ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। একসময়ের নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর আগ্রহ—এই বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যে দলটি আন্তর্জাতিক মহলের একটি অংশের কাছে সন্দেহের চোখে দেখা হতো, সেই দলটির সঙ্গে এখন ওয়াশিংটনের ‘বন্ধুত্ব’ চাওয়ার বার্তা নানা প্রশ্ন, বিশ্লেষণ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী বারবার নিষিদ্ধ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে, ছাত্র বিক্ষোভে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে, দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর আগে বিভিন্ন সময় দলটির রাজনৈতিক অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কারণে তারা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখে পড়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা কখনো স্থির থাকে না। ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন আসে। একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশ নির্বাচনমুখী হয়, এবং সেই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান অনেকের কাছেই বিস্ময়কর নয়।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা বাংলাদেশে পুনরুত্থিত ইসলামপন্থি রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে দেখা যায়, ঢাকায় নিযুক্ত এক মার্কিন কূটনীতিক নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বলেন, বাংলাদেশ ‘ইসলামিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে’। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী আগের চেয়ে ভালো ফল করবে এবং স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।”
এই বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহ্যগতভাবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেয় বলে দাবি করে। অথচ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে শরিয়াহভিত্তিক শাসনের ধারণা, সামাজিকভাবে রক্ষণশীল নীতি এবং নারীদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কিত অবস্থানের জন্য পরিচিত। দলটি একসময় প্রকাশ্যে বলেছে, নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে তাদের ‘সন্তান পালনের দায়িত্বে’ আরও বেশি সময় দেওয়ার পক্ষে তারা। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দলটি তাদের অবস্থান কিছুটা নরম করেছে বলে দাবি করছে এবং দুর্নীতিবিরোধী রাজনীতি, সুশাসন ও জবাবদিহির ওপর জোর দিচ্ছে।
মার্কিন কূটনীতিকের মন্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এমন ‘লিভারেজ’ রয়েছে, যা প্রয়োজনে তারা ব্যবহার করবে। এমনকি জামায়াত যদি উদ্বেগজনক পথে এগোয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র পরদিনই শতভাগ শুল্ক আরোপের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন কথাও তিনি উল্লেখ করেন। এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, ওয়াশিংটন জামায়াতকে পুরোপুরি বিশ্বাস করলেও, তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল হাতে রাখতে চায়।
তবে ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কিছুটা ভিন্ন সুরে কথা বলেছে। দূতাবাসের মুখপাত্র বলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে ওই আলোচনা ছিল নিয়মিত ও অনানুষ্ঠানিক, এবং সেখানে অনেক রাজনৈতিক দল নিয়েই কথা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো একটি দলকে অন্য দলের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয় না; বরং জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যে কোনো সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে তারা প্রস্তুত। এই বক্তব্য কূটনৈতিক ভাষায় ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা হলেও, ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে যে অডিও উদ্ধৃতি এসেছে, তা পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ রাখেনি।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া এসেছে। দলের মার্কিন মুখপাত্র বলেছেন, একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকে করা মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে চান না। তবে একই সঙ্গে দলটি জোর দিয়ে বলছে, তারা এখন দুর্নীতিবিরোধী, স্বচ্ছতা ও সুশাসনের রাজনীতি করছে এবং শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাবও নাকি এখনো ‘প্রাথমিক পর্যায়ে’ রয়েছে।
এই ঘটনাপ্রবাহ শুধু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়; এতে ভারত, পাকিস্তান ও বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণও জড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন ফাটল তৈরি করতে পারে। ভারতের দৃষ্টিতে জামায়াত দীর্ঘদিন ধরেই একটি উদ্বেগের নাম। নয়াদিল্লি দলটিকে পাকিস্তানঘেঁষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এসেছে। এমন এক সময়ে, যখন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য, শুল্ক, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক কৌশল নিয়ে টানাপোড়েন চলছে, তখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই নতুন সমীকরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই বিষয়টি গভীর প্রভাব ফেলছে। শেখ হাসিনার পতনের পর দেশ এক অস্থির সময় পার করছে। হাসিনা ভারতের মিত্র ছিলেন এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে অবস্থান নেন। বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল তাঁকে গুরুতর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিলেও, ভারত তাঁকে প্রত্যর্পণ করেনি। এই ঘটনা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ইতোমধ্যেই তীব্র উত্তেজনা তৈরি করেছে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সখ্যতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ভেতরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজনের চেষ্টা করছে। সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বারবার বলেছেন, বাংলাদেশ একটি পরিবার এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আসন্ন নির্বাচন সময়মতো ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে—এই আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীকে মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকার পর তারা মাঠে নেমে সংগঠিত প্রচারণা চালাচ্ছে, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী নির্বাচন পারফরম্যান্স অস্বাভাবিক হবে না। নিষিদ্ধ অবস্থায় থাকাকালীন দলটি যে ‘ভিকটিম ন্যারেটিভ’ তৈরি করতে পেরেছে, তা এখন তাদের জন্য সহানুভূতির জায়গা তৈরি করেছে। পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, ইসলামি মূল্যবোধের কথা বলা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের হতাশা—এই সব মিলিয়ে তারা একটি উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক গড়ে তুলতে পারে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রহ কতটা নীতিগত, আর কতটা কৌশলগত? অনেকের মতে, এটি আদর্শগত কোনো পরিবর্তন নয়, বরং বাস্তব রাজনীতির স্বার্থে নেওয়া একটি পদক্ষেপ। বাংলাদেশের রাজনীতি যেদিকে এগোচ্ছে, সেই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সব প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চায়, যাতে ভবিষ্যৎ সরকার যে-ই গঠন করুক, তাদের সঙ্গে কাজ করার পথ খোলা থাকে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো ওয়াশিংটনের জন্য একটি ‘প্র্যাগম্যাটিক’ সিদ্ধান্ত।
সব মিলিয়ে, একসময়ের নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামী আজ শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতির আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ এক নাম হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ, ভারতের উদ্বেগ, অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ এবং আসন্ন নির্বাচনের অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সন্ধিক্ষণে কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, তা শুধু দেশের ভবিষ্যৎই নয়, বরং পুরো অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করবে।
আপনার মতামত জানানঃ