নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে কিছু মৌলিক প্রশ্ন—রাষ্ট্রের চরিত্র কী হবে, রাজনীতির ভিত্তি কোথায় দাঁড়াবে, এবং ধর্ম ও ক্ষমতার সম্পর্ক কোন পথে যাবে। এই প্রশ্নগুলোর কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামি শরিয়াহ কায়েমের বিষয়টি। দীর্ঘদিন ধরে দলটি তার রাজনীতিকে “আল্লাহর আইন চাই” স্লোগানের সঙ্গে যুক্ত করে আসলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই অবস্থান নিয়ে এক ধরনের দ্ব্যর্থতা বা কৌশলগত অস্পষ্টতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা রাজনৈতিক ও নৈতিক—উভয় দিক থেকেই বড় এক সংকট তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষা হিসেবে ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাম্বিগিউইটি’ বহুল পরিচিত। কোনো রাষ্ট্র বা শক্তি যখন ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট না করে, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন বার্তা দেয়, তখন সেটিকে এই পরিভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়। তাইওয়ান প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ। ঠিক একই ধরনের কৌশলগত অস্পষ্টতা এখন জামায়াতে ইসলামীর শরিয়াহ প্রশ্নে দেখা যাচ্ছে। শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই আলোচনা শুরু হয়েছিল—ক্ষমতায় গেলে জামায়াত কি ইসলামি শরিয়াহ কায়েম করবে, নাকি করবে না। নির্বাচন যত সামনে আসছে, এই প্রশ্ন ততই জোরালো হচ্ছে।
সম্প্রতি এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মকর্তার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনের অডিও রেকর্ডের ভিত্তিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মহল জামায়াতের ভবিষ্যৎ ভূমিকা ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন। এর আগেও বিষয়টি আলোচনায় আসে, যখন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের একটি প্রতিনিধিদল জামায়াত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং পরে জানায় যে ক্ষমতায় গেলে জামায়াত শরিয়াহ আইন কায়েম করবে না। এই বক্তব্যের সূত্র ধরেই জামায়াতের জোটসঙ্গী ইসলামী আন্দোলন দলটি জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে শরিয়াহ কায়েমে জামায়াতের অনীহাকে সামনে আনে।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই বিষয়ে জামায়াতের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট, একক ও প্রকাশ্য অবস্থান পাওয়া যায়নি। দলের দু–একজন শীর্ষ নেতা ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন। কোথাও বলা হচ্ছে শরিয়াহ কায়েম করা হবে না, আবার অন্যত্র দলটির নেতারা প্রকাশ্যে টিভি টক শোতে বা মাঠপর্যায়ের বক্তব্যে শরিয়াহ কায়েমের কথা বলছেন। এমনকি মধ্য ও নিম্নপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা প্রচারণায় দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়াকে ‘ইমানি দায়িত্ব’ কিংবা ‘বেহেশতের টিকিট’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এই দ্বিমুখী বার্তাই জামায়াতের রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।
এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন দলটির গঠনতন্ত্রের দিকে তাকানো হয়। জামায়াতে ইসলামীকে কেবল একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখলে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, কারণ এর গঠনতন্ত্র পড়লে সেটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় সংগঠনের কাঠামো বলেই মনে হয়। দলটির স্থায়ী কর্মপন্থার শুরুতেই বলা আছে—যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশই হবে চূড়ান্ত মানদণ্ড। সদস্য হওয়ার শর্ত হিসেবে ব্যক্তিগত জীবনে ফরজ ও ওয়াজিব পালনের কথা বলা হয়েছে এবং কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এমনকি আমিরের কর্তব্যের ক্ষেত্রেও আল্লাহ ও রাসুলের আদেশ পালনকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে।
এই কাঠামোর ভেতরে একটি মৌলিক বাস্তবতা হলো—জামায়াতের কেন্দ্রীয় সদস্য বা ‘রুকন’ হওয়ার জন্য একজন পারফর্মিং মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক। কোনো অমুসলিম ব্যক্তি এই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসতে পারেন না, এমনকি আমির হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যদিও অমুসলিমদের জন্য ‘সহযোগী সদস্য’ নামে একটি শ্রেণি রাখা হয়েছে, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের সব সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম পরিচালিত হয় রুকনদের মাধ্যমে। ফলে বাস্তবে অমুসলিমদের অংশগ্রহণ প্রতীকী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ।
এই বাস্তবতার সঙ্গে যদি দলের সাম্প্রতিক বক্তব্য—“ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ কায়েম করা হবে না”—তুলনা করা হয়, তাহলে একটি বড় ধরনের সাংঘর্ষিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রশ্ন জাগে, যে দলের আদর্শিক ভিত্তি ইসলামি বিধান ও শরিয়াহকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, সেই দল কীভাবে জনগণের সামনে ভিন্ন বার্তা দেয়? আবার যদি দলটি সত্যিই শরিয়াহ কায়েম না করার সিদ্ধান্তে পৌঁছে থাকে, তাহলে তাদের নাম, স্লোগান ও গঠনতন্ত্র—সবকিছুই নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
রাজনৈতিকভাবে জামায়াতে ইসলামী একটি কঠিন দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে। একদিকে তাদের ঐতিহ্যগত সমর্থকগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ দলটিকে সমর্থন করে ইসলামি শরিয়াহ কায়েমের প্রত্যাশায়। অন্যদিকে ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রবেশ করতে গেলে এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে গেলে এই শরিয়াহ-রাজনীতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে—এ বিষয়টি দলটির নেতৃত্ব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। এ কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাত্রশিবির তাদের ইশতেহার থেকে ‘ইসলাম’ শব্দটি সরিয়ে ‘ওয়েলফেয়ার’ বা কল্যাণমূলক রাজনীতির কথা বলছে।
কিন্তু রাজনীতিতে কৌশল থাকা আর জনগণের সঙ্গে অস্পষ্টতা বজায় রাখা এক বিষয় নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটারদের অধিকার আছে জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কোনো দল যদি তার মূল আদর্শিক অবস্থানই স্পষ্ট না করে, তাহলে জনগণ কীভাবে ‘ইনফর্মড ডিসিশন’ নেবে? বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল আর জামায়াতের মতো একটি আদর্শিক দলের ক্ষমতায় আসার প্রশ্ন এক নয়। এখানে রাষ্ট্রের চরিত্র, সংবিধান এবং নাগরিক অধিকারের মতো মৌলিক বিষয় জড়িত।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। দলটির আমিরকে জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে বলতে হবে—ক্ষমতায় গেলে তারা ইসলামি শরিয়াহ কায়েম করবেন কি না। যদি করেন, তাহলে সেই শরিয়াহর রূপরেখা কী হবে, তা পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে হবে। কারণ ইসলামি শরিয়াহ কী—এই প্রশ্নেই মুসলিম সমাজের ভেতরে গভীর মতভেদ রয়েছে। অনেক খ্যাতনামা ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেম জামায়াতের ব্যাখ্যাকে ইসলামের একমাত্র বা চূড়ান্ত রূপ বলে মানতে নারাজ।
আর যদি জামায়াত সত্যিই শরিয়াহ কায়েম না করার পথে এগোয়, তাহলে আরেকটি গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে—তারা কি তাহলে ‘ইসলাম’ শব্দটি ব্যবহার করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে না? এমনকি তাদের বর্তমান গঠনতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের অধীনে রাজনীতি করার জন্য আদৌ উপযোগী কি না, সেই প্রশ্নও তখন অবধারিতভাবে সামনে আসে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে এই দ্ব্যর্থতা ধরে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ‘সৎ লোকের শাসন চাই’—এই স্লোগানের সঙ্গে যদি আদর্শিক অস্পষ্টতা ও পরস্পরবিরোধী বার্তা যুক্ত হয়, তাহলে তা রাজনৈতিক দ্বিচারিতারই নামান্তর। ধর্মীয় পরিভাষায় যাকে বলা হয় মোনাফেকি। জামায়াতে ইসলামী যদি সত্যিই নিজেদের একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে তাদের এই ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাম্বিগিউইটি’ থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।
বাংলাদেশের ভোটাররা এখন আর শুধু আবেগ বা স্লোগানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চান না। তারা জানতে চান—কোন দল কী রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়, কীভাবে সংবিধানের সঙ্গে তাদের রাজনীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, এবং ক্ষমতায় গেলে নাগরিক জীবনে তার প্রভাব কী পড়বে। এই প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব জামায়াতেরই। অন্যথায়, শরিয়াহ ও ইসলাম প্রশ্নে এই সংকট দলটির জন্য শুধু আদর্শিক নয়, অস্তিত্বগত সংকট হিসেবেই থেকে যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ