ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকায় অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশ টাইমসের কার্যালয়ে শনিবার রাতে সেনাসদস্যদের উপস্থিতি এবং সেখান থেকে সাংবাদিকদের ক্যাম্পে নেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে সশস্ত্র সেনাসদস্যদের একটি দলকে সংবাদকক্ষের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়, যা সাংবাদিক সমাজ ও নাগরিক পরিসরে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ টাইমস কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই রাতে সেনাসদস্যরা অফিসে প্রবেশ করে কর্মরত সাংবাদিকদের দ্রুত প্রস্তুত হতে বলেন এবং মোট ২১ জন সাংবাদিককে গাড়িতে করে উত্তরা সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যান। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, একটি সংবাদমাধ্যমের অফিসে এভাবে সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি এবং সাংবাদিকদের তুলে নিয়ে যাওয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থি এবং দেশে আগে এমন নজির দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ টাইমসের এডিটর ইন চিফ সাব্বির আহমেদ জানিয়েছেন, ঘটনার সূত্রপাত হয় ইনকিলাব মঞ্চে হওয়া একটি বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক নারীর বক্তব্য নিয়ে প্রকাশিত একটি ভিডিও রিল থেকে। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিকেল নাগাদ একটি অচেনা নম্বর থেকে তার কাছে যোগাযোগ করা হয় এবং ভিডিওতে থাকা ওই নারীর পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। তিনি জানান, তাকে উত্তরা ক্যাম্পে যেতে বলা হলেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জানান যে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া রয়েছে এবং এভাবে ক্যাম্পে ডাকা গ্রহণযোগ্য নয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিওটির প্রচার সীমিত করার পরও রাত সাড়ে নয়টার দিকে সেনাবাহিনীর গাড়ি অফিসে আসে। তিনি তখন অফিসে না থাকলেও নিরাপত্তারক্ষীরা জানান, সেনাসদস্যরা দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং সশস্ত্র অবস্থায় নিউজরুমে প্রবেশ করেন। এরপর “হারি আপ” বলে সাংবাদিকদের দ্রুত প্রস্তুত হতে বলা হয়। এই পরিস্থিতিতে উপস্থিত সাংবাদিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত ২১ জনকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়।
এই ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ টাইমস তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অফিস ঘেরাও এবং সাংবাদিকদের তুলে নেওয়ার অভিযোগ তুলে পোস্ট দেয়। পরে লাইভ ভিডিওতে সাব্বির আহমেদ জানান, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সন্ধ্যাকালীন শিফটে থাকা সব সাংবাদিককে ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছে এবং এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
উত্তরা সেনা ক্যাম্পে নেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কী ঘটেছে সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভিজ্যুয়াল এডিটর আল মামুন মিয়া জানান, সেখানে প্রথমে সবার মোবাইল ফোন ও ঘড়ি জব্দ করা হয় এবং একটি কক্ষে বসিয়ে রাখা হয়। কিছু সময় পর তাদের নাম পরিচয় নেওয়া হয় এবং জ্যেষ্ঠদের শনাক্ত করা হয়। এক পর্যায়ে ২১ জনের মধ্যে ১৬ জনকে ছেড়ে দেওয়া হলেও বাকি কয়েকজনকে আলাদা কক্ষে রাখা হয়।
তিনি বলেন, পরে একজন সেনা কর্মকর্তা সৌজন্যপূর্ণভাবে কথা বলেন এবং একটি সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখান। কর্মকর্তারা বারবার ওই পোস্ট মুছে ফেলতে বলেন এবং ঘটনাটিকে ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে উল্লেখ করে একটি ব্যাখ্যামূলক পোস্ট দেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে কেন তাদের ক্যাম্পে আনা হয়েছিল সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি।
রাত এগারোটার দিকে ধাপে ধাপে সব সাংবাদিককে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তাদের অফিস এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বাংলাদেশ টাইমস জানায়, সব সহকর্মী নিরাপদে আছেন এবং বাহিনীর পরিচয়ে কোনো অতিউৎসাহী সদস্যের এমন ভূমিকার নিন্দা জানানো হয়।
এ বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী জানান, কয়েকটি সংবাদের বিষয়ে আলোচনার জন্য সাংবাদিকদের ক্যাম্পে আনা হয়েছিল এবং পরে তাদের অফিসে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটি একটি ভুল বোঝাবুঝি এবং বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।
তবে বিশ্লেষক ও সাংবাদিকতা সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এমন একটি ঘটনা উদ্বেগজনক বার্তা দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মো. সাইফুল আলম চৌধুরী মনে করেন, রাতের বেলায় একটি সংবাদমাধ্যমের অফিস থেকে একাধিক সাংবাদিককে এভাবে তুলে নেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। তিনি বলেন, অতীতেও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর চাপের অভিযোগ থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন ঘটনা অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য কী বার্তা বহন করে সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এই ঘটনা দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, যা শুধু সাংবাদিক সমাজ নয় বরং সামগ্রিক গণতান্ত্রিক পরিসরের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আপনার মতামত জানানঃ