Trial Run

ওয়ার্ডে প্রতি মাসে ৩ কোটি টাকার ময়লার বিল: লুটপাটে বিশ্বসেরা আ’লীগ নেতাকর্মীরা  

  • প্রতি মাসে বিল আসে ৩ কোটি ৮ লাখ ৮২ হাজার ৬০০ টাকা।
  • বাসাপ্রতি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিল নেয়া হয়। 
  • হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে নেয়া হয় কয়েক হাজার টাকা। 
  • ২০০৯ সালে ময়লা সংগ্রহে মাসিক ফি ছিল সর্বোচ্চ ৩০ টাকা। 
  • একটি ওয়ার্ডে বর্জ্য সংগ্রহ করে ৩৮টি প্রতিষ্ঠান। 
  • ৩১টির মালিক আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের পদধারী নেতারা।

রাজধানীর অভিজাত দুই এলাকা গুলশান ও বনানী নিয়ে গঠিত ঢাকা উত্তর সিটির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে ময়লা সংগ্রহকে কেন্দ্র করে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকা লুটপাটের এক অভিনব ধারা তৈরি করেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।     

ওয়ার্ডবাসীর অনেকের অভিযোগ, ময়লা সংগ্রহের টাকা আদায়ে কোনো শৃঙ্খলা নেই। নেতার লোকেরা ইচ্ছেমতো ময়লার বিল নেয়। বাসাপ্রতি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। হোটেল-রেস্তোরাঁয় তা কয়েক হাজার টাকা। এ নিয়ে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা হয়নি। 

জড়িত আছে যে রাজনৈতিক দলগুলো  

সূত্র মতে, ১৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ময়লা সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, তাঁতি ও শ্রমিক লীগের বিভিন্ন পদে আছেন। 

৩৮টি প্রতিষ্ঠানের মালিকের মধ্যে ১০ জন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের, ৫ জন স্বেচ্ছাসেবক লীগের, ২ জন করে তাঁতি লীগ ও শ্রমিক লীগের এবং ১ জন করে মহিলা আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের। 

১০ জন বিভিন্ন কমিটির আহ্বায়ক, যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদস্য পদে আছেন। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোও পরিচালিত হয় দলের নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায়।

প্রতি মাসে বিল ৩ কোটি

গুলশান ও বনানীর মোট হোল্ডিং, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ ও বর্জ্য সংগ্রহকারী কর্মীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যে হিসাব পাওয়া গেছে, তাতে প্রতি মাসে এই ওয়ার্ডে তিন কোটি টাকার বেশি ময়লার বিল ওঠে।

ওয়ার্ডটি নিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ময়লা তো ময়লা নয়, এ যেন মধু। মাছির মতো সেই মধুর পেছনে লেগেছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা।’

ডিএনসিসির রাজস্ব বিভাগের হিসাবেই, গুলশানে ১১ হাজার ১০৭টি হোল্ডিং আর বনানীতে ৬ হাজার ৫০টি হোল্ডিং মিলে মোট ১৭ হাজার ১৫৭টি হোল্ডিং আছে। একেকটিতে গড়ে ৬টি ফ্ল্যাট ধরে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৯৪২টি ফ্ল্যাট আছে। ফ্ল্যাটপ্রতি গড়ে ৩০০ টাকা হিসাবে প্রতি মাসে বিল আসে ৩ কোটি ৮ লাখ ৮২ হাজার ৬০০ টাকা।

আর গুলশান ও বনানীর রেস্তোরাঁ মালিকেরা বলছেন, তাদের কাছ থেকে চার থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত ময়লার বিল নেওয়া হয়। বাংলাদেশ হোটেল-রেস্তোরাঁ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে ওই দুই এলাকায় শতাধিক রেস্তোরাঁ আছে। গড়ে চার হাজার টাকা ধরে ১০০টি রেস্তোরাঁ থেকে মাসে চার লাখ টাকা ওঠে।

প্রতিটি ফ্ল্যাট ও হোটেল–রেস্তোরাঁর হিসাবে শুধু ১৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকেই বর্জ্য সংগ্রহকারীরা মাসে ৩ কোটি ১২ লাখ ৮২ হাজার ৬০০ টাকা নেন।

ময়লা নিয়ে দুর্নীতি 

২০০৯ সালে অবিভক্ত সিটি করপোরেশন বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহে মাসিক ফি সর্বোচ্চ ৩০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। কিন্তু এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি টাকা ময়লার বিল হিসেবে গুলশান ও বনানী এলাকায় এত দিন আদায় হয়ে আসছে।

আর গত ডিসেম্বরে ডিএনসিসির বোর্ড সভায় উচ্চবিত্তদের বসবাসের এলাকায় মাসে ১০০ টাকা এবং অনুন্নত এলাকায় ৫০ টাকা করে নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এ ছাড়া একটি ওয়ার্ডে কেবল চারটি প্রতিষ্ঠানকে বর্জ্য সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টিও চূড়ান্ত হয়েছে। তবে এসব সিদ্ধান্ত এখনও কার্যকর হয়নি।

ময়লার বিল ১০০ টাকা করে ওঠানো হলেও এই ওয়ার্ডে প্রতি মাসে বিল উঠত ১ কোটি ২ লাখ ৯৪ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে এই ওয়ার্ডে বাড়তি ২ কোটি ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৪০০ টাকা আদায় করছেন বর্জ্য সংগ্রহকারীরা।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য

গুলশান-১ এর বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আমানত আলী বলেন, করপোরেশনকে গৃহকরের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা কর দেওয়ার পরও আলাদা করে বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানকে ময়লার বিল দিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ হোটেল-রেস্তোরাঁ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন মৃধা বলেন, তার প্রতিষ্ঠান পূর্ণিমা রেস্টুরেন্ট থেকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয়। চায়নিজ কিংবা থাই রেস্তোরাঁ থেকে আরও বেশি টাকা নেওয়া হয়।

বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক

বর্জ্য সংগ্রহে যুক্ত দলীয় পদধারী নেতাদের মধ্যে বিভিন্ন কমিটির সভাপতিরা হচ্ছেন বনানী ইউনিট আওয়ামী লীগের খন্দকার ইউছুফ (আনোয়ার ট্রেডার্স), ওয়ার্ড যুবলীগের মোহাম্মদ মোস্তফা (মা এন্টারপ্রাইজ), ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের মোহাম্মদ মান্নান (মৃদুল এন্টারপ্রাইজ), বনানী ইউনিট যুবলীগের মো. ফরিদ (ফারিয়া এন্টারপ্রাইজ), গুলশান থানা তাঁতি লীগের আজিজুল হক (ভাই ভাই সমাজকল্যাণ সংঘ), গুলশান-১ ইউনিট আওয়ামী লীগের দ্বীন মোহাম্মদ (সাকের এন্টারপ্রাইজ) এবং গুলশান-২ ইউনিট স্বেচ্ছাসেবক লীগের মো. রানা (রায়হান ক্লিনিং সার্ভিস)।

বিভিন্ন কমিটির সহসভাপতিরা হলেন ঢাকা মহানগর উত্তর তাঁতি লীগের ওবায়দুল ইসলাম (মাল্টিট্রেড কনসালট্যান্ট), বনানী থানা জাতীয় শ্রমিক লীগের মো. সোলায়মান (সোলায়মান ক্লিনিং সার্ভিস), বনানী থানা মহিলা আওয়ামী লীগের মনোয়ারা মজলিশ (পারভেজ ক্লিনিং সার্ভিস), ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের হুমায়ূন কবির (বিসমিল্লাহ কন্সট্রাকশন) এবং বনানী থানা যুবলীগের গোলাম মাওলা (মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সংস্থা)।

এ ছাড়া বিভিন্ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক পদের তিনজন করে নেতা এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক। এর বাইরে ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত মো. আলমগীর হোসেনের নামে প্রতিষ্ঠান চালান এই নেতার স্ত্রী শাহিদা আলম। আর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা লিটন ঘোষ দুটি প্রতিষ্ঠান—নৈতিক ও জয় ক্লিনিং সার্ভিসের মালিক। অন্য ১০ জন মালিক বিভিন্ন কমিটির আহ্বায়ক, যুগ্ম আহ্বায়ক কিংবা সদস্য পদে আছেন।

রাজনৈতিক নেতা ও কাউন্সিলরের ভাষ্য

গুলশান ৭৪ নম্বর ও ৮৬ নম্বর রাস্তায় ফ্ল্যাটপ্রতি ৪০০ টাকা নেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য মো. খোকন। খোকনের ভাষ্য, ‘ভবনমালিক ও তত্ত্বাবধায়কেরা বাসাপ্রতি ৪০০ টাকা নেন। কিন্তু আমাদের ফ্ল্যাট হিসাবে ১৫০ টাকা করে দেন।’

টাকার বিষয়ে কাউন্সিলর মফিজুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি শতভাগ সত্যও না আবার মিথ্যাও না। দলের (আওয়ামী লীগ) খরচের জন্য (মিছিল, মিটিং, সমাবেশ) এই টাকা তারাই দিত।’

সূত্র মতে, প্রতি মাসে কমিশন হিসাবে কাউন্সিলরকে টাকা দিতে হয়। এই কারণেই ময়লার বিল বেশি নিতে হয়। গুলশান থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক লিটন ঘোষের কাছে তারা প্রতি মাসের কমিশনের ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা জমা দেন। 

বিষয়টি স্বীকার করে লিটন ঘোষ বলেন, গরিব নেতা-কর্মীদের সহায়তার জন্য টাকাটি নেয়া হত। তবে এই টাকা প্রায় এক বছর ধরে নেওয়া হচ্ছে না।

করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থায়ী কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর জাকির হোসেন বলেন, দরপত্রের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহের প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হলে নির্ধারিত ১০০ বা ৫০ টাকার বেশি নেয়া যাবে না। নিলে নিয়োগ বাতিল করার ব্যবস্থা আছে।

ডিএনসিসির ১৯ নম্বরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের অন্যতম মূল দায়িত্বই হচ্ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। করপোরেশন নিজে বর্জ্যের কর নিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করলে মধ্যস্বত্বভোগীরা এই সুবিধা নিতে পারবে না।’

বর্জ্য সংগ্রহে শৃঙ্খলা কি খুব জটিল!

ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্যের অধিকাংশই বাসা–রেস্তোরাঁ থেকে সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু বাসাবাড়ি বা রেস্তোরাঁ থেকে সরাসরি বর্জ্য সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নেই। 

সিটি করপোরেশনের কর্মীরা রাস্তার পাশে ময়লার কনটেইনার এবং ময়লা রাখার ঘর বা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করেন। এই সুযোগে বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য গড়ে উঠেছে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে কনটেইনার কিংবা এসটিএস পর্যন্ত নিয়ে যান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। সেখান থেকে সিটি করপোরেশনের গাড়ি ময়লা আমিনবাজার ও মাতুয়াইলের ভাগাড়ে নিয়ে যায়।

বেসরকারিভাবে বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে (পিডব্লিউসিএসপি) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহযোগী সংগঠন হিসেবে সিটি করপোরেশন থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। বর্তমানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত আছে। তবে এসব সংগঠনের বিষয়ে কোনো নীতিমালা সিটি করপোরেশনের নেই।

অবশ্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন চাইলেই রাজধানীর বর্জ্য সংগ্রহ নিয়ে এমন বাণিজ্য বন্ধ করতে পারত বলে মনে করেন নগরবাসী। বর্জ্য সংগ্রহে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী সিটি শৃঙ্খলা এনেছে। সেখানকার সিটি করপোরেশন নিজস্ব কর্মীর মাধ্যমে বাসাবাড়ি থেকে সরাসরি বর্জ্য সংগ্রহ করে। সিটি করপোরেশন বর্জ্য সংগ্রহকারীদের বেতন দেয়। 

সিটি করপোরেশনের আদায় করা গৃহকরের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা কর অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই করের টাকা দিয়েই চট্টগ্রাম ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন সরাসরি বর্জ্য সংগ্রহের কাজ পরিচালনা করছে।

অন্যদিকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনও প্রতিবছর গৃহকরের ৩ শতাংশ নেয় পরিচ্ছন্নতা বাবদ। গত অর্থবছরে বাসিন্দাদের কাছ থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ১৫০ কোটি টাকার বেশি পরিচ্ছন্নতা কর আদায় করেছে। 

অথচ তারা বাসাবাড়ি থেকে সরাসরি বর্জ্য সংগ্রহ না করে ক্ষমতাসীন দলের নেতা–কর্মীদের লুটপাটের সুযোগ করে দিচ্ছে। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আইন অনুযায়ী বাসাবাড়ি থেকে সরাসরি বর্জ্য সংগ্রহের সুযোগ সিটি করপোরেশনের রয়েছে।

বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকেই নিতে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নগরায়ণ ও সুশাসন কমিটির সদস্যসচিব ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, বিশ্বের বড় ও উন্নত শহরগুলোতে সিটি করপোরেশনই বাসার বর্জ্য সংগ্রহ করে। বর্তমানে রাজধানীতে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্জ্য সংগ্রহের এই ব্যবস্থাপনাকে আত্তীকরণ করতে হবে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাউন্সিলরদের কাজে লাগিয়ে বর্জ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে একটা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

ময়লা বাণিজ্যে আওয়ামী লীগ

১৯৮০–র দশকের শেষ দিকে কলাবাগান এলাকায় প্রথম বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। পরে পুরো রাজধানীতে একই রকম ব্যবস্থা চালু হয়। শুরুতে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, এলাকার ব্যক্তিরা মিলে সমাজসেবামূলক কাজ হিসেবে বর্জ্য সংগ্রহের কাজটি করতেন। 

২০০০ সালের পরে ময়লা–বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিএনপির স্থানীয় নেতা–কর্মীদের কাছে। এ সময়ও ময়লা সংগ্রহে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ফি ছিল না।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বর্জ্য সংগ্রহের নিয়ন্ত্রণ নেন দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। ওই বছর অবিভক্ত সিটি করপোরেশন একটি অফিস আদেশের মাধ্যমে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহে মাসিক ফি সর্বোচ্চ ৩০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। যেটি এখন আর কেউ মানে না।

এখন ময়লা সংগ্রহকারীরা এলাকাভেদে বাসাপ্রতি ৮০-১৫০ টাকা নিচ্ছে। কোথাও সেটি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো এলাকায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকাও আদায় করা হচ্ছে। 

আবার একই পাড়া, মহল্লায় কিংবা একই বাসাবাড়িতে একজনের বিলের টাকার পরিমাণের সঙ্গে অন্যজনের বিলের পার্থক্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাসা কত তলায় অবস্থান করছে, সে হিসাবেও নির্ধারণ করা হয় টাকার পরিমাণ।

ধানমন্ডি ৪/এ সড়কের বাসিন্দা রাজীব হাসান বলেন, ‘আমার বাসা থেকে এখন প্রতি মাসে ৩০০ টাকা নেওয়া হয়। রোজার ঈদের আগে নেওয়া হতো ২৫০ টাকা। ঈদের পর থেকে হুট করেই ৫০ টাকা বাড়ানো হয়। এভাবে টাকা বাড়ানো হলেও অভিযোগ শোনার কেউ নেই।’ 

একই চিত্র গুলশান এলাকায়। গুলশান ১ নম্বরের ২ নম্বর সড়কের বাসিন্দা রওনক সুরাইয়া বলেন, ভবনে ১০টি ফ্ল্যাট আছে। প্রতি ফ্ল্যাট থেকে ২৫০ টাকা নিচ্ছে বর্জ্য সংগ্রহকারীরা। তা–ও মাঝেমধ্যে ময়লা নিতে আসে না। এ বিষয়ে সংগ্রহকারীদের সঙ্গে কোনো কথাও বলা যায় না।

রাজধানীর বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহের পরিস্থিতি নিয়ে ২০১৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ময়লা-বাণিজ্য ছিল বছরে অন্তত ২৪০ কোটি টাকা। তখনও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরাই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। চার বছরে পরিস্থিতি তো বদলায়নি, বরং ময়লা-বাণিজ্য ফুলে ফেঁপে উঠেছে কয়েক গুণ। 

এসডব্লিউ/পিএ/এসএস/১২৫৩ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 40
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    40
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ