগের অভিযোগ যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, সরকারের রাজনৈতিক বক্তব্যের দায়িত্বশীলতা এবং বিরোধী দলের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ থাকলে তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসা উচিত। প্রমাণ না থাকলে রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে সন্দেহকে প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত করা উচিত নয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে পারবে? গোয়েন্দা সংস্থা কি জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করবে, নাকি ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কেন্দ্রে থেকে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একক বক্তৃতা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। উত্তর নির্ভর করবে সরকারের বাস্তব পদক্ষেপ, তদন্তের স্বচ্ছতা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির ওপর।
গণতন্ত্রে সরকার পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য সেটিই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যেগুলো সরকারের অধীনে থেকেও দলীয় স্বার্থের যন্ত্রে পরিণত হবে না। গোয়েন্দা সংস্থার কাজ হওয়া উচিত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা করা, কোনো দলের রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করা নয়। একইভাবে বিরোধী দলেরও দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তথ্যভিত্তিক অবস্থান নেওয়া এবং নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য জবাবদিহি করা।
শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দা সংস্থার নিরপেক্ষতা কোনো বিশেষ দলের স্বার্থের প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থার প্রশ্ন। যে রাষ্ট্রে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধের তদন্ত হয়, সেখানে আইনের শাসন শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু যে রাষ্ট্রে গোয়েন্দা তথ্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার উপকরণে পরিণত হয়, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ, আইনসম্মত ও জবাবদিহিমূলক হচ্ছে। ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠাই হতে পারে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রকৃত পরীক্ষা।
আপনার মতামত জানানঃ