যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত ধনকুবের ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে প্রকাশিত নতুন বিপুল নথি আবারও বিশ্বরাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন তুলেছে। প্রায় ৩০ লাখের বেশি নথি, লাখো ছবি ও হাজারের কাছাকাছি ভিডিও প্রকাশের পর একে একে উঠে আসছে প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেতা, ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের নাম। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম সামনে আসার পর এবার আলোচনায় যুক্ত হলো বাংলাদেশের সাবেক ও বর্তমানে পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম। যদিও নথিতে সরাসরি শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে যে পরিচয় দেওয়া হয়েছে, তাতে সন্দেহের খুব একটা অবকাশ থাকছে না।
নতুন প্রকাশিত নথিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এপস্টেইনের টিমের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পর্যায়ের যোগাযোগের ইঙ্গিত রয়েছে। ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে পাঠানো একটি ইমেইলে এপস্টেইনের দীর্ঘদিনের নারী সহকারী লেসলি গ্রোফ উল্লেখ করেন, কোনো একটি বিষয়ে তার টিমের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছেন। ইমেইলের বিষয়বস্তুতে কী নিয়ে এই সমঝোতা বা সম্মতি—সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে ইমেইলের শিরোনাম ছিল ‘জেফরি এপস্টেইন’, যা থেকেই বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা যায়। এই অস্পষ্টতা এবং নীরবতাই প্রশ্নকে আরও ঘনীভূত করেছে।
এই প্রকাশনার সময়টাও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শেখ হাসিনা বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্কিত এক চরিত্র, যিনি ক্ষমতা হারিয়ে দেশত্যাগ করেছেন এবং বিভিন্ন মামলায় দণ্ডিত অবস্থায় বিদেশে অবস্থান করছেন। এমন এক প্রেক্ষাপটে এপস্টেইনের নথিতে ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে তার সরকারের সময়কার যোগাযোগের ইঙ্গিত নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তুলছে—এই যোগাযোগের প্রকৃতি কী ছিল, এর পেছনে উদ্দেশ্যই বা কী।
এপস্টেইন কেবল একজন যৌন অপরাধী হিসেবেই কুখ্যাত নন; বরং তিনি ছিলেন ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাবের এক জটিল নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু। নিউইয়র্কভিত্তিক এই ধনী আর্থিক বিনিয়োগকারী দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিক, রাজপরিবারের সদস্য, ব্যবসায়ী ও সেলিব্রিটিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তার ব্যক্তিগত দ্বীপ, বিলাসবহুল বাড়ি ও ব্যক্তিগত বিমান ঘিরে বহু বছর ধরে চলেছে ভয়ংকর অপরাধচক্র—যেখানে নাবালিকাদের যৌন নির্যাতন, মানব পাচার ও শোষণের অভিযোগ উঠেছে।
২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় এক নাবালিকা কিশোরীর সঙ্গে যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেও এপস্টেইন একটি অত্যন্ত বিতর্কিত চুক্তির মাধ্যমে মাত্র ১৩ মাসের হালকা সাজা ভোগ করেন। পরে জানা যায়, এই চুক্তিটি বিচার বিভাগ ও স্থানীয় প্রসিকিউশনের অস্বাভাবিক ছাড়ের ফল, যা তাকে আরও বহু গুরুতর অভিযোগ থেকে রক্ষা করেছিল। এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। ক্ষমতাবান ও ধনীদের জন্য কি আইনের মানদণ্ড আলাদা—সে বিতর্ক তখন থেকেই জোরালো হয়।
২০১৯ সালে নিউইয়র্কে আবারও এপস্টেইনের বিরুদ্ধে নাবালিকাদের যৌন পাচারের অভিযোগে বড় ধরনের মামলা হয়। এফবিআই ও ফেডারেল প্রসিকিউটররা তদন্তে জানান, তিনি বহু বছর ধরে ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরীদের বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিজের বাড়ি ও ব্যক্তিগত বিমানে এনে নির্যাতন করতেন। এই অপরাধচক্র টিকে ছিল মূলত তার প্রভাবশালী যোগাযোগের জোরে। রাজনীতিক ও ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন আইন ও গণমাধ্যমের চোখ ফাঁকি দিয়েছেন—এমনটাই উঠে আসে তদন্তে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঘিরে প্রকাশিত একটি ইমেইল আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচিত হয়। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, ওই ইমেইলে এপস্টেইন দাবি করেন, মোদি তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতে ইসরায়েলে সফর করেন। ইমেইলে এমনকি ‘নাচ-গান’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে বিষয়টিকে উপস্থাপন করা হয় এবং বলা হয়, এই কৌশল ‘কাজ করেছিল’। যদিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবিকে ‘ভিত্তিহীন ও নোংরা কল্পনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে, তবু এই ইমেইল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
মজার বিষয় হলো, ২০১৭ সালে মোদি সত্যিই ইসরায়েল সফর করেছিলেন—যা ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ইসরায়েল সফর। এর কয়েক সপ্তাহ আগেই তিনি ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই সময়কালগত মিল এপস্টেইনের দাবিকে আরও বিতর্কিত করে তোলে, যদিও সরাসরি কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই একই নথিতে ভারতের ধনকুবের ব্যবসায়ী অনিল আম্বানির নামও উঠে আসে। দাবি করা হয়, মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে আম্বানি এপস্টেইনের সহায়তা চেয়েছিলেন। এসব তথ্য একত্রে ইঙ্গিত দেয়, এপস্টেইন কেবল ব্যক্তিগত অপরাধেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রভাবশালী স্তরেও কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে যে পরিচয় এসেছে, তা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গভীর তাৎপর্য বহন করে। বিশেষ করে যখন দেশটি দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ছিল। এপস্টেইনের মতো একজন অপরাধীর নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের শীর্ষ নির্বাহী ক্ষমতার প্রতিনিধিত্বকারী কারও যোগাযোগের ইঙ্গিত দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তবে এটাও সত্য, এপস্টেইনের নথিতে নাম থাকা মানেই অপরাধে জড়িত থাকা—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই এসব নথিতে রয়েছে দাবি, মন্তব্য কিংবা ব্যক্তিগত ইমেইল, যার সত্যতা যাচাই করা কঠিন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে, এপস্টেইন দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে নিজের অবস্থান জাহির করতেন। কোনটা বাস্তব যোগাযোগ, আর কোনটা নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর কৌশল—সেই সীমারেখা এখনও অস্পষ্ট।
এপস্টেইনের মৃত্যুও রহস্যে ঘেরা। ২০১৯ সালের আগস্টে নিউইয়র্কের কারাগারে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মেডিকেল পরীক্ষায় এটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও, কারাগারের নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি, নজরদারি ক্যামেরা বিকল থাকা এবং প্রহরীদের দায়িত্বে অবহেলার মতো অসঙ্গতির কারণে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এপস্টেইনের মৃত্যু ছিল এমন এক অধ্যায়ের ইতি, যা খুলে দিতে পারত বহু ক্ষমতাবানের অন্ধকার দিক।
তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ঘিষলেইন ম্যাক্সওয়েল ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হন এবং ২০২১ সালে নাবালিকাদের যৌন পাচারসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। বর্তমানে তিনি ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ম্যাক্সওয়েলের বিচার চলাকালীনও উঠে আসে বহু প্রভাবশালীর নাম, যা এখনও পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি।
সব মিলিয়ে এপস্টেইন ফাইল শুধু একজন অপরাধীর কাহিনি নয়; এটি ক্ষমতা, রাজনীতি, অর্থ ও নৈতিকতার এক ভয়াবহ সংঘাতের দলিল। মোদি ও শেখ হাসিনার নাম ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনাও সেই বৃহত্তর চিত্রেরই অংশ। এসব নথি যত প্রকাশ পাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—বিশ্বরাজনীতির আড়ালে এমন এক অন্ধকার জগৎ আছে, যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে নৈতিকতার সংঘর্ষ প্রায়শই নীরবতায় চাপা পড়ে যায়। প্রশ্ন থেকে যায়, এই প্রকাশনা কি আদৌ সেই নীরবতা ভাঙতে পারবে, নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটিও অন্য অনেক কেলেঙ্কারির মতো ধামাচাপা পড়ে
আপনার মতামত জানানঃ