ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৬টির বেসরকারি ফল ঘোষণা হয়েছে। ঘোষিত ফল অনুযায়ী, বিএনপি ও তাদের জোটের প্রার্থীরা ২১৩টি আসনে জয় পেয়েছেন। এর ফলে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পথ সুগম হয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকারের নেতৃত্ব দেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টা ৩০ মিনিটের ভোটগণনা শেষে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা ফল ঘোষণা করেন। ঘোষিত ফলাফলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭৪টি আসন। অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ৯টি আসনে।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে কাজী জাফর আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালের পর থেকে নারী নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সরকার প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন।
নির্বাচনে জয় উদযাপন উপলক্ষে কোনো ধরনের বিজয় মিছিল না করার নির্দেশনা দিয়েছে বিএনপি। দলের প্রেস উইং জানিয়েছে, নিরঙ্কুশ বিজয়ের জন্য বাদজুমা সারা দেশে শুকরিয়া আদায় ও বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।
বেশি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ফলে সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নেই বললেই চলে। কিন্তু এবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে অন্য এক প্রশ্ন—সংসদ নেই, স্পিকার নেই; তাহলে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন? আর শপথের পর সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াই বা কীভাবে এগোবে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বহুবার দেখেছে দেশ। তবে এবারের প্রেক্ষাপট আলাদা। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সংসদ ভেঙে গেছে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ কার্যত শূন্য। এমন পরিস্থিতিতে নতুন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের সাংবিধানিক কৌতূহল।
সংবিধান বলছে, নির্বাচনের ফলাফল ‘সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত’ হওয়ার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ করতে হবে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নির্বাচন কমিশন ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে ধরা হয় না। ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশিত হতে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে। সেই গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকেই গণনা শুরু হবে তিন দিনের সময়সীমা।
এই পুরো প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক ভিত্তি রয়েছে সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে। সেখানে বলা হয়েছে, নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পড়ানোর জন্য সংবিধানের অধীন নির্দিষ্ট ব্যক্তি থাকবেন। প্রচলিতভাবে এই দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। কিন্তু স্পিকার না থাকলে? সংবিধান এখানেই বিকল্প পথের কথা বলেছে।
প্রথম বিকল্প—রাষ্ট্রপতি শপথ পড়ানোর জন্য কাউকে মনোনীত করতে পারেন। অর্থাৎ, তিনি এমন একজন ব্যক্তিকে নির্ধারণ করতে পারেন, যিনি নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পড়াবেন। দ্বিতীয় বিকল্প—যদি রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি নির্ধারিত তিন দিনের মধ্যে শপথ পড়াতে ব্যর্থ হন বা না পড়ান, তাহলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই শপথ পড়াবেন, যেন তিনিই সংবিধানের অধীনে নির্দিষ্ট ব্যক্তি।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বর্তমানে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। সাংবিধানিকভাবে তিনিই হবেন সেই ব্যক্তি, যিনি সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করবেন এবং প্রয়োজনে শপথের জন্য কাউকে মনোনীত করবেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, সরকার দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর চায়। তার ভাষায়, রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি—উদাহরণ হিসেবে প্রধান বিচারপতির নামও আলোচনায় এসেছে—শপথ পড়াতে পারেন। আর যদি সেটি সম্ভব না হয়, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াবেন। তবে সেক্ষেত্রে তিন দিনের অপেক্ষা অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে, যা সরকার এড়িয়ে যেতে আগ্রহী।
প্রশ্ন হলো, শপথের পর কী? শপথই কি শেষ ধাপ? আসলে শপথ হলো নতুন সংসদের যাত্রার সূচনা। শপথের মধ্য দিয়েই একজন নির্বাচিত ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংবিধান স্পষ্ট বলছে—যে ক্ষেত্রে কার্যভার গ্রহণের আগে শপথ আবশ্যক, সেখানে শপথ গ্রহণের অব্যবহিত পরই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে গণ্য হবেন।
অর্থাৎ, শপথের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সংসদ সদস্যরা কার্যত দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে যাবেন। এরপর শুরু হবে সরকার গঠনের পরবর্তী ধাপ।
সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবেন, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। এখানে রাষ্ট্রপতির বিবেচনা মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। যদি কোনো দল এককভাবে ১৫১ বা তার বেশি আসন পায়, তাহলে সেই দলের সংসদীয় নেতা হবেন সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্থাভাজন ব্যক্তি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বেসরকারি ফলাফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল হিসেবে বিএনপি সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে থেকে যিনি সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হবেন, তাকেই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হওয়া একই ব্যক্তির মধ্যেই মিলিত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নির্বাচিত নেতা সংসদে দলের নেতৃত্ব দেবেন এবং রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। প্রধানমন্ত্রী শপথ নেয়ার পর মন্ত্রিসভা গঠন করবেন এবং মন্ত্রীদেরও রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে শপথ গ্রহণ করানো হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় আগের সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর কার্যত সম্পন্ন হয় নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ, ক্ষমতা হস্তান্তর কোনো একক ঘোষণার বিষয় নয়; এটি একটি ধারাবাহিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া।
এবারের বাস্তবতায় সবচেয়ে আলোচিত অংশটি হচ্ছে—স্পিকার না থাকা সত্ত্বেও শপথের ব্যবস্থা কীভাবে হবে। অতীতে আমরা দেখেছি, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগে স্পিকার শপথ পড়িয়েছেন। কিন্তু এবার যেহেতু সংসদ ভেঙে গেছে এবং আগের স্পিকার দায়িত্বে নেই, তাই সংবিধানের বিকল্প ব্যবস্থাই কার্যকর হবে।
এখানে সংবিধানের নমনীয়তাই আসলে রাষ্ট্রকে সংকট থেকে বের করে আনে। সংবিধান এমনভাবে প্রণীত যে, কোনো নির্দিষ্ট পদ শূন্য থাকলেও রাষ্ট্রের কার্যক্রম থেমে থাকবে না। রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন অথবা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ—দুই পথই খোলা রাখা হয়েছে, যাতে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকাও এখানে তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচন পরিচালনা থেকে শুরু করে ফলাফল গেজেট প্রকাশ—সবকিছুই তার অধীনে সম্পন্ন হয়। প্রয়োজনে শপথ পড়ানোর দায়িত্বও তার কাঁধে বর্তাতে পারে। এতে করে নির্বাচন-পরবর্তী অচলাবস্থা এড়ানো সম্ভব হয়।
রাজনৈতিকভাবে এই সময়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। নির্বাচনের পরপরই দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিক্রিয়া আসছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ইঙ্গিত স্পষ্ট হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহল থেকেও অভিনন্দন বার্তা এসেছে। তবে সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সরকার গঠন সম্পূর্ণ হয় না।
গেজেট প্রকাশ, শপথ গ্রহণ, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, মন্ত্রিসভার শপথ—প্রতিটি ধাপ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। এর যেকোনো একটিতে বিলম্ব হলে পুরো প্রক্রিয়াই পিছিয়ে যেতে পারে। তবে আইন উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ধাপগুলো সম্পন্ন করতে চায়।
সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি হয়তো খুব জটিল মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি সুসংহত সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ। নির্বাচন মানে শুধু ভোট দেওয়া নয়; বরং ভোটের ফলকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে স্থাপন করার একটি নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে।
এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হয়। সংসদ না থাকলেও, স্পিকার না থাকলেও, রাষ্ট্রের চাকা থেমে থাকে না। সংবিধান বিকল্প পথ দেখায়, দায়িত্ব ভাগ করে দেয় এবং সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়।
অবশেষে, যখন নতুন প্রধানমন্ত্রী শপথ নেবেন এবং মন্ত্রিসভা দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তখনই আগের সরকারের অধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে। নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়ে।
তাই “সংসদ নেই, স্পিকার নেই; শপথ কে পড়াবেন?”—এই প্রশ্নের উত্তর আসলে সংবিধানের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি অথবা প্রয়োজনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার—দু’জনের একজন শপথ পড়াবেন। এরপর রাষ্ট্রপতির আহ্বানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী হবেন। শপথের সঙ্গে সঙ্গেই কার্যভার গ্রহণ সম্পন্ন হবে।
একটি নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা নয়; এটি সাংবিধানিক যাত্রারও নতুন অধ্যায়। আর সেই যাত্রায়, ব্যক্তি নয়—প্রাধান্য পায় প্রক্রিয়া।
আপনার মতামত জানানঃ