
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং অনেকটাই অপ্রত্যাশিত যে রাজনৈতিক পরিবর্তনটি ঘটেছে, তা হলো গত দেড় বছরে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি জনসমর্থনের দ্রুত বৃদ্ধি। এই উত্থান এতটাই নাটকীয় যে সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে যদিও ফেব্রুয়ারি ১২–এর নির্বাচনে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে দেখা যাচ্ছে, তবুও কিছু বিশ্লেষকের মতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটও শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হতে পারে।
এই পরিবর্তনের ব্যাপকতা খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের শেষ কয়েক বছরে জামায়াত এতটাই প্রান্তিক ও দমনমূলক অবস্থার মধ্যে ছিল যে দলটি কার্যত একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে স্বাভাবিকভাবে কাজই করতে পারেনি।
তাদের বহু শীর্ষ নেতা কারাবন্দি ছিলেন এবং দলটি প্রায় গোপন অবস্থায় কার্যক্রম চালাতে বাধ্য হয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবে জামায়াত কখনোই একটি গণভিত্তিক নির্বাচনী শক্তি ছিল না। এরশাদের পতনের পর অনুষ্ঠিত একাধিক নির্বাচনে দলটির ভোটের হার কখনোই ১২ শতাংশ ছাড়ায়নি, যার সর্বোচ্চ ছিল ১৯৯১ সাল। এর পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নেওয়া শক্তির সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগের কারণে স্বাধীনতার পর থেকেই দলটির ওপর একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কলঙ্ক বিদ্যমান ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের বর্তমান গতি অত্যন্ত লক্ষণীয়। দলটিকে সমর্থনের আহ্বান না জানিয়েও এবং জামায়াত সম্পর্কে বিদ্যমান সমালোচনাগুলো অস্বীকার না করেও প্রশ্ন ওঠে—এই দ্রুত উত্থানের কারণ কী? নিচে কোনো নির্দিষ্ট ক্রম না মেনে এমন আটটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরা হলো।
১৯৭১–এর কলঙ্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়া
জামায়াত পুরোপুরি তার অতীত থেকে মুক্ত হয়নি। এখনো কখনো কখনো দলটিকে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোও বিষয়টি সামনে আনে। তবে এটাও সত্য যে ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা এখন আর জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে অযোগ্য প্রমাণ করার মতো শক্তিশালী ইস্যু নয়।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, যেসব জামায়াত নেতা ১৯৭১–এর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন, তারা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন, ফলে বর্তমান নেতৃত্ব সরাসরি সেই সময়ের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের পতনের ফলে তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বয়ানও দুর্বল হয়েছে, যার একটি বড় অংশ ছিল জামায়াতের যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি বারবার সামনে আনা। তৃতীয়ত, তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে ১৯৭১ একটি দূরের ইতিহাস, যা তাদের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্বেগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়।
বিএনপির তুলনায় জামায়াতের স্বচ্ছতার ভাবমূর্তি
জামায়াতের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা কারণ হলো দুর্নীতি থেকে তাদের দূরত্বের ধারণা। হাসিনা সরকারের পতনের পর অনেক মানুষ আশা করেছিলেন যে স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হবে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর দেখা যায়, আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ চক্রগুলোর জায়গা দ্রুত দখল করে নেয় বিএনপি–সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী।
এই প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন প্রত্যাশী ভোটারদের একটি অংশের কাছে বিএনপি আর আলাদা কিছু মনে হয়নি। বিপরীতে জামায়াতের বিরুদ্ধে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত চাঁদাবাজি বা দুর্নীতির তেমন অভিযোগ ওঠেনি। অনেকের চোখে এটি একটি কাঠামোগত পার্থক্যের ইঙ্গিত দেয়। বিএনপির অনেক কর্মী ক্ষমতায় গেলে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার আশায় রাজনীতি করেন বলে ধারণা করা হয়, আর জামায়াতের কর্মীরা বরং দলের জন্য অর্থ ব্যয় করেন। এই পার্থক্য হতাশ ভোটারদের কাছে শক্তিশালীভাবে প্রভাব ফেলেছে।
কল্যাণমূলক রাজনীতি
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বহু পরিবার নিহত স্বজন হারিয়েছে এবং হাজারো মানুষ আহতদের চিকিৎসায় ব্যস্ত ছিল। জামায়াত সংগঠিতভাবে এসব পরিবারকে চিহ্নিত করে সহায়তায় এগিয়ে আসে। নিহতদের পরিবারকে অন্তত এক লাখ টাকা করে দেওয়া হয় এবং আহতদের হাসপাতালেও আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়।
যদিও বিএনপির কিছু নেতা ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করেছেন, তা জামায়াতের মতো সমন্বিত ও ব্যাপক ছিল না। এতে জামায়াত একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে পেরেছে, যারা বাস্তব সহায়তায় বিশ্বাস করে। এ ধরনের দৃশ্যমান কল্যাণমূলক রাজনীতি জামায়াতের দীর্ঘদিনের কৌশল এবং এটি এখনো রাজনৈতিক সমর্থন তৈরিতে কার্যকর।
সংগঠনিক শৃঙ্খলা
আওয়ামী লীগের পতনের পরপরই জামায়াত নির্বাচন প্রস্তুতিতে নেমে পড়ে। তাদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রচারণায় রূপ নেয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলার কৌশল তারা গুরুত্ব দেয়, যা বড় সমাবেশ বা মিডিয়া–নির্ভর প্রচারণার চেয়ে অনেক সময় বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপন্থী ও নমনীয় অবস্থান তুলে ধরা
জামায়াত একটি ইসলামপন্থী দল এবং দীর্ঘমেয়াদে ইসলামী আইন চালুর লক্ষ্য তাদের রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দলটি সচেতনভাবে একটি মধ্যপন্থী ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ধর্মীয় এজেন্ডার পরিবর্তে তারা দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ, জবাবদিহি এবং সুশাসনের মতো বিষয়কে সামনে আনছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দলীয় নীতিসম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমানের দেওয়া বক্তৃতা ছিল এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। সেখানে ধর্মীয় বিষয় একেবারেই উল্লেখ না করে জামায়াতকে ‘মূলধারার মুসলিম গণতন্ত্রী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই কৌশল বিশেষ করে শহুরে ও তরুণ ভোটারদের কাছে দলটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ না নেওয়া
আন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। আগে আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিতেন এমন অনেক ভোটার এখন জামায়াতকে সমর্থন দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি জামায়াতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
ভারতবিরোধী মনোভাব
আওয়ামী লীগ আমলে সীমান্ত হত্যা, ভারতীয় রাজনীতিকদের বক্তব্য এবং দিল্লির সঙ্গে সরকারের ঘনিষ্ঠতার কারণে ভারতবিরোধী মনোভাব বেড়ে যায়। ২০২৪ সালে হাসিনার ভারত গমনের পর এই অনুভূতি আরও প্রকাশ্য হয়। এই পরিস্থিতিতে জামায়াতকে অনেকেই ভারতের প্রভাব মোকাবিলায় বিএনপির চেয়ে বেশি দৃঢ় শক্তি হিসেবে দেখছে।
পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে জামায়াত
আওয়ামী লীগের পতনের পর জনগণের মধ্যে পুরোনো রাজনীতি থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তুলনা করলে অনেক ভোটারের কাছে জামায়াতই পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়। দলটি ক্ষমতার উত্তরাধিকারী রাজনীতির বাইরে এবং তাদের শাসনের অতীত অভিজ্ঞতা নেই, যা তাদের নতুন বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
এ ছাড়া জুলাই জাতীয় সনদের সংস্কার প্রস্তাবের প্রতি জামায়াতের ইতিবাচক অবস্থান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে জোটও তাদের সংস্কারপন্থী ভাবমূর্তি আরও জোরালো করেছে।
আপনার মতামত জানানঃ