লক্ষ্মীপুরের শান্ত শহর হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত স্পর্শকাতর বস্তু ঘিরে—‘ভোটের সিল’। যে সিলটি একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে মৌলিক প্রতীক, সেই সিল যখন অবৈধভাবে প্রস্তুত ও সংরক্ষণের অভিযোগে পুলিশের হাতে জব্দ হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে শুধু একটি অপরাধ নয়, পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে লক্ষ্মীপুর সদর থানার অভিযানে জব্দ হওয়া এই সিল এবং এর সঙ্গে জড়িতদের পরিচয় ঘটনাটিকে আরও বেশি রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব দিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্যমতে, জাল ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে এসব সিল প্রস্তুত করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় জামায়াত নেতা সৌরভ হোসেন শরীফ ও ব্যবসায়ী সোহেল রানার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও সৌরভ হোসেন শরীফ ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সৌরভ হোসেন শরীফ শুধু একজন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী নন, তিনি ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি এবং একটি ছাপাখানার মালিক। ফলে এই ঘটনা আর নিছক অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি সরাসরি রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও দলীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদ পারভেজ মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তদন্ত এখনো চলমান এবং অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মনির হোসেন বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া সোহেল রানাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে, তবে এখনো রিমান্ড আবেদন করা হয়নি। অপর আসামিকে ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের এই বক্তব্যে একদিকে যেমন আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতির কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি ইঙ্গিত মিলছে—ঘটনার গভীরতা হয়তো এখানেই শেষ নয়।
এই ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য লক্ষ্মীপুরের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় চোখ রাখা জরুরি। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিটি দল যখন নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ব্যস্ত, তখন ভোট কারচুপি বা জালিয়াতির অভিযোগ রাজনৈতিক উত্তাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এই ঘটনার পরপরই সংবাদ সম্মেলন করে সরাসরি জামায়াতকে দায়ী করেন। তাঁর অভিযোগ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে জাল ভোট ও ষড়যন্ত্রের অংশ। এই বক্তব্যে রাজনৈতিক সংঘাত আরও প্রকাশ্য রূপ নেয়।
এরপর পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া সোহেল রানার সঙ্গে জামায়াতের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মামলার অপর আসামি সৌরভ হোসেন শরীফকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে জামায়াত চেষ্টা করেছে নিজেদের দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করতে এবং দায় থেকে দূরে থাকতে। জেলা জামায়াতের আমির এস ইউ এম রুহুল আমিন ভূঁইয়াও জানান, সিল জব্দের পরপরই শরীফকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং দ্রুত প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—কেবল বহিষ্কার করলেই কি দায় শেষ হয়ে যায়? স্থানীয় রাজনীতিতে যাঁরা সক্রিয়, তাঁদের অনেকেই বলছেন, নির্বাচনী অপরাধ শুধু ব্যক্তির নয়, এটি একটি ব্যবস্থাগত সমস্যার প্রতিফলন। অবৈধ সিল তৈরি করার মতো সাহস কেউ হঠাৎ করে পায় না; এর পেছনে থাকে রাজনৈতিক আশ্রয়, নীরব সমর্থন বা অন্তত একটি ধারণা যে ধরা পড়লেও বড় ধরনের পরিণতি হবে না। এই ধারণাটাই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।
ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সিল তৈরির স্থান। পুলিশ জানিয়েছে, সৌরভ হোসেন শরীফ হাসপাতাল রোডে অবস্থিত ‘আধুনিক অফসেট অ্যান্ড ডিজিটাল সাইন’-এর মালিক। অর্থাৎ, এটি কোনো গোপন ঘর বা অস্থায়ী জায়গা নয়; একটি প্রকাশ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই এসব সিল প্রস্তুত করা হচ্ছিল। এতে বোঝা যায়, অভিযুক্তরা কতটা নির্ভার ছিলেন বা কতটা স্বাভাবিক বলে মনে করেছিলেন এই কাজকে। এটি সমাজে আইনের ভয় কমে যাওয়ার একটি ইঙ্গিতও বটে।
লক্ষ্মীপুরের সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াও লক্ষণীয়। অনেকেই বলছেন, ভোট তাদের শেষ আশ্রয়, যেখানে তারা অন্তত নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন। সেই ভোট যদি আগেই জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে একটি অন্তর্বর্তী বা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে এমন ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব বহুদূর পর্যন্ত যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়; এটি জাতীয় রাজনীতির একটি প্রতিচ্ছবি। অতীতে বাংলাদেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবারই এসব অভিযোগ যখন সামনে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে—কেন বারবার একই চক্র, একই কৌশল ফিরে আসে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে শক্তিশালী জবাবদিহির অভাবে। যদি প্রতিটি ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যেত, তাহলে হয়তো এ ধরনের ঘটনা কমত।
এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। দ্রুত অভিযান চালিয়ে সিল জব্দ করা এবং মামলা দায়ের করা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু তদন্ত কতটা গভীরে যাবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। শুধুমাত্র দুজন ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে দায় শেষ করা হলে মানুষের আস্থা ফিরবে না। বরং প্রয়োজন, পুরো নেটওয়ার্কটি উন্মোচন করা—কে নির্দেশ দিয়েছে, কারা জানত, কারা চোখ বন্ধ করে ছিল।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়াও ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। বিএনপি যেখানে ঘটনাটিকে জামায়াতের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে জামায়াত বলছে এটি ব্যক্তিগত অপরাধ। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে সত্য উদঘাটনের দায়িত্ব পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের ওপর। যদি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হয়, তাহলে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির বাইরে গিয়ে সত্যটি সামনে আসতে পারে।
সবশেষে, লক্ষ্মীপুরের এই ‘ভোটের সিল’ কাণ্ড আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন দিয়ে টিকে থাকে না, টিকে থাকে বিশ্বাস দিয়ে। সেই বিশ্বাস যখন বারবার আঘাত পায়, তখন ক্ষত শুধু একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। এই ঘটনার পরিণতি কী হবে, তা সময়ই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, লক্ষ্মীপুরের এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—আমরা কি সত্যিই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি, নাকি একই পুরোনো চক্রের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি?
আপনার মতামত জানানঃ