
বাংলাদেশে তারা এখন অপরাধী, পলাতক, রাষ্ট্রদ্রোহী। কারও বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ, কারও বিরুদ্ধে হত্যা, কারও বিরুদ্ধে লুটপাট আর দুর্নীতির মামলা। অথচ ভারতের কলকাতার ঝলমলে শপিং মলের ফুডকোর্টে বসে কালো কফির কাপ হাতে তাঁরা নির্ভার আড্ডা দিচ্ছেন, ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে হিসাব কষছেন, আর একটাই প্রশ্ন ঘুরেফিরে বলছেন—ফেরা যাবে কবে।
এই মানুষগুলোই বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত শাসকদল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। প্রায় দেড় বছর আগে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন দলের প্রধান শেখ হাসিনা। হেলিকপ্টারে চড়ে তিনি পালিয়ে যান ভারতে, পেছনে পড়ে থাকে রক্তাক্ত রাজপথ, শত শত লাশ, আর ভেঙে পড়া এক দীর্ঘ শাসনব্যবস্থা। জাতিসংঘের হিসাবে, সেই জুলাইয়ের দমন-পীড়নে প্রাণ যায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের।
হাসিনার পতনের পরপরই হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ছয় শতাধিক কলকাতায় এসে জড়ো হন। বাংলাদেশের কাছাকাছি এই শহরটি এখন কার্যত দলটির অস্থায়ী রাজনৈতিক সদর দপ্তর। এখান থেকেই চলছে যোগাযোগ, পরিকল্পনা, আর স্বপ্ন—ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনচাপের মুখে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়া তো দূরের কথা, প্রচারণার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু এসব রায় আর নিষেধাজ্ঞা দিল্লি বা কলকাতায় বসে থাকা আওয়ামী নেতাদের মনোবল ভাঙতে পারেনি।
ভারতের রাজধানী দিল্লির একটি কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত গোপন আশ্রয় থেকে শেখ হাসিনা নিয়মিত দলীয় বৈঠক করছেন। দিনে ১৫-১৬ ঘণ্টা ফোনে কথা বলছেন নেতাকর্মীদের সঙ্গে। ভারত সরকার বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাঁর প্রত্যর্পণের অনুরোধ উপেক্ষা করে চলেছে। একসময় যাঁকে কৌশলগত মিত্র হিসেবে পাশে রেখেছিল দিল্লি, সেই সম্পর্কের রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী নেতারা বলছেন, হাসিনা আবার ফিরবেন। শুধু ফিরবেনই না, ফিরবেন ‘নায়ক’ হয়ে। তাঁদের ভাষায়, এই নির্বাচন ব্যর্থ হলে জনগণ আবার আওয়ামী লীগের দিকেই তাকাবে। তাই তাঁরা নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বরং সেটিকে অকার্যকর প্রমাণ করার কৌশল নিচ্ছেন। দলীয় কর্মীদের ভোট বর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই অবস্থান বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে চরম ভণ্ডামি বলে মনে হচ্ছে। টানা ১৫ বছর ধরে যে দল বিরোধী মত দমন করেছে, সাংবাদিক নির্যাতন করেছে, গুম-খুনের অভিযোগে জর্জরিত ছিল, সেই দলই এখন গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর মুক্ত মতপ্রকাশের কথা বলছে। মানবাধিকার সংস্থা আর জাতিসংঘের রিপোর্টে বহু বছর ধরেই উঠে এসেছে, হাসিনার শাসনে বিরোধীদের গোপন বন্দিশালায় নির্যাতন করা হয়েছে, বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচনকে পরিণত করা হয়েছিল প্রহসনে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারও পুরোপুরি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। নোবেলজয়ী মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বিরুদ্ধেও সাংবাদিক দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা, সংখ্যালঘু নিরাপত্তায় ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে। যে ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, সেটিও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড না মানার সমালোচনার মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশে সহিংস প্রতিশোধের যে ঢেউ উঠেছে, তার সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ দাবি করছে, তাদের শত শত কর্মী নিহত বা বিনা বিচারে আটক হয়েছেন। অনেকেই আত্মগোপনে। কলকাতায় থাকা নেতারা বলছেন, তাঁরা জেলভয়ের কারণে নয়, প্রাণভয়ের কারণে দেশে ফিরছেন না। তাঁদের ভাষায়, ফিরে গেলে খুন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতি ভারতকেও অস্বস্তিতে ফেলেছে। কলকাতা ও দিল্লিতে একটি নিষিদ্ধ দলের প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত নেতাদের নিরাপদ আশ্রয়—সব মিলিয়ে দিল্লির ভূমিকা নিয়ে ঢাকায় ক্ষোভ বাড়ছে। সেই উত্তেজনা চরমে ওঠে, যখন দিল্লিতে বসে হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ভাষণ দেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধ ও রক্তপিপাসু বলে আক্রমণ করেন।
কলকাতার আরামদায়ক বাসভবনগুলোতে বসে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কথাবার্তায় অনুশোচনার চিহ্ন খুব কমই দেখা যায়। বেশির ভাগই দাবি করেন, গণঅভ্যুত্থান আসলে জনগণের নয়, বরং একটি ‘ষড়যন্ত্র’। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগকে কেউ কেউ হাস্যকর বলেও উড়িয়ে দেন।
তবু এই কঠোর অস্বীকারের ভেতরেও ফাটল আছে। কেউ কেউ স্বীকার করছেন, ভুল হয়েছিল। কর্তৃত্ববাদ ছিল। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। দুর্নীতিও ছিল। তবে তাঁদের বিশ্বাস, এই অন্ধকার দীর্ঘস্থায়ী হবে না। ইতিহাসের চাকা আবার ঘুরবে, আর সেই ঘূর্ণনে তাঁরা আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরবেন।
কলকাতার কোলাহলপূর্ণ ফুডকোর্টে বসে এই বিশ্বাসই তাঁদের বাঁচিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশে তাঁরা অপরাধী, ভারতে তাঁরা নির্বাসিত, কিন্তু নিজেদের চোখে তাঁরা এখনো ভবিষ্যতের শাসক। প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশের মানুষ সেই প্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছে, নাকি ইতিহাস ইতিমধ্যেই ভিন্ন পথে এগিয়ে গেছে।
আপনার মতামত জানানঃ