
পাথরের কফিনের গায়ে একজনের নাম, ভেতরে শুয়ে আছেন অন্য যুগের মানুষ। ঢাকনার ওপর খোদাই করা ক্রুশ আবার জানাচ্ছে আরও একটি গল্প। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবির একটি সমাধির সামনে দাঁড়ালে যেন সময়কে এক রেখায় সাজানো কঠিন হয়ে পড়ে। রোমান ব্রিটেন, অ্যাংলো-স্যাক্সন মঠ এবং আধুনিক গবেষণাগার একই বস্তুর মধ্যে এসে মিলেছে।
২১ অক্টোবর অ্যাবির প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, তাদের পরামর্শক প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ওয়ারউইক রডওয়েলের গবেষণা কফিনটির মধ্যযুগীয় ব্যবহার সম্পর্কে নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছে। ভেতরের দেহাবশেষ সম্ভবত একজন উচ্চপদস্থ ধর্মযাজকের। কিন্তু তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হয়ে গেছে, এমন দাবি করার সময় এখনো আসেনি। দুইজন অ্যাবট বা মঠপ্রধান সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন।
এই আবিষ্কারের আকর্ষণ শুধু অজ্ঞাত মানুষের নাম খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনায় নয়। একটি বস্তু তার প্রথম ব্যবহারের পরে কীভাবে নতুন অর্থ পায় এবং পরবর্তী যুগের মানুষ পুরোনো ইতিহাসের ওপর নিজের চিহ্ন রেখে যায়—সমাধিটি সেই প্রশ্নও সামনে আনে।
পাথরের নাম আর ভেতরের মানুষ
চুনাপাথরের সারকোফ্যাগাসটি ১৮৬৯ সালে অ্যাবির নর্থ গ্রিন এলাকায় খনন করে তোলা হয়। এর গায়ে ভ্যালেরিয়াস আমানডিনাসের স্মৃতিতে লাতিন লেখা রয়েছে। অ্যাবির বিবরণে তাঁকে আনুমানিক ৩০০–৪০০ খ্রিষ্টাব্দের একজন বিত্তবান ব্রিটন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকনার বড় ক্রুশটি দশম বা একাদশ শতাব্দীর—অর্থাৎ পাত্র ও পরবর্তী অলংকরণ একই সময়ের নয়।
এই অসামঞ্জস্যই অনুসন্ধানের সূচনা। কোনো কফিনে নাম লেখা থাকলে সাধারণভাবে ধরে নেওয়া সহজ, ভেতরের মানুষটিও তিনিই। কিন্তু পুনর্ব্যবহৃত সমাধিতে সেই অনুমান ভুল হতে পারে।
লেখাটি যাঁর স্মরণে তৈরি, তাঁর পরিচয়ের সূত্র হতে পারে; পরবর্তী দাফনের মানুষের পরিচয় তার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় না। পাথর, খোদাই এবং দেহাবশেষকে তাই আলাদা প্রমাণ হিসেবে পরীক্ষা করতে হয়।
লাইভ সায়েন্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংরক্ষণকাজের সময় কফিন খুলে ভেতরে কঙ্কাল পাওয়া যাওয়ার পর নতুন বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়। হাড়গুলো আগের হস্তক্ষেপে এলোমেলো হয়েছিল; খুলিতেও পরবর্তী ক্ষতির চিহ্ন ছিল। এমন অবস্থায় প্রতিটি চিহ্নকে জীবদ্দশার ঘটনা মনে করলে ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে।
বস্তুটির ইতিহাস তাই শুধু রোমান ও মধ্যযুগীয় ব্যবহারে শেষ নয়। আবিষ্কার, সরানো, পরীক্ষা এবং সংরক্ষণের সময়কার কাজও আজ গবেষকের সামনে থাকা প্রমাণকে বদলে দিয়েছে।
হাড়ের বয়স কী জানাল
অ্যাবির প্রকাশনা অনুযায়ী, মানবদেহের হাড় বিশ্লেষণকারী জেমস ইয়ং ল্যাংথর্ন মৃত ব্যক্তির বয়স আনুমানিক ৩৫–৪৯ বছর এবং উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি নির্ধারণ করেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর মূল্যায়নের সঙ্গে এই হিসাবের পার্থক্য আছে। হাড়ের একটি নমুনার রেডিওকার্বন পরীক্ষায় সময়কাল এসেছে ৯৮৭–১০৫২ খ্রিষ্টাব্দ।
এতে বোঝা যায়, ভেতরের মানুষটি রোমান যুগের নন। তাঁর দেহাবশেষ মধ্যযুগের শেষ অ্যাংলো-স্যাক্সন পর্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাথরের কফিন পুরোনো, কিন্তু তার ভেতরে পরবর্তী সময়ে দাফন করা হয়েছে।
রেডিওকার্বন পরীক্ষা অবশ্য কোনো ব্যক্তির নাম বলে দেয় না। জীবিত অবস্থায় প্রাণী ও উদ্ভিদ পরিবেশ থেকে কার্বন গ্রহণ করে। মৃত্যুর পর তেজস্ক্রিয় কার্বনের পরিমাণ ক্ষয়ের মাধ্যমে কমতে থাকে। সেই পরিমাপ এবং পরিচিত বয়সের নমুনার সঙ্গে তুলনা করে সম্ভাব্য ক্যালেন্ডার সময় নির্ধারণ করা হয়।
ফলে ৯৮৭–১০৫২ মানে নির্দিষ্ট একটি মৃত্যুসাল পাওয়া নয়। এটি পরীক্ষার ফল হিসেবে জানানো সময়সীমা। একজন ব্যক্তির মৃত্যুর ঐতিহাসিক তারিখ এই সীমার মধ্যে পড়লেই পরিচয় প্রমাণিত হয় না; অন্য প্রমাণও মিলতে হবে।
এই সতর্কতা গবেষণাকে দুর্বল করে না। বরং কোন প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান দিয়েছে এবং কোন প্রশ্ন এখনো খোলা, তা বোঝায়।
কেন একজন মঠপ্রধানের কথা ভাবছেন গবেষক
রডওয়েলের ব্যাখ্যায় দাফনের মর্যাদা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। অ্যাবির বিবরণ অনুযায়ী, একটি কাঠের কফিন পাথরের সারকোফ্যাগাসের ভেতরে রাখা হয়েছিল এবং ঢাকনায় বড় ক্রুশ খোদাই করা হয়। এমন ব্যবস্থাকে একজন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তির দাফনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে।
প্রত্নতত্ত্বে এ ধরনের যুক্তি কয়েকটি সূত্র একত্র করার ওপর নির্ভর করে। সমাধির ধরন, সময়কাল, ধর্মীয় চিহ্ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস পাশাপাশি বসাতে হয়। একটি সূত্র একা সিদ্ধান্ত দেয় না; কয়েকটি সূত্র একই দিকে ইঙ্গিত করলে ব্যাখ্যাটি শক্তিশালী হয়।
এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য নাম দুটি হলো অ্যাবট এলফউইগ, যিনি আনুমানিক ১০২০ সালে মারা যান, এবং তাঁর উত্তরসূরি উলফনথ, যিনি ১০৪৯ সালে মারা যান। রডওয়েল এলফউইগকে তুলনামূলকভাবে সম্ভাব্য মনে করছেন, কারণ মঠপ্রধান হওয়ার আগেই তাঁর ওয়েস্টমিনস্টারের সঙ্গে যোগ ছিল। তবে এটি সম্ভাবনার মূল্যায়ন, চূড়ান্ত শনাক্তকরণ নয়।
দুজনের জন্মতারিখ নিশ্চিত নয়। দায়িত্ব গ্রহণের সম্ভাব্য বয়সের মতো অনুমানও আলোচনায় আছে। তাই একটি নামকে নিশ্চিত ফল হিসেবে শিরোনামে বসালে গবেষণার শর্তগুলো হারিয়ে যাবে।
পুরোনো কফিন কেন নতুন করে ব্যবহার করা হলো?
এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। পুরোনো পাথরের পাত্রটি নতুন সমাধিতে ব্যবহৃত হয়েছে—প্রমাণ সেই সিদ্ধান্ত সমর্থন করে। কিন্তু কেন সেটিই বেছে নেওয়া হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য আলাদা অনুসন্ধানের বিষয়।
আজকের দৃষ্টিতে পুনর্ব্যবহার শুনলে খরচ বাঁচানোর কথা মনে হতে পারে। ঐতিহাসিক কোনো ব্যবহারে উপকরণের মূল্য, সহজলভ্যতা, মর্যাদা বা অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক—একাধিক বিবেচনা কাজ করতে পারে। তবে এই নির্দিষ্ট কফিনে কোন কারণ প্রধান ছিল, জানা প্রমাণ থেকে তা নিশ্চিত বলা যায় না।
ঢাকনায় নতুন ক্রুশ যোগ করা অন্তত দেখায়, বস্তুটিকে অপরিবর্তিত অবস্থায় গ্রহণ করা হয়নি। পরবর্তী ব্যবহারকারীরা তার ওপর নিজের ধর্মীয় চিহ্ন বসিয়েছেন। পুরোনো পাথর টিকে থেকেছে, কিন্তু তার ব্যবহার ও দৃশ্যমান অর্থ বদলেছে।
মূল রোমান অধিবাসীর দেহাবশেষ কোথায় গেল, কফিনটি প্রথমে কোথায় রাখা ছিল এবং কী পথে ওয়েস্টমিনস্টারে পৌঁছাল—এসব প্রশ্নও রয়ে গেছে। নাম খোদাই আছে বলেই একটি বস্তুর সম্পূর্ণ যাত্রাপথ উদ্ধার করা যায় না।
যে ভবনটিও বহুবার বদলেছে
ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবির ইতিহাস নিজেই এই স্তরবিন্যাস বোঝায়। অ্যাবির স্থাপত্যবিষয়ক বিবরণ অনুযায়ী, বর্তমান গথিক ভবনের বড় অংশ ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তৃতীয় হেনরির পুনর্নির্মাণের সময়কার। ১২৪৫ সালে একাদশ শতাব্দীর গির্জার পূর্বাংশ ভাঙার কাজ শুরু হয়। আগের ভবনের কিছু অংশ এখনো রয়ে গেছে।
অর্থাৎ আজ যে ভবনের সঙ্গে কফিনটিকে দেখা হয়, সেই ভবনও অপরিবর্তিত কোনো পটভূমি নয়। তার নিচে ও ভেতরে আগের স্থাপত্যের ইতিহাস আছে।
রডওয়েল ধারণা করেছেন, তৃতীয় হেনরির নির্মাণকাজের সময় পুনর্ব্যবহৃত সমাধিটি সরিয়ে আবার কবর দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। এটি সমাধির পরবর্তী অবস্থান ব্যাখ্যার একটি প্রস্তাবিত দৃশ্যপট; সরাসরি প্রত্যক্ষ করা ঘটনা হিসেবে লেখা উচিত নয়।
একটি সমাধি তাই কোথায় পাওয়া গেছে এবং কোথায় প্রথম ব্যবহার হয়েছিল—দুটি আলাদা প্রশ্ন। বস্তুটি যদি স্থানান্তরিত হয়, আবিষ্কারের জায়গাই তার জন্মস্থান বা প্রথম দাফনের স্থান হয়ে থাকে না।
রহস্যের সমাধান কতটা হলো?
এই অনুসন্ধানে সবচেয়ে শক্তিশালী পরিবর্তন হলো সময়ের স্তরগুলোকে আলাদা করা। রোমান কফিন, পরবর্তী খ্রিষ্টীয় খোদাই এবং মধ্যযুগীয় দেহাবশেষ একই তারিখের নয়। তাদের একসঙ্গে পড়লে পুনর্ব্যবহারের ইতিহাস সামনে আসে।
অন্যদিকে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামের প্রশ্ন এখনো সম্ভাবনার স্তরে আছে। এই পার্থক্যটি বজায় রাখলেই আবিষ্কারের গুরুত্ব বোঝা যায়। ইতিহাসে নতুন জ্ঞান মানে সব সময় সব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নয়; কখনো একটি ভুল অনুমান বাদ দেওয়া এবং ভালো প্রশ্নে পৌঁছানোও বড় অগ্রগতি।
অ্যাবির তথ্য অনুযায়ী, সারকোফ্যাগাসটি এখন কুইন্স ডায়মন্ড জুবিলি গ্যালারিজে প্রদর্শিত হচ্ছে। সেখানে দর্শক একটি পাথরের পাত্র দেখেন। কিন্তু তার ব্যাখ্যার সঙ্গে পরিচিত হলে দৃশ্যটি বদলে যায়: পাত্রটি একজনের স্মৃতি ধারণ করে, পরে আরেকজনের সমাধি হয়, তারপর গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে।
এই দীর্ঘ যাত্রায় অনুপস্থিত জিনিসও গুরুত্বপূর্ণ। কাঠ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, দেহাবশেষের অবস্থান বদলাতে পারে, নথি অসম্পূর্ণ থাকতে পারে। তবু অবশিষ্ট চিহ্নগুলোকে যত্ন করে মিলিয়ে দেখলে এমন সম্পর্ক ধরা পড়ে, যা একসময় দেখা যায়নি।
‘রোমান কফিনে মধ্যযুগের মানুষ’ তাই শুধু বিস্ময়ের শিরোনাম নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের বস্তুগুলো এক যুগে তৈরি হলেও বহু যুগে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী মানুষ আগের পৃথিবীকে পুরো মুছে ফেলেন না; কখনো তার ওপর নতুন চিহ্ন রেখে যান।
ওয়েস্টমিনস্টারের এই সমাধিতে সেই চিহ্নগুলো পাশাপাশি টিকে আছে। পাথরের নাম এক মানুষের স্মৃতি, ক্রুশ আরেক সময়ের বিশ্বাস, আর হাড় এমন এক জীবনের সাক্ষ্য যার পরিচয় আমরা এখনো পুরো জানি না। একটি সমাধি বহু যুগের ইতিহাস ধরে রাখে—কারণ তার নিজেরও একটি দীর্ঘ জীবন থাকে।
আপনার মতামত জানানঃ