বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতীকী সিদ্ধান্ত বরাবরই বাস্তবতার চেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয়। খুলনা–১ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যখন একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রার্থী হিসেবে কৃষ্ণ নন্দীকে মনোনয়ন দেয়, তখন সেটিও ঠিক তেমনই একটি প্রতীকী ঘটনা হয়ে ওঠে। ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন প্রার্থী দাঁড় করানো নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। কিন্তু এই চমকের আড়ালে যে প্রশ্নটি ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে, তা হলো—এই সিদ্ধান্ত কি জামায়াতের দীর্ঘদিনের আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়?
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে আত্মপরিচয় নির্মাণ করেছে ইসলামকে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। দলটির ঘোষণাপত্র, রাজনৈতিক ভাষ্য এবং অতীত কর্মকাণ্ডে বারবার উঠে এসেছে শরিয়াভিত্তিক সমাজব্যবস্থার ধারণা, ইসলামী মূল্যবোধের প্রাধান্য এবং ধর্মীয় নৈতিকতার আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা। এই আদর্শিক কাঠামোর ভেতরে ‘ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিনিধিত্ব’ বা সংখ্যালঘু পরিচয়ের রাজনীতি বরাবরই প্রান্তিক ছিল। ফলে হঠাৎ করে একজন হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া শুধু কৌশলগত নয়, বরং আদর্শিক দিক থেকেও এক ধরনের বিচ্যুতি বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
জামায়াতের সমর্থকেরা বলছেন, এটি দলের ‘উদারতা’ ও ‘সমন্বয়বাদী রাজনীতি’র প্রমাণ। তাদের যুক্তি, ইসলামী রাজনীতি মানেই অন্য ধর্মাবলম্বীদের排除 করা নয়; বরং ন্যায়বিচার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই উদারতার ধারণা কি দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে ধারাবাহিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে? নাকি এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট আসনের ভোটের অঙ্ক মেলানোর প্রয়াস?
খুলনা–১ আসনের সামাজিক বাস্তবতা এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি বড় কারণ। দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে হিন্দু ভোটারদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি। স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে বহুবার হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রার্থীরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, বেশিরভাগ সময়ই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর মনোনয়নে। আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে মাঠে না থাকায় সেই ভোটব্যাংক কোথায় যাবে—এই প্রশ্ন থেকেই জামায়াতের এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত এসেছে বলে অনেকের ধারণা। কিন্তু ভোটের অঙ্ক কষতে গিয়ে আদর্শের সঙ্গে আপস করা কি জামায়াতের রাজনীতির জন্য নতুন কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে না?
বাস্তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র সেই ‘উদারতা’র বয়ানকে খুব একটা সমর্থন করে না। স্থানীয় ভোটারদের বক্তব্যে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে পানির সংকট, বেকারত্ব, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, জলাবদ্ধতা এবং আইনশৃঙ্খলার মতো মৌলিক সমস্যা। দাকোপ অঞ্চলে সুপেয় পানির অভাব মানুষের নিত্যসঙ্গী। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, আর গ্রীষ্মকালে লবণাক্ত নদীর পানির কারণে কিনে পানি খাওয়া—এটাই এখানকার বাস্তবতা। এই প্রেক্ষাপটে ভোটারদের প্রশ্ন খুব সরল: কে এই সমস্যার সমাধান করবে?
এই বাস্তবতায় কৃষ্ণ নন্দীর ধর্মীয় পরিচয় অনেক ভোটারের কাছেই গৌণ। তারা দেখছেন তিনি কতটা স্থানীয়, কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। এখানেই জামায়াতের সিদ্ধান্তের আরেকটি দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়। আদর্শিকভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের কথা বলা একটি দল, বাস্তবে ভোট চাইছে উন্নয়ন ও স্থানীয় সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে—যা মূলত ধর্মনিরপেক্ষ উন্নয়ন রাজনীতির ভাষা। এই ভাষা জামায়াতের ঐতিহ্যগত বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বরাবরই বিতর্কিত। ১৯৭১ সালের ভূমিকা থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিযোগ—সব মিলিয়ে দলটির প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে একজন হিন্দু প্রার্থী দাঁড় করানো কি সত্যিই সেই আস্থার সংকট দূর করতে পারবে, নাকি এটি কেবল ‘ফেস ভ্যালু’ বাড়ানোর কৌশল হিসেবেই থেকে যাবে?
জামায়াত প্রার্থী হিসেবে কৃষ্ণ নন্দী দাবি করছেন, নির্বাচিত হলে তিনি সংসদে গিয়ে ‘আড়াই কোটি হিন্দুর পক্ষে কথা বলবেন’। এই বক্তব্যও একটি মৌলিক দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। একজন সংসদ সদস্য কি প্রথমে একজন নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধি, নাকি পুরো এলাকার নাগরিকদের প্রতিনিধি? জামায়াতের আদর্শিক রাজনীতিতে যেখানে ‘উম্মাহ’ বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সমাজ কল্পনা করা হয়, সেখানে একজন প্রার্থী যখন নিজেকে বিশেষভাবে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেন, তখন সেটি দলীয় দর্শনের সঙ্গে খাপ খায় কি না—সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
এদিকে নির্বাচনী মাঠে জামায়াত একা নয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) খুলনার সবগুলো আসনেই জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। বিএনপি নেতারা সরাসরি কৃষ্ণ নন্দীর ‘বহিরাগত’ পরিচয় তুলে ধরে প্রশ্ন তুলছেন তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। ফলে জামায়াতের কৌশলগত চালটি শুধু আদর্শিক দ্বন্দ্বেই আটকে নেই, এটি বাস্তব রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায়ও চ্যালেঞ্জের মুখে।
সব মিলিয়ে খুলনা–১ আসনে জামায়াতের হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন একটি বহুমাত্রিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এটি একদিকে সংখ্যালঘু অন্তর্ভুক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, অন্যদিকে দলটির ঘোষিত ইসলামী আদর্শের সঙ্গে স্পষ্ট সাংঘর্ষিক এক বাস্তবতা তুলে ধরে। ভোটের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে আদর্শিক সীমারেখা ঝাপসা হলে জামায়াতের রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে কোন পথে যাবে—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত রেখে যাবে। এটি দেখাবে, আদর্শভিত্তিক রাজনীতি কতটা নমনীয় হতে পারে এবং সেই নমনীয়তার মূল্য কতখানি। কৃষ্ণ নন্দীর প্রার্থিতা হয়তো একটি আসনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে, কিন্তু এর মাধ্যমে যে আদর্শিক প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো জামায়াতে ইসলামী ও বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরের জন্য অনেক দিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ